নানামুখী সংকটে চাল রফতানিতে পিছিয়ে পড়ছে ভারত। চলতি অর্থবছর দেশটির চাল রফতানি ধসের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছর ভারতের চাল রফতানি কমে ১ কোটি ২০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। খবর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।

চলতি বছর করোনা মহামারীজনিত সংকটের কারণে ক্রমেই বাড়ছে চাল জাহাজীকরণ ব্যয়। রয়েছে কনটেইনারের অপ্রতুলতা। পাশাপাশি ভারতের চাল রফতানি বাজারকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে প্রতিযোগী দেশগুলোতে চালের নিম্নমুখী দাম।

বাজার বিশ্লেষকরা জানান, বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানে চালের দাম তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আমদানিকারক দেশগুলো এসব দেশ থেকে চাল আমদানি বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এতে করে ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারতের চাল রফতানিতে ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত অর্থবছর ভারত ৮৮৯ কোটি ডলার মূল্যের ১ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার টন চাল বিশ্ববাজারে রফতানি করেছিল। এটি ছিল যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বাধিক রফতানি। তবে চলতি অর্থবছর দেশটির রফতানি কমে ১ কোটি ২০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। ভারতের চাল রফতানিকারকরা এরই মধ্যে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মাসভিত্তিক চাল রফতানির চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। ১০-১২ লাখ টন চাল রফতানির চুক্তি করা হয়েছে।

ভারতের রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বিভি কৃষ্ণ রাও বলেন, ঊর্ধ্বমুখী জাহাজীকরণ ব্যয় রফতানিকারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বন্দরে পরিবহনসংক্রান্ত অন্য সুযোগ-সুবিধাও সংকুচিত হয়ে আসছে।

তিনি আরো বলেন, দু-তিন মাস ধরে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে কোনো কনটেইনারই বন্দর ছেড়ে যেতে পারেনি। ১৮ আগস্ট কাকিনাড়া বন্দরে অন্তত ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আটকে ছিল।

ভারতের নন-বাসমতি চাল বাণিজ্য দেশটির রেলওয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও উড়িশা থেকে আসা এসব চাল জাহাজীকরণের মূল বন্দর কাকিনাড়া। কিন্তু রেল সাইডিংয়ের অভাবে এ বন্দরে চাল পরিবহন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গভীর সমুদ্রবন্দরে সহজে চাল পৌঁছানোর সুবিধার্থে দেশটির রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে এরই মধ্যে রেল সাইডিং বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।

এদিকে গত বছর ভিয়েতনাম ভারতীয় চালের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের মে মাস থেকে দেশটি ভারত থেকে চাল ক্রয় বন্ধ করে দেয়। বিভি কৃষ্ণ রাও বলেন, ভিয়েতনামের আমদানিকারকরা চাল খালাসের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।

রাও জানান, গত বছরও ভারতের তুলনায় ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানের চালের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে এ বছর দেশটির চালের দাম কমতে শুরু করেছে। থাইল্যান্ডের প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম ৩৮০ ডলার। ভিয়েতনামে এক জাতের চালের দাম টনপ্রতি ৩৯০ ডলার। গত বছর দেশ দুটির প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম বর্তমান দামের তুলনায় ১০০ ডলার বেশি ছিল। এদিকে বর্তমানে রফতানিযোগ্য প্রতি টন ভারতীয় চালের দাম ৩৫০-৩৭০ ডলার।

চলতি অর্থবছর চীন ভারত থেকে বড় পরিসরে চাল আমদানি করবে। এ সময় দেশটি প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানি করতে পারে। ভারতীয় চালের অন্যান্য প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, নেপাল, পশ্চিম আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকা।

অল ইন্ডিয়া রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ভিনোদ কৌল বলেন, উচ্চ জাহাজীকরণ ব্যয় এবং কনটেইনারের দুষ্প্রাপ্যতা চাল রফতানির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাসমতি চাল রফতানি ১৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে হ্রাস পেয়েছে নন-বাসমতি চাল রফতানিও। অবস্থার উন্নতি না হলে অর্থবছরের শেষ নাগাদ বাসমতি চাল রফতানি ২৫ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে চাল রফতানি কমে ১ কোটি ২০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বাসমতি চাল রফতানি। নন-বাসমতি চাল রফতানিতে বাল্ক ব্রেক কার্গো ব্যবহার করা হলেও ৮০ শতাংশ বাসমতি চালই কনটেইনারযোগে রফতানি করা হয়। কনটেইনার সংকট এ জাতের চাল রফতানিতে বড় বাধা।