রাজধানীর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে গতকাল এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে নির্বাচন-পরবর্তী উন্নত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার অত্যাবশ্যকীয়তা’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে ডিসিসিআই। সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এএইচএম আহসান।

সভায় যানজট, চাঁদাবাজি, উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স এবং আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ সময় ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা বলেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলো এককভাবে সমাধান সম্ভব নয়; বরং ব্যবসায়িক পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসায়ী সমাজ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় স্বাগত বক্তব্যে তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক জটিলতাসহ নানাবিধ কারণে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।’ তবে নবনির্বাচিত সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আরো বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের সমন্বয় আরো বাড়াতে হবে।’

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এএইচএম আহসান দাবি করেন সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে এবারের রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের খরচ কমবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পণ্যের মূল্যে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহযোগিতার জন্য সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।’ নতুন সরকার এ বিষয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই, যা গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিশ্চিতের মাধ্যমে আরো সহজতর হবে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি অধিশাখা) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইপিও নীতিমালা ২০২৫-২৮ প্রকাশ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যার ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম আরো সহজতর হবে।’ এলডিসি থেকে মসৃণ উত্তরণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় প্রায় পাঁচ লাখ নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত হওয়ায় যানজট প্রকট হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ এছাড়া ফুটপাত দখলমুক্ত ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে বলেও জানান তিনি।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি আবুল হাসেম বলেন, ‘যানজট ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ব্যবসার প্রধান অন্তরায়; যা নিরসনে সরকারকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করতে ভ্যাট ও ট্যাক্স বিষয়ে একটি সহনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।’

এ সময় বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি মো. গোলাম মওলা বলেন, ‘সংকটকালীন সময়ে বাইরে আমরা বাজার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করি না। প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহকালীন সময়ের সঠিক তথ্য আমাদের জানা থাকে না।’ এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি মোহাম্মদ আলী ভূট্টো বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়। এর ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের পণ্য আমদানিতে আরো বেশিসংখ্যক ব্যবসায়ীক অনুমতি দেয়া প্রয়োজন।’

সভায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল, ঢাকা চেম্বারের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি এমএস সেকিল চৌধুরী, বাংলাদেশ ক্রোকারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজি মো. মনির হোসেন ও নাহার কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।