বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেছেন, আমরা যদি পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ, আধুনিক সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে পারি, তবে এ খাত থেকে আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এটি করতে পারলে আমরা বিদেশী যাত্রীদেরও আকৃষ্ট করতে পারব।

আজ শনিবার রাজধানীর কুর্মিটোলার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের দ্য প্রেস্টিজে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে তিনি এসব কথা বলেন। দৈনিক বণিক বার্তা এ কনক্লেভের আয়োজন করেছে।

বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। অনুষ্ঠানে দেশের এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আব্দুল হাই সরকার বলেন, আমাদের বিদ্যমান অবকাঠামো এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বল। গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে কার্গো হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দর পরিচালনা এবং এর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অবিলম্বে ব্যাপক মনোযোগ ও সংস্কার প্রয়োজন। আমরা এখানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ভাবতে পারি, তবে মূল বিষয় হলো—এই প্রযুক্তি বিমানবন্দরের যাত্রী ও ব্যবহারকারীদের কল্যাণে কতটুকু কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা বিমানবন্দর পরিচালন ও ব্যবস্থাপনায় একাধিক দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি। এ কারণে ব্যবস্থাপনা পর্যায় থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ পরিচালনায় যুক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং পেশাদার জনবল নিয়োগ করা জরুরি। যেসব জায়গায় অদক্ষতার কারণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে আমাদের দেশের বাইরে থেকেও পেশাদার নির্বাহী নিয়োগ করা উচিত।

তিনি আরো বলেন, এমিরেটস বা কাতারের মতো বড় এয়ারলাইনগুলোও বিমান সংস্থা পরিচালনায় অভিজ্ঞ বহু বিদেশী উপদেষ্টা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ ব্যবহার করে থাকে। তাই আমাদের বিমানবন্দরগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিদেশী পেশাদারদের নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

আমাদের বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো, যাত্রীসেবা এবং ফ্লাইট আনা-নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াতেই দুর্বলতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি নিজেও একাধিকবার দেখেছি—ফ্লাইট ল্যান্ড করার পর বোর্ডিং ব্রিজ সংযুক্ত হলেও গেট বন্ধ থাকে। কেউ এসে দরজা খুলে দেয়ার জন্য ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিদেশী পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের প্রচণ্ড বিরক্ত করে। এসব সাধারণ বিষয়েও গভীর মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

যে কোনো দেশের অর্থনীতিতেই সিভিল এভিয়েশন বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন আব্দুল হাই সরকার। তিনি বলেন, আমাদের দেশের আয়ের প্রধান উৎস জনশক্তি রফতানি, তৈরি পোশাক এবং চামড়া খাত। তবে আমার বিশ্বাস, এভিয়েশন খাতও বিভিন্ন দিক থেকে রাজস্ব বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে এভিয়েশন খাতের প্রত্যক্ষ অবদান খুবই সামান্য—অন্যান্য খাতকে সহায়তা করার মাধ্যমে যা বছরে হয়তো দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের মতো। কিন্তু আমরা যদি পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ, আধুনিক সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে পারি, তবে এই খাত থেকে আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এটি করতে পারলে আমরা বিদেশী যাত্রীদেরও আকৃষ্ট করতে পারব।

তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা সবসময় নিজেদের দেশের বিমানে উড়তে ভালোবাসেন। কিন্তু আমাদের সক্ষমতার অভাবে বাধ্য হয়ে তাদের অধিকাংশ সময় বিদেশী বিমানে চড়তে হয়। বিমানে ওঠার পরই যখন তারা বাংলায় কথা শুনতে পান এবং নিজেদের দেশের খাবার পান, তখন তাদের মনে হয় যেন তারা নিজ ঘরেই ফিরে এসেছেন। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ এবং দক্ষ ও আন্তরিক কর্মী নিশ্চিত করতে পারলে এভিয়েশন খাতে আমরা অত্যন্ত সফল একটি ব্যবসা গড়ে তুলতে পারব।

আব্দুল হাই সরকার বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলতেন, ‌টাকা কোনো সমস্যা নয়। ব্যাংকের পরিচালনা অংশীদার হিসেবে আমিও মনে করি, টাকা সত্যিই কোনো সমস্যা নয়। যদি আপনার প্রকল্প সঠিক হয় এবং তা থেকে আয় বা সুফল আসার নিশ্চয়তা থাকে, তবে অর্থায়নের অভাব হবে না। এমনকি আমাদের যে নিজস্ব সম্পদ রয়েছে, তা দিয়েই স্থানীয়ভাবে অর্থায়ন সম্ভব। বিদেশী অর্থায়নের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তবে সেজন্য সঠিক পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অবকাঠামো ও উড়োজাহাজ থাকলেও মূল সমস্যা হলো দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব। মানসম্মত ব্যবস্থাপনা না থাকলে জাতীয় সম্পদকে জনগণ ও যাত্রীদের কল্যাণে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়।