চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পঞ্চবার্ষিক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সম্প্রতি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় অবসরের নতুন বয়সসীমা। এবার দেশটির সরকার বিষয়টিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে ১৯৭৮ সালের পর প্রথমবার অবসরের বয়স বাড়ল চীনে, একই সঙ্গে পেনশন ভাতার নিয়মে এল বড় পরিবর্তন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে বয়স্ক জনসংখ্যা। এ কারণে সৃষ্ট কর্মীস্বল্পতা এড়াতে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। খবর এফটি।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে, চীন ধীরে ধীরে সব পুরুষ কর্মীর অবসরের বয়স ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৩ বছরের উন্নীত করবে। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে দুটি ভাগ রাখা হয়েছে। হোয়াইট-কলার বা প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতে নারীদের অবসরসীমা ৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৫৮ বছর করা হয়েছে। ব্লু-কলার বা কর্মী পর্যায়ে বয়সসীমা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ বছর ধার্য হয়েছে।

অবসর-সংক্রান্ত এ নীতিগুলো ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। ছোট ছোট ধাপে নতুন নীতিগুলো পুরনো নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হবে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হতে ১৫ বছরেরও বেশি সময় নেবে।

কর্মীদের অবসরসীমা বিষয়ে কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন চীনের নীতিনির্ধারকরা। দেশটিতে অবসরের বয়স বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। ক্রমহ্রাসমান জন্মহার ও ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার বৈপরীত্য চীনে কর্মজীবী জনসংখ্যা ও পেনশনভোগীদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী সময়ের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় মন্থর প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে চীন। এর মধ্যে আবাসন খাতের পতন ও দুর্বল শ্রমবাজার সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। সম্প্রতি এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। সব মিলিয়ে গৃহস্থালি পর্যায়ে আর্থিক চাপ বৃদ্ধির মাঝে অবসর বিষয়ে সিদ্ধান্তটি এল। ১৩ সেপ্টেম্বর চীনা পার্লামেন্টের স্থায়ী কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। এর আগে জুলাইয়ে কমিউনিস্ট পার্টির পঞ্চবার্ষিক নীতিনির্ধারণী সভায় বিষয়টির প্রিভিউ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দুর্বল শ্রমবাজারের মাঝে নতুন এ পদক্ষেপ অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিদের সাহায্য করার জন্য তারা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন। এসব ব্যক্তির অনেকে ২০১৬ সালের বিলুপ্ত হওয়া ‘এক সন্তান নীতি’র কারণে নিজেদের ভুক্তভোগী ভাবছেন। এ নিয়মের কারণে তারা পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম সদস্য। এখন নিজেদের প্রয়োজন ও বয়স্ক আত্মীয়দের জন্য তাদের বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অবসরের বয়সসীমা তাদের কাজের পরিধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবসরের সময়সীমা বিষয়ক সিদ্ধান্তটি চীনের পেনশন ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। অনেক দিন ধরেই পেনশন তহবিলের অর্থের ঘাটতি দেশটিতে আলোচনায় রয়েছে। এখন বিশ্লেষকরা বলেছেন, আর্থিক সংকটপূর্ণ এ সময়ে শ্রমবাজারে কর্মীদের বেশি দিন ধরে রাখা গেলে পেনশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো যাবে।

শুক্রবার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে বর্তমানে চাকরিতে থাকা পুরুষ ও প্রশাসনিক পর্যায়ের নারীদের জন্য চাকরির মেয়াদ প্রতি চার মাসের বিপরীতে এক মাস বাড়ানো হবে। অবসরসীমার চূড়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত এভাবে বাড়তে থাকবে। অন্যদিকে কর্মী পর্যায়ের নারীদের ক্ষেত্রে প্রতি এক মাস কাজের জন্য চাকরির মেয়াদ দুই মাস বাড়ানো হবে।

নতুন নীতি অনুসারে, পেনশনের জন্য অর্থ জমার মেয়াদও আগের চেয়ে দীর্ঘ হবে। আগে এর মেয়াদ ১৫ বছর থাকলেও ২০৩০ সাল থেকে ন্যূনতম মাসিক ভাতার জন্য ২০ বছর পেনশন তহবিলে অর্থ রাখতে হবে। এ কারণে ২০ বছর না হওয়া পর্যন্ত প্রতি বছরের সঙ্গে আরো ছয় মাস যোগ করা হবে। তবে এরই মধ্যে যারা ন্যূনতম অবদানের মেয়াদে পৌঁছেছেন তারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যারা অবসরের বয়সে পৌঁছেছেন তারা আরো তিন বছর পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।

বিশ্লেষকরা আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, জনবিন্যাসে পরিবর্তন আসায় চীনকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতেই হবে। কেননা অবসর গ্রহণে সর্বনিম্ন বয়স এবং জন্মহার হ্রাসের কারণে কর্মজীবীদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্তদের অনুপাত বাড়ছে। গত বছর চীনের জনসংখ্যা টানা দ্বিতীয় বছরে ১৪০ কোটিতে নেমে আসে। ওই সময় নতুন শিশুর জন্মের তুলনায় ২০ লাখ বেশি মানুষ মারা গেছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুসারে, গত বছর চীনের বার্ধক্যজনিত নির্ভরতার অনুপাত ছিল ২১ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রে ছিল ২৭ শতাংশ। কিন্তু এ ব্যবধান ক্রমেই বিপরীত দিকে বাড়তে থাকবে। গবেষণা সংস্থাটি অবসরের বয়স হিসাবে ৬৫ বছরের সঙ্গে ১৫-৬৪ বছর বয়সীদের তুলনা করেছে। এ সংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ চীনে ৫২ শতাংশে উন্নীত হবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এর হার হবে ৩৯ শতাংশ। ২১০০ সালের বার্ধক্যজনিত নির্ভরতার হার চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে হবে যথাক্রমে ৮৩ ও ৫৫ শতাংশ।