দেশের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু হয় না। কোথাও শিক্ষকরা সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও পাঠদান শুরু করতে দেরি করেন। আবার কোথাও একজন শিক্ষককেই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে দুই থেকে তিনটি বিষয়ের ক্লাস। শিক্ষকদের উপস্থিতি, পাঠদানের সময়সূচি কিংবা শ্রেণীকক্ষের কার্যক্রম তদারকিতেও রয়েছে ঘাটতি। বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রেই পড়ছে প্রভাব। এর পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান শিক্ষক সংকট। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যালয়ে দেরিতে ক্লাস শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ প্রধান শিক্ষকদের দুর্বল নেতৃত্ব ও তদারকি।
বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ও মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬৫ হাজার ৪৫৭টি। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি পদই শূন্য, যা মোট পদের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে স্থায়ী নেতৃত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এতে নিয়মিত পাঠদানের দায়িত্বের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত কাজও সামলাতে হচ্ছে তাদের। ফলে একদিকে শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় তদারকি ব্যাহত হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যালয় ও শ্রেণীকক্ষে দেরিতে কার্যক্রম শুরুর প্রধান কারণ হিসেবে প্রধান শিক্ষকদের দুর্বল নেতৃত্বকে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া যথাসময়ে বিদ্যালয় খোলা ও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ৪০ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা গুরুতর জটিলতার কথা জানিয়েছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, শুধু ঢাকা মহানগরীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিরও বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী বা নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ের বেশির ভাগই চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। ফলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পাঠদানের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা ও মামলা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে নানা প্রশাসনিক জটিলতা পার হতে হয়। নতুন করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেয়া, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর সংগ্রহসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এসব জটিলতায় অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না।’
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ‘শিক্ষক সংস্কার কর্মসূচি’র আওতায় দেশের ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৭ সরকারি প্রাথমিক শিক্ষককে ব্লেন্ডেড ও ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং পৌরনীতি ও নাগরিকতা—এ ছয় বিষয়ে সিপিডি মডিউল প্রস্তুত করা হয়েছে। ভাষা শিক্ষার চারটি দক্ষতা—শোনা, বলা, পড়া ও লেখা জোরদারের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও শিক্ষাবিষয়ক জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রণালয়ের একই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষক সময় ব্যবস্থাপনায় সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা শ্রেণীকক্ষভিত্তিক মূল্যায়নকে কার্যকর ও সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন। তাদের মতে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়লেও বিদ্যালয়ে পাঠদানের পরিবেশ, সময়ানুবর্তিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মামলাজটের কারণে প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। নিয়োগের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা রয়েছে। এ সংকট প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিকে বেশি। আবার পদোন্নতির ক্ষেত্রে গ্রেডসংক্রান্ত জটিলতাও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু বিদ্যালয় ও ক্লাস দেরিতে শুরু হওয়া কিংবা পাঠদান ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয় না, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন বজায় রাখার ক্ষেত্রে।’
বিদ্যালয় পর্যায়ে তদারকির কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন এ শিক্ষাবিদ। তার মতে, বিশেষ করে ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব চিত্র বুঝতে বিদ্যালয় পরিদর্শনের সংখ্যা, পরিদর্শনে চিহ্নিত অনিয়ম এবং সেসবের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপের তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি। শিক্ষা অফিসের নথিতে পরিদর্শনের তথ্য থাকলেই কার্যকর তদারকি নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। মাঠপর্যায়ে শিক্ষক উপস্থিতি, ক্লাস শুরুর সময় ও পাঠদানের মান কতটা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অবকাঠামো ও শিক্ষাসামগ্রীর পাশাপাশি কার্যকর নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৬ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতিসংক্রান্ত মামলার কারণে তৈরি হয়েছে এ সংকট। তবে গত ২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার নিরসন হয়েছে। এখন বিধি অনুযায়ী ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’










