যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ এখনো সহজ নয়। জটিল বিধিবিধান, নীতির অনিশ্চয়তা ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া মানসম্পন্ন বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বাধা বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তার মতে, সবার জন্য সমান সুযোগ, স্থিতিশীল নীতিকাঠামো ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে বিনিয়োগে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে। দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম
কেমন আছেন?
আমি বেশ ভালো আছি। তবে কিছুটা জেট ল্যাগে ভুগছি, কারণ বাংলাদেশে ফিরেছি মাত্র কয়েক দিন হলো।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ সফরের প্রধান অর্জনগুলো কী? যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানির সঙ্গে কি আপনার আলোচনা হয়েছে?
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আমি যুক্তরাষ্ট্রে দুই সপ্তাহ কাটিয়ে কয়েক দিন আগে বাংলাদেশে ফিরেছি। ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়েছি। সেখানে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছি এবং গত প্রায় সাড়ে ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছি। ওয়াশিংটন ডিসিতে কয়েকটি কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছি। হাডসন ইনস্টিটিউটের একটি গোলটেবিল আলোচনায় বসেছি। এছাড়া বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি।
এরপর ক্যালিফোর্নিয়ায় যাই। প্রথমে সিলিকন ভ্যালিতে গিয়ে সিসকো, মেটা, এনভিডিয়া, অ্যাপল ও প্লাগ অ্যান্ড প্লেসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করেছি। প্রবাসী বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গেও দেখা করেছি, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে কর্মরত বাংলাদেশী আমেরিকানদের সঙ্গে।
এরপর লস অ্যাঞ্জেলেসে যাই। সেখানে অ্যান্ডুরিল, স্পেসএক্স, স্টারলিংক, অ্যান্টারেস নিউক্লিয়ার এবং গ্রে ম্যাটার রোবোটিকসের মতো কয়েকটি চমৎকার মার্কিন কোম্পানি পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। পোর্ট অব লং বিচ আয়োজিত একটি ব্যবসায়িক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়েছি। বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকায় বাংলাদেশী আমেরিকান প্রবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও দেখা করেছি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের চমৎকার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে মেডিকেল স্কুলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা বাংলাদেশে সিসা অপসারণ এবং ইটভাটাসহ অন্যান্য উৎস থেকে সৃষ্ট দূষণ মোকাবেলায় চমৎকার কাজ করছেন, যা আমার মনে হয় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এছাড়া হুভার ইনস্টিটিউটে খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব জোরদারে আপনার প্রধান অগ্রাধিকারগুলো কী?
আমি বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি ১০ মাসের কিছু বেশি সময় ধরে। এখানে আসার পর থেকে আমার অগ্রাধিকারগুলো একই রয়েছে। বিষয়গুলো মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী রহমানের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া প্রথম চিঠির সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমার প্রথম অগ্রাধিকার বাণিজ্যিক কূটনীতি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো। এ কারণেই মাত্র এক সপ্তাহ আগে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়েছিলাম। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। বাংলাদেশে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে আমি এত বেশি কর্মসূচিতে অংশ নিই, এর কারণও সেটি।
আমার দ্বিতীয় অগ্রাধিকার অবৈধ অভিবাসন মোকাবেলা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় বিষয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন, তার একটি হলো আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত করা। ভিসা কোনো অধিকার নয়, এটি একটি বিশেষ সুযোগ। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, তারা বৈধ উদ্দেশ্যেই যাচ্ছেন এবং সেখানে অবস্থানকালে আমাদের আইন মেনে চলছেন। তাই অবৈধ অভিবাসন মোকাবেলায় আমরা খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি। এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে কেবল বৈধ উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারীরাই যুক্তরাষ্ট্রে যান।
এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের বিষয় নয়। এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমার মনে হয়, এখানে আমার যেকোনো সমপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে দেখা যাবে, তারাও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে অবৈধ অভিবাসনকে বিবেচনা করছেন।
