দেশে উৎপাদিত দুধের বড় অংশ আসে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকে। বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও উচ্চ উৎপাদনশীল বিভিন্ন জাতের গরুর আধিক্য থাকায় এ অঞ্চলকে অনেকে ‘বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড’ বলে আখ্যায়িত করে। তবে চলমান তাপপ্রবাহে দুটি অঞ্চলেই দুধ উৎপাদন কমেছে।

কারণ হিসেবে খামারিরা বলছেন, প্রখর রোদে সবুজ ঘাস মরে যাচ্ছে। এতে গোখাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া গরু স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না। দিনে তিনবার গোসল করানোসহ পানি ছিটিয়েও কাজ হচ্ছে না। গরমে গবাদিপশু খোলা মাঠে টিকতে পারছে না। গোয়ালঘরের চালেও পানি ছিটানো হচ্ছে। সামর্থ্যবান খামারিরা জেনারেটর  লাগিয়ে অতিরিক্ত বাতাসের জন্য ফ্যান ব্যবহার করছেন। কৃত্রিম উপায়ে খামারগুলো শীতল রাখার চেষ্টাও করছেন।

সিরাজগঞ্জ প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় প্রায় ৩৩ হাজার গবাদিপশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে গরু রয়েছে ১৫ লাখ ৬ হাজার ২৫৩টি। এর মধ্যে দেশী জাতের গরু ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮৭৬ ও শংকর জাতের গরু রয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৩৭৭টি। এছাড়া মহিষ রয়েছে ২ হাজার ৭৯৫ ও ছাগল রয়েছে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৪১৯। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দুগ্ধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকারী প্রতিষ্ঠান খামারিদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। প্রতি লিটার দুধ গড়ে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি ধরলে দৈনিক বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ওপরে।

মিল্ক ভিটার উপমহাব্যবস্থাপক সাইদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গরমের কারণে কাঁচা ঘাস না থাকায় ও গবাদিপশু স্বাভাবিক খাবার খেতে না পারায় দুধ উৎপাদন কমেছে। নদীর পাশে যেসব খামার রয়েছে, তারা সহজেই পানি পাচ্ছে। যারা বাড়িতে খামার করেছে, তারা বেশি বিপাকে পড়েছে। মিল্ক ভিটার লক্ষ্য প্রতিদিন গড়ে ৯০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা। তবে এখন খামারিরা ৫০-৫২ হাজার লিটারের বেশি দুধ সরবরাহ করতে পারছে না।’

শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়ার খামারি আব্দুস সালাম ব্যাপারী বলেন, ‘গরমে গবাদিপশু রক্ষাই কঠিন। খামার শীতল করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তাতে কাজ হচ্ছে না। আমার খামারে দেড় শতাধিক গরুর মধ্যে চারটা গাভী আর তিনটা বাছুর এরই মধ্যে মারা গেছে। রোদের তাপে ঘাস পুড়ে গেছে। নতুন করে জন্মাচ্ছে না। কাঁচা ঘাস গাভী খেতে পারছে না। আবার গরমের কারণে স্বাভাবিক খাবারও খাচ্ছে না গাভী। এ কারণে কমে গেছে দুধ উৎপাদন। আমার খামারে প্রতিদিন ৩০০ লিটার দুধ উৎপাদন হলেও এখন ২০০ লিটারের একটু বেশি হচ্ছে।’

একই উপজেলার রেশমবাড়ী গ্রামের নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ১২টি গাভী দুই মাস ধরে দুধ দিচ্ছে। আগে প্রতিদিন ১৫০ লিটার দুধ উৎপাদন হলেও দুই সপ্তাহ ধরে ১২০ লিটার হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে দুধ উৎপাদন কমে গেছে।’

পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদন সমিতির সাবেক সভাপতি ওয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘সমিতির খামারিরা প্রতিদিন গড়ে সাত হাজার লিটার দুধ সরবরাহ করেন। তবে এখন গরমে ৫০০-৬০০ লিটার উৎপাদন কমে গেছে। উৎপাদন কমায় আমরাও মিল্ক ভিটার চাহিদা অনুযায়ী দুধ সরবরাহ করতে পারছি না।’

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় তিন সপ্তাহের তাপপ্রবাহে পশুপালনে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। গবাদিপশুর বাড়তি যত্ন নেয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। তাপপ্রবাহ সহনীয় করতে গবাদিপশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করাতে বলা হচ্ছে। এছাড়া শেড ও খামার শীতল রাখতে ভেজা পাটের বস্তা, কাপড় দেয়ার জন্য বলা হচ্ছে। গবাদিপশু গাছের ছায়ায় রাখার জন্য বলা হচ্ছে। এছাড়া পশুকে প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করানোর জন্যও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে খামারিদের।’

তবে পাবনায় গোখাদ্যের সংকট তেমন একটা না থাকলেও গরমে দুধ উৎপাদন কমেছে। গরমে গবাদিপশু স্বাভাবিক খাদ্য খেতে পারে কম। এ কারণে দুধ উৎপাদন কমে যায়। তবে এখানে গোখাদ্যের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন পাবনা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গৌরাঙ্গ কুমার।

ভাঙ্গুড়া উপজেলার চৌবাড়ীয়া গ্রামের খামারি আারিফুল ইসলাম জানান, তার খামারে ১৫টি গরু রয়েছে। আগে ৯০ লিটার দুধ হলেও এখন ৭০ লিটার দুধ পাচ্ছে। এগুলো সেলিং সেন্টারের মাধ্যমে বিক্রি করছেন তিনি।