বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল উত্তরণ নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, উত্তরণের এ অতিরিক্ত সময় আমরা কোনো বিলম্বের জন্য চাই না; বরং একটি টেকসই, স্থিতিশীল এবং কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য চাই।
আজ বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ'স প্রিপেয়ার্ডনেস ফর এলডিসি গ্রাজ্যুয়েশন অ্যান্ড দ্য রেশনাল ফর এক্সেটেনশন অব দ্য প্রিপেরেটরি পিরিয়ড’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বর্তমান সরকার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিপিডি) কাছে বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিমূলক সময় তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়। প্রস্তুতিমূলক সময়ে বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপ, সরবরাহ চেইনে বিঘ্নতা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। তাই সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করা।
জাতিসংঘের ওএইচআরএলএলএস পরিচালিত গ্র্যাজুয়েশন প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এলডিসি উত্তরণের জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়। তাই অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময় প্রয়োজন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সরকার ২৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার সমন্বিত একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে— সামষ্টিক অর্থনৈতিকস্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্কার, ডিরেগুলেশন, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যবসা শুরু করার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছি, যাতে ১৫তম দিনে কোনো প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারে। তিনি আরো জানান, ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা ও ওভারল্যাপ চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে ব্যবসা করার সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
সেমিনারে জানানো হয়, সরকারের গঠিত জাতীয় গ্র্যাজুয়েশন মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি এবং পাবলিক–প্রাইভেট টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
এ সময় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনীতি ও দুর্বল আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মেয়াদ বৃদ্ধি ও উন্নয়ন অংশীদারদের অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, সংকট কাটিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সবার সহযোগিতা অপরিহার্য।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কাঠামোগত ও আন্তর্জাতিকভাবে বিদ্যমান প্রধান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি সুষ্ঠু ও টেকসই এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারের কৌশলগত অগ্রাধিকার এবং প্রস্তাবিত প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির সময়টি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রণীত সময়াবদ্ধ একটি রোডম্যাপও তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত গতিশীল উল্লেখ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গতি যেন থেমে না যায় তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুযোগ ও সম্ভাবনা ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাজার আরও উন্মুক্ত করা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার উপর তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) গীতাঞ্জলি সিং, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেমের) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, ফুটওয়্যার লেদারগুডস অ্যান্ড এক্সেসরিজ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মহ্জুর, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রতিনিধিরা।
এছাড়া সুইডেন, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতরাও সেমিনারে বক্তব্য দেন। সেমিনারে আরো ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা টেকসই এলডিসিউত্তরণ নিশ্চিত করতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন এবং করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত, থিংক ট্যাঙ্ক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।