আমার তৃতীয় অগ্রাধিকার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ানো। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠিতেও বিষয়টি ছিল। আমরা প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় সামরিক মহড়া বাড়ানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমাদের ভাষায় যেসব মৌলিক চুক্তি বলা হয়, সেগুলো সম্পন্ন করতে চাই। এর মধ্যে রয়েছে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিএসওএমআইএ)। বাংলাদেশ বিশ্বের বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যাদের সঙ্গে এখনো আমাদের এ ধরনের মৌলিক চুক্তি নেই। অবশ্য বিশ্বের সেরা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামগুলোর কিছু বাংলাদেশে বিক্রি করতেও আমি আগ্রহী। দেখা যাক, এর কিছু করা যায় কিনা।
এগুলো আমার তিনটি মূল অগ্রাধিকার। তবে বাংলাদেশে আমাদের বৈদেশিক সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছি। আমেরিকা ফার্স্ট বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কৌশলের আওতায় স্বাস্থ্য খাতে আমরা এখনো উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিচ্ছি। এক্ষেত্রে সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন রোগের ওপর গুরুত্ব রয়েছে, যেমন বহু ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা ও নিপাহ ভাইরাস। দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারকে সম্প্রতি আমাদের যে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিতে দেখেছেন, সেটিও এর অংশ।
আর অবশ্যই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আমরাই এখনো সবচেয়ে বড় দাতা। আমি বাংলাদেশে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের (ইউএন ওসিএইচএ) নতুন ব্যবস্থার আওতায় এ সংকট মোকাবেলায় ৩০ কোটি ডলার দিয়েছি।
পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি) বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে? এসব সুবিধা বাস্তবায়নে পরবর্তী সময়ে কী করা প্রয়োজন?
পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা সংক্ষেপে আমরা যেটিকে এআরটি বলি, সেটি মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর একটি আস্থা। এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর একটি রূপরেখা দিয়েছে। এতে অবাধ, ন্যায্য ও পারস্পরিক বাণিজ্যের অঙ্গীকার রয়েছে। এখানে ‘পারস্পরিক’ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা নিয়ে আমি পরে আবার কথা বলব।
তবে চুক্তিটিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে বাংলাদেশের যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, সেগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, শ্রমমান বাস্তবায়ন, দুর্নীতি কমানো এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন। বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনীতিকই এসব পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছেন।
কিন্তু চুক্তিটি এসব বিষয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে একত্র করেছে। ইউএসটিআরের ওয়েবসাইটে থাকা ৩৬ পৃষ্ঠার এ নথি সবার জন্য উন্মুক্ত, এটি কোনো গোপন নথি নয়। আমি সবাইকে চুক্তিটি পড়ে দেখার আহ্বান জানাই। কারণ এতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে বাড়ানো যায়, তার পথনির্দেশনা রয়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা। দুই দেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মুক্ত করতে যেসব পরিবর্তন প্রয়োজন, সেগুলো আনতে হবে। এ কাজে আমরা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। এখন পর্যন্ত কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আরো অগ্রগতি দেখতে চাই।
তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন ও অন্যান্য কোম্পানির বিকাশের উপযোগী ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করার চাবিকাঠি রয়েছে এ চুক্তিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশ কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক দামে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে?
জ্বালানি আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎপাদক। বাংলাদেশের জন্য সেই সম্ভাবনা উন্মুক্ত করতে আমরা খুবই আগ্রহী।
গত মে মাসে আমরা জ্বালানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছি, যা এ কাজে সহায়তা করবে। এরই মধ্যে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় চুক্তি হয়েছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ঠিক এ ধরনের সরবরাহই প্রয়োজন।
তবে কাজটি সব সময় সহজ হবে না। কারণ এলএনজি ও এলপিজি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন পণ্য। অনেক দেশই দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। অবশ্য বেসরকারি খাত নিজেদের বিবেচনায় সবচেয়ে ভালো চুক্তিগুলোই করবে। তার পরও এখানে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এলপিজি ও এলএনজি রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে আগে তা কার্যত শূন্য ছিল।
জ্বালানি আমদানির বাইরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন ও অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের কী সুযোগ দেখছেন?
