পেলে—কালো মানিক, ফুটবল কিংবদন্তি, ফুটবলের সম্রাট কত নামেই না ডাকা হয় তাকে। ভক্তরা অবশ্য পেলেতে তৃপ্ত। সেই মহাতারকা ৮২ বছর বয়সে যাত্রী হলেন অনন্তযাত্রার। ব্রাজিলের সাও পাওলোর আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে গতকাল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন মেয়ে কেলি নাসিমেন্তো। তিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন।
এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। বাবার দেয়া সে নামে অবশ্য বিশ্ব তাকে চেনেনি। বিশ্ব চেনে পেলে নামে, ফুটবল সম্রাট বলে যাকে কুর্ণিশ করে। পেলের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ। পরপর চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন। তার মধ্যে তিনবার নিজের দেশকে করেছেন চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বের আর কোনো ফুটবলারের তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের নজির নেই।
‘ফিফা’ ম্যাগাজিনের পাঠক ও জুরি বোর্ডের বিচারে পেলেই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফুটবলার। ইন্টারনেটে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের ভোট গিয়েছিল যদিও দিয়েগো ম্যারাডোনার পক্ষে। ফিফা শেষ পর্যন্ত যুগ্মভাবে দুজনকেই শতাব্দীসেরা ঘোষণা করে। বন্ধু ম্যারাডোনা ২০২০ সালে ৬০ বছর বয়সে প্রয়াত হন। এবার বিশ্ব হারাল পেলেকেও।
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের সুন্দর ফুটবলের শুরু তো সেখান থেকেই, যে জোগো বনিতোর সৌন্দর্য এখনো চোখে-মুখে মেখে রয়েছেন অগণিত ফুটবল পাগল। দিদি-ভাভার ব্রাজিল যে সুন্দর ফুটবলের জন্ম দিয়েছিল, তাকেই লালন-পালন করে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পেলেরা।
ফুটবলটাকে প্রিয়তমার মতো ভালোবাসতে শিখেছিলেন পেলে। সম্পর্কটা তাই রূপকথার মতো। তার একুশ বছরের ক্যারিয়ারে ১ হাজার ৩৬৩ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছিলেন ১ হাজার ২৮১ বার। এর মধ্যে ব্রাজিলের হয়ে ৯১ ম্যাচে করেন ৭৭টি গোল।
৮২ বছরের পেলে এবারো চেয়েছিলেন মাঠে বসে কাতার বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখবেন। সেই কাতার, যেখানে ১৯৭৩ সালে প্রথমবার সান্তোসের হয়ে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শরীর সায় দেয়নি। মরণ রোগের থাবা। তার মধ্যে আবার হূদযন্ত্রে সমস্যা। যেখানে সারা শরীরে বিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারদের দেয়া অসংখ্য চোট-আঘাত তাকে দমাতে পারেনি, সেখানে ক্যান্সারের কাছে তার কৃষ্ণকালো সুঠাম দেহটা ঠিকই বশ মেনে নিয়েছিল। অনেকবারই তাই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। ফুটবলের কিংবদন্তিকে নিয়ে তাই দুশ্চিন্তায় থাকত গোটা বিশ্ব। তাদের প্রার্থনার জোরে ফিরে এসেছেন।
পরিবার জানায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই শরীর ভালো যাচ্ছিল না পেলের। ২০১৫ সালে স্নায়ুর সমস্যায় তার মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারও করা হয়। কিডনি ও প্রস্টেটের সমস্যা নিয়ে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ফুটবলের এ কিংবদন্তি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মস্কোয় রাশিয়া বিশ্বকাপের এক অনুষ্ঠানে হুইলচেয়ারে বসা অবস্থাতেই দেখা গিয়েছিল তাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিডনি সমস্যা যেন মারাত্মক আকার ধারণ করে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে ভর্তি হন। রুটিন পরীক্ষায় এবার ধরা পড়ে একটি টিউমার। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা হয়। চলতি বছরের নভেম্বরের শেষের দিকে তাকে আবারো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এবার জীবনের ডি-বক্সে নিজেকে সঁপে দিলেন। ফুটবল, ব্রাজিল, জোগো বনিতো—সব পড়ে রইল। কিন্তু চলে গেলেন পেলে!










