বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর একটি অস্ট্রেলিয়া। সেখানে লোকসংখ্যা কম। তাই অস্ট্রেলিয়ার নগর গণপরিবহনের সঙ্গে বাংলাদেশকে হয়তো মেলানো যাবে না। কিন্তু ভারতের জনবহুল কলকাতা, মুম্বাই কিংবা পাকিস্তানের করাচির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তুলনা করা অস্বাভাবিক নয়। উল্লিখিত তিনটি শহরের নগরায়ণ ও নগর পরিবহন ঢাকার মতো বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত নয়। একসময় কলকাতা খুবই ঘিঞ্জি ও অপরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল বেহাল। গত দুই দশকে কলকাতা সেই সমস্যা মোটামুটি কাটিয়ে উঠতে পারলেও ঢাকার অবস্থা আরো শোচনীয় হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অনুপযোগী শহরের তালিকায় এর নাম উঠে এসেছে।
কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা, নীতিমালা ও স্কিম প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলো অনুমোদন ও বাস্তবায়নের কাজ সমন্বয়ের জন্য ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি) গঠন করা হয়। ২০১২ সালে এটি ভেঙে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) তৈরি করা হয়। এরই মধ্যে ঢাকা মহানগরের জন্য একটি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সংস্থাটি, যার আলোকে ঢাকায় মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিটের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সম্প্রতি তারা দেশের সব নগরের পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে মন্ত্রী তাতে সায় দেননি বলে খবর মিলছে। মন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিটিসিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার অধিভুক্ত এলাকাতেই ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এমন অবস্থায় সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে সংস্থাটি তাদের মূল কাজই ঠিকমতো করতে পারবে না।’ মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে প্রতীয়মান হয় নগর পরিবহন উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না ডিটিএস। সুষ্ঠু নগরায়ণের অন্যতম শর্ত একটি গতিশীল, আধুনিক ও টেকসই নগর পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটি এখনো অর্জিত হয়নি। যানজটের কারণে কর্মঘণ্টা বিনষ্ট হওয়া থেকে উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে এবং সেটি অপরিকল্পিত। এ কারণে নিত্যনতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দুর্বল নগর পরিবহন ব্যবস্থা এর একটি অনুষঙ্গ বটে। সেক্ষেত্রে পুরো দেশের পরিবহন ব্যবস্থা সুষ্ঠু পরিকল্পনার আওতায় সাজাতে হবে। নইলে পুরো দেশের কার্যক্রমের গতি মন্থর হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেটি কোন সংস্থা করবে, তাও নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি।
নগরায়ণের কেন্দ্র এখন রাজধানী ঢাকা। এর যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা সেকেলে এবং উৎপাদনবিমুখ। এই দুরবস্থার একটি কারণ সমন্ব্বয়হীনতা। উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, পরিবহন ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা। আন্তঃপরিবহন বিভিন্ন মোডের মাঝে যেমন সমন্বয়হীনতা আছে, তেমনি আছে নগর পরিবহন ও আন্তঃপরিবহনের মাঝে, নগর পরিবহনের বিভিন্ন পরিবহন মোডের মাঝে। ঢাকার একমাত্র আন্তঃনগর নৌ টার্মিনাল সদরঘাট, আন্তঃনগর ট্রেন টার্মিনাল কমলাপুর ও আন্তঃনগর সড়ক পরিবহনের জন্য আছে পাঁচটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল। এসব টার্মিনালের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ঢাকার এই দৈন্যের আরেকটি বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। যদি প্রশ্ন করা হয়, এ শহরের অভিভাবক কে? এ শহরের বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নের কে সমন্বয় করবে? এ প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর নেই। ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধশতাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পৃথক চারটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় সাধন করবে এমন কোনো সমন্বয়ক প্রতিষ্ঠান নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়ের জন্য বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় তৈরি করা হলো ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড (ডিটিসিবি, বর্তমানে ডিটিসিএ)। নামেই কো-অর্ডিনেশন, না দেয়া হয়েছে তাকে আইনি ক্ষমতা, না আছে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। শুধু নামেই কো-অর্ডিনেশন, বাস্তবে সবাই স্বাধীন। তাই কোনো বিশেষ স্থানের সমস্যা সমাধানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