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শেভরন শুধু বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মার্কিন বিনিয়োগকারীই নয়, এটি দেশের বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগও। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে। শেভরন আরো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট বর্তমানে ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট পরিচালনা করছে। আমি জানি, প্রতিষ্ঠানটি আরো কাজ করতে আগ্রহী। এ ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আগ্রহী আরো কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি রয়েছে।
জিই ভারনোভা বহু বছর ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন স্থাপনের কাজ করছে। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধির অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক মার্কিন কোম্পানি আগ্রহী, বিশেষ করে এ সমঝোতা স্মারক আরো সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি করছে।
মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রকল্পের জন্য ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারলে, অর্থাৎ সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে, ভবিষ্যতে এ খাতে অনেক আগ্রহ দেখা যাবে বলে আমার মনে হয়।
সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে আপনার কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি?
বাংলাদেশের জন্য মানসম্পন্ন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। সবার জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। নিয়মকানুন হতে হবে স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য। প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
কোম্পানিগুলো যদি মনে করে যে তারা প্রকল্পের জন্য প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না, যদি তাদের মনে হয় যে পেছনের দরজায় বিশেষ সুবিধা দিয়ে চুক্তি করা হচ্ছে, প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ নয়, এমনকি বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা চুক্তি করার উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে যাবে।
অন্যদিকে তারা যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও সবার জন্য সমান সুযোগ দেখে, তাহলে বাংলাদেশে অনেক আগ্রহ তৈরি হবে বলে আমার মনে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরো বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?
আমি আপনার কাছে সত্যটা গোপন করব না। বাংলাদেশে ব্যবসা করা সহজ নয়। এখানে নিয়মকানুন বেশ জটিল। নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলাফল সব সময় অনুমান করা যায় না। নিয়মকানুনের ক্ষেত্রেও সব সময় পূর্বানুমেয়তা থাকে না।
তবে এআরটির প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসতে হয়। ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি রূপরেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মুক্ত করতে মানদণ্ড, শুল্ক প্রক্রিয়া, কর ও বিধিবিধানের মতো যেসব ক্ষেত্রে পূর্বানুমেয়তা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, চুক্তিটিতে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি বিজ্ঞানভিত্তিক বিধিবিধান বাস্তবায়ন, অনুমানযোগ্য করনীতি গ্রহণ, বৈষম্যহীন নিয়ম নিশ্চিত করা এবং অশুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার মতো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আরো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হবে।
এগুলো নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আমরা বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদনে বহু বছর ধরে তথ্য তুলে ধরছি।
নতুন সরকার এ বিষয়ে সঠিক কথাগুলো বলছে। তারা বেশকিছু ভালো পদক্ষেপও নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে এ বছরের শুরুতে পাস হওয়া শ্রম সংস্কারের কথা বলা যায়। আমি আরো পদক্ষেপ দেখতে চাই, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হোক সেটিও চাই। তবে আমার মনে হয়, আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি। সামনে এগোনোর জন্য এআরটি আমাদের একটি রূপরেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুতের অপচয় কমানো, দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের জ্বালানি ব্যয় কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কীভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে?
জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক চমৎকার প্রযুক্তিগত সমাধান রয়েছে। স্মার্ট গ্রিড থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, টারবাইনসহ এ খাতের নানা প্রযুক্তি রয়েছে।
যদি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রকল্প নেয়া যায় এবং সেগুলো অবাধ, ন্যায্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রযুক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে দেশ উপকৃত হবে।
আমি আরো উল্লেখ করতে চাই, আমরা কয়েকটি নতুন ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। এর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইথানল। ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারে আগ্রহী নতুন অংশীদার খুঁজছি এবং এক্ষেত্রে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা দেখছি। ইথানল ব্যবহারের মাধ্যমে আরো পরিচ্ছন্নভাবে জ্বালানি পোড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমার মনে হয়। এছাড়া জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের অন্যান্য ক্ষেত্রও রয়েছে, যেমন পারমাণবিক বিদ্যুতে সম্ভাব্য সহযোগিতা।
পারমাণবিক সহযোগিতার নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে কী কী সুযোগ তৈরি হবে? বাণিজ্যিক প্রকল্প শুরু করার আগে আর কী পদক্ষেপ প্রয়োজন?
