প্রস্তাবটি পাস হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। খবর ফরচুন।
আগামী রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ গণভোটকে ঘিরে দেশটিতে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সুইজারল্যান্ডের সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পায়। বছরে সাধারণত চারবার এ ধরনের গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
প্রস্তাবটির পক্ষে রয়েছে ডানপন্থী ও জনতাবাদী রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্ট। দেশটির পার্লামেন্টে দলটির আসন সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে তারা অভিবাসন কমানো ও বিদেশী নাগরিকের সংখ্যা সীমিত করার পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছে।
প্রস্তাবটির সমর্থকদের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনের কারণে সুইজারল্যান্ডের অবকাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা, সামাজিক সেবা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবনযাত্রার ওপর চাপ বেড়েছে। তারা মনে করেন, জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে দেশের স্বকীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির জন্য এ উদ্যোগ ক্ষতিকর হতে পারে। তাদের মতে, সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে বিদেশী শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনশক্তির বড় অবদান রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক খাত, ওষুধ শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
দেশটির ফেডারেল সরকার ও পার্লামেন্ট উভয়ই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছে। সুইস ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ সংগঠন প্রস্তাবটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির মতে, এটি দেশের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নাগরিকদের অবাধে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ সহজ হওয়ার পর দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এ সময় জনসংখ্যা ২৩ শতাংশ বেড়ে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদনও ২৪ শতাংশ বেড়েছে।
সেন্ট গ্যালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেটো ফেলমি বলেন, ‘শক্তিশালী অর্থনীতি ও উন্নত জীবনযাত্রার কারণে বিদেশীদের কাছে দেশটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’
গণভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে সরকারকে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর আগেই যদি জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছে যায়, তাহলে সরকারকে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ, পারিবারিক পুনর্মিলন ও আবাসন অনুমতির ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
প্রয়োজনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মানুষের অবাধ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তিও বাতিল করতে হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রস্তাবটি পাস হলেও এর অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। কারণ লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা অনেক দীর্ঘ।
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক রেনে শভক বলেন, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ইইউর সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে দুই পক্ষের সম্পর্কের অবনতি অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপজুড়ে অভিবাসন দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়। অনেক দেশ প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করছে। একই সময় বিদেশীবিরোধী মনোভাবও বাড়ছে। তবে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় সুইজারল্যান্ডে অধিকাংশ বিদেশীই ইউরোপীয় নাগরিক। উল্লেখ্য, গত অর্ধশতকে দেশটিতে অভিবাসন নিয়ে একাধিক গণভোট হয়েছে।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, বিশ্বের কোনো দেশ এখন পর্যন্ত ভোটের মাধ্যমে জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেনি। যদিও অতীতে কিছু দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের এক সন্তান নীতির কথা উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক দেশ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করে। তবে জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে গণভোট আয়োজন করা নজিরবিহীন ঘটনা।