একসময় ঢাকার মতোই সমস্যাজর্জরিত ছিল পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতা। কয়েক বছর আগেও সেখানে আবাসিক এলাকাগুলো ঢাকার মতোই জরাজীর্ণ ছিল। ফুটপাত বেদখল, রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যাম, নোংরা, দুর্গন্ধ—এ যেন ঢাকারই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আজ সেই কলকাতা শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত। যেখানে ঢাকায় একটিও নগর বাস টার্মিনাল নেই, সেখানে শুধু কলকাতা শহরেই আছে ২৯টি নগর বাস টার্মিনাল। কয়েক দশক ধরে চলছে ট্রাম সার্ভিস। ১৯৮৪ সাল থেকে চলছে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো। এছাড়া আছে সার্কুলার মেট্রো সার্ভিস, আধুনিক বিশ্বে যেটাকে মনে করা হয় সবচেয়ে কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরে মেট্রো বা বিআরটির মতো সফল পরীক্ষিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করলেও পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে ওইসব গণপরিবহন ব্যবস্থা করতে হবে—এমন কোনো ভাবনা আমাদের শহর পরিকল্পনায় ছিল না। মেট্রো বা বিআরটি সফলভাবে পরিচালনার জন্য যে ধরনের জ্যামিতিক কাঠামোর প্রয়োজন হবে, এখন আর তা পুরোপুরি দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, যারা ব্যবহার করবে, তাদের আবাসিক এলাকা থেকে মেট্রো বা বিআরটি স্টেশন বা স্টেশন থেকে তাদের গন্তব্যে যাওয়ার যে সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন, তা প্রদান করার মতো অবস্থা এই অপরিকল্পিত জনবহুল শহরে নেই। কলকাতা শহরে আরো আছে নগর রেল সার্ভিস। শুধু ভূমিতে নয়, মাটির নিচেও আছে রেল সার্ভিস লাইন। আছে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে, একটি মেট্রোপলিটন বাইপাস। আগেই বলেছি, কলকাতার প্রাণ হুগলি নদীতে চলছে ওয়াটারবাস। আর এসব পরিবহন ব্যবস্থা একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, সহায়ক।
শুধু কলকাতা নয়, হায়দরাবাদ, দিল্লিসহ ভারতের অনেক শহরে এখন সফলভাবে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা তথা বিআরটি মেট্রো সার্ভিস চালু করা হয়েছে। শহরের পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। দুই বছর আগেও দিল্লির রাস্তায় কাঠ আর টিনের পাতের বাস চলত। সেই দিল্লিতে এখন সার্কুলার মেট্রো চলছে। পুরনো বাসের জায়গায় এসেছে আধুনিক বিআরটি বাস। তাই গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। সমন্ব্বয়হীন সব খণ্ড খণ্ড উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। সম্পূর্ণ ঢাকা শহরের জন্য মেট্রো, বিআরটি, কমিউটার রেল, সাব-আরবান রেল সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। নগর পরিবহন উন্নয়ন অর্থ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনাও উন্নয়ন। মাঝে অন্যান্য দেশের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজসের মাধ্যমে পরিবহন চলাচলের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও আজ পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি, যার বাস্তবায়ন জরুরি। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে অন্যান্য নগরের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে ডিটিসিএকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা চাইব, সরকার এর সক্ষমতা-দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুতই একটি সুষ্ঠু নগর পরিবহন ব্যবস্থা সৃষ্টি করবে। এর অভিজ্ঞতা পরবর্তী নগরগুলোয় প্রয়োগের মাধ্যমে দেশব্যাপী টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।