কয়েক সপ্তাহ আগে আমরা পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছি। এর মাধ্যমে মার্কিন পারমাণবিক কোম্পানিগুলোকে এ বার্তা দেয়া হয়েছে যে বাংলাদেশ এমন একটি বাজার, যেখানে আমরা আরো সহযোগিতা এবং বিশ্বের সেরা পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছি। বিশেষ করে ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টরের ক্ষেত্রে।
এগুলো খুব ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টরের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালে অ্যান্টারেস নিউক্লিয়ার নামে আমাদের একটি কোম্পানি পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি মাইক্রো মডিউলার রিঅ্যাক্টর নিয়ে কাজ করে। এগুলো খুব ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেখানে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো শিল্পাঞ্চল বা ছোট প্রকল্পে নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব।
এ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে মূলত সংকেত দেয়া হয়েছে যে কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে এবং এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি রফতানির আগে আরো কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষাসংক্রান্ত বাধ্যতামূলক চুক্তিও রয়েছে। তবে এখনই আলোচনা শুরু করা সম্ভব। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করার মতো প্রকল্প নয়। বিশেষ করে ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টরের মতো সর্বাধুনিক নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এখনই এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া। কারণ পুরো বিশ্ব এ প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশ যত দ্রুত এক্ষেত্রে কিছু সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবে, তত দ্রুত এ প্রযুক্তি চালু করে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারবে।
আপনি এর আগে বাংলাদেশে পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ফিরেছেন। ফিরে আসার পর বাংলাদেশে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? এ বছর দুর্গা পূজা উদযাপন কেমন ছিল?
বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ফিরে আসাটা সত্যিই আনন্দের। এর চেয়ে ভালো কাজ পৃথিবীতে আর নেই।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে দেশের আরো অনেক জায়গায় যাওয়ার ও ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। আগেরবার এখানে থাকার সময় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিনিষেধের পাশাপাশি কভিডের বিধিনিষেধও ছিল। তাই স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করতে পারিনি।
এবার আপনারা দেখেছেন, আমি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী থেকে শুরু করে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর, রংপুর ও সিলেট পর্যন্ত গিয়েছি। এখনো কয়েকটি জায়গায় যাওয়া বাকি। খুলনায় যাওয়া হয়নি, পার্বত্য চট্টগ্রামেও যাওয়া হয়নি। এগুলো আমার তালিকায় রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা এবং বাংলাদেশকে আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ পাওয়া সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।
এবারই আমার প্রথম দুর্গা পূজা উদযাপন। আগেরবার বাংলাদেশে থাকার সময় কভিডের বিধিনিষেধের কারণে দুর্গা পূজা উদযাপন বাতিল করতে হয়েছিল। এবার পুরান ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জেও গিয়েছি। পূজার কিছু আয়োজনে অংশ নিতে পেরেছি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ একটি দিক দেখার সুযোগ হয়েছে।
এর পাশাপাশি পানাম নগর পরিদর্শন, জামদানি বুনন দেখা, বোসের কেবিনে যাওয়া, চা পান এবং ব্রিটিশবিরোধী ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আরো অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আরো অনেক কিছু দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে। পূজার আয়োজনে অংশ নিতে পেরে ভালো লেগেছে। যেসব সম্প্রদায় আমাকে তাদের পূজার আয়োজনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।
সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতায় কোন বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চান?
ধন্যবাদ। যেমনটা বলেছি, বাংলাদেশে আমার দায়িত্ব পালনের ১০ মাসের কিছু বেশি সময় হয়েছে। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আরো জোরালো হয়েছে।
আমার মনোযোগ মূলত আগে আলোচিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। এআরটি বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি ভালো রূপরেখা পেয়েছি। আমি এ সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে চাই। নিশ্চিত করতে চাই, এআরটি দুই দেশের স্বার্থে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়াতে চাই, যাতে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়ে এবং আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো বিস্তৃত হয়।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে সম্পর্ক কীভাবে আরো বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও আমি খুব আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী এ খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাজ করার জন্য কীভাবে পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করা যায়, তা দেখতে হবে, যাতে উভয় দেশই উপকৃত হয়।
এজন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রক পরিবেশ এবং স্পষ্ট নিয়মকানুন, যা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে কাজ করার সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে আমি অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও সহায়তাসহ ভবিষ্যতের সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে মনোযোগী, যাতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক আগামী বহু বছরের জন্য শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
আপনাকে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ, রাষ্ট্রদূত। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।
আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। সাক্ষাৎকারটিও খুব ভালো হয়েছে।










