কয়েক বছর ধরেই সংকটের আবর্তেই ঘুরছে দেশের ব্যাংক খাত। ব্যাংক খাতের সংকট আরো ঘনিভুত হচ্ছে দেশে করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর থেকে।সংকট এমনই যে ব্যাংক কর্মীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে,পিছনে সরে দাঁড়াবার আর একটু জায়গাও অবশিষ্ট নেই।একটি ব্যাংকের সংকট যখন শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায় তখনই ব্যাংক কর্মীদের বেতন হ্রাস, ছাঁটাই সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়।করোনাকাল শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনেরর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এবার সেই আতঙ্কই সত্যি হতে চলেছে।
জানা যায়, লোকসান ঠেকানোর জন্য ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড। প্রায় ১৬ শতাংশ বেতন-ভাতা কমিয়েছে বেতন কমানোর এই সিদ্ধান্ত চলতি বছরের ১ জুন থেকেই কার্যকর হবে। বহাল থাকবে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পাশা্পাশি কর্মীদের ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য ভাতার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে দ্য সিটি ব্যাংক। সিটি ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে, ৪ হাজার ৫০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদানে সিটি ব্যাংকের বছরে ব্যয় হয় ৫৪০ কোটি টাকার মত। তাদের হিসাবে চলতি বছরের জুন মাস থেকে বেতন-ভাতা প্রায় ১৬ শতাংশ কমানো হলে বছরে খরচ কমে যাবে ১০০ কোটি টাকা।
বেতন কমানোর তালিকায় আরো বেশ কিছু ব্যাংকের নাম শুনা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে করোনার আঘাত হানার পর সবার আগে কর্মীদের বেতন-ভাতায় ছুরি চালিয়েছে এবি ব্যাংক। গত মে মাসে ব্যাংকটির সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) থেকে এমডি পর্যন্ত পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের গ্রস বেতন-ভাতার ৫ শতাংশ কর্তন করা হয়। এন্ট্রি লেভেল থেকে প্রিন্সিপাল অফিসার (পিও) পর্যন্ত কর্মীদের বেতন-ভাতা কমানো হয় ৩ শতাংশ। মে, জুন, জুলাই-এ তিন মাসের জন্য ওই হারে বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবি ব্যাংককে কর্মীদের এ বেতন-ভাতা কর্তনের হার আরো বাড়ানো হতে পারে বলে আভাসও পাওয়া যাচ্ছে ।
বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেছেন, সবার আগে আমাদের ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি এখনো সম্ভব হয়নি। তবে সহসাই পর্ষদের সভা করে কর্মীদের বেতন কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মীদের বেতন কমানোর শতভাগ সঠিক, সাহসী সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। এজন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি (বণিক বার্তা ১৩ জুন)। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠনের নেতা এবং একজন অভিজ্ঞ উদ্দোক্তার এ ধরনের মতামতের প্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক কয়েকগুন বেড়ে গেছে।সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন, তার মত দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে এ ধরনের মতামত দেয়ার ফলে যে সব ব্যাংকের বেতন কমানোর কোন প্রয়োজন নেই তারাও অতি উৎসাহিত হয়ে উঠতে পারে। কোন ব্যাংকের বিশেষ প্রয়োজনে বেতন কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে এটা তাদের একান্তই নিজস্ব নিদ্ধান্ত। তাই বলে বেতন হ্রাসকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তপক্ষকে বিএবি-র পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানানো শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয় মানবতা বিরোধিও বটে।
কতিপয় ব্যাংকের কেন এমন অবস্থা সৃষ্টি হল যে, ব্যাংকারদের বেতন ভাতা হ্রাস করা ছাড়া তাদের কোন উপায় ছিল না। একটু পর্যালোচনা করে দেখি এজন্য ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটুকু দায়ী। সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বেতন ভাতা কমানোর তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংকের আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। দ্বিতীয়ত, বহু চেষ্টা করেও আমানতের সুদহার কমানো যাচ্ছে না, ব্যাংকের নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। তৃতীয়ত, ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না।ব্যাংকের একজন এমডিকে নির্দষ্ট সীমারেখার মধ্যে থেকে মতামত দিতে হয়। তাই হয়ত তিনি অন্য সমস্যাগুলোর কথা বলতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম দুটি সমস্যার জন্য ব্যাংক কর্মীদের বেতন কমানোর প্রশ্নই উঠেনা। তৃতীয় কারণটিই হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য ১(এক) নম্বর সমস্যা।অন্যান্য প্রধান কারণগুলো হচ্ছে শীর্ষ কতৃপক্ষের সীমাহীন দুর্নীতি,ক্ষমতার অপব্যাবহার, পরিবারতন্ত্র, পাচার, রাজনৈতিক পেশিশক্তির অপব্যবহার সর্বোপরি ব্যাংক লুটেরাদের বিপক্ষে সরকারী নীতির দুর্বল অবস্থান ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমূলে উৎপাটন করতে পারলে একজন ব্যাংক কর্মীরও বেতন কমাতে হবে না।
বেতন কাঠামো প্রথম হ্রাস করার ঘোষণা দেয় রাষ্ট্রায়াত্ব বেসিক ব্যাংক লি.। সূচনালগ্ন থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আর্থিক সূচকসমূহের ক্রমোন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকিং সেক্টরে একটি স্বচ্ছ, লাভজনক এবং ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল। সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যাবহারের কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি ক্ষতির মুখে পড়ে। গত ৯ বছরে এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে এ ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি টাকা। এটি বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে।
২০১৮ সালে বেসিক ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ৯ বছরে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০০৮ সালে রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংক ৫৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। আর ২০১৯ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ৭৫৬ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন সরকারঘনিষ্ঠ শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু। এই পাঁচ বছরে পুরো ব্যাংকটিকে ডুবিয়ে দিয়েছেন তিনি। আশ্চর্য ব্যাপার হল এই বাচ্চুর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুনীতি দমন ব্যুরো কেউই এতটুকু অপরাধ খুজে পায়নি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বীকার করে বলেছিলেন, বাচ্চু নাকি অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। রাঘববোয়ালরা নিরাপদে বসবাস করলেও এর দায় ভোগ করতে হল ছাপোশা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বেসিকের মত ফারমার্স ব্যাংককেও গিলে খেয়ে ফেলল কতিপয় রাঘববোয়াল অথচ ব্যাংকটির সে সময়ের চেয়ারম্যানসহ অধিকাংশরই কিছুই হয়নি, সমাজে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ঋণ খেলাপি শব্দটি এখন প্রায় নির্বাসনে চলে গেছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করার পরপরই বলেছিলেন, খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। কিছুদিন পর তিনি আবারও বলেছিলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার কোনো সুযোগই নেই। পরবর্তীতে দেখা গেল, মাত্র দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট করার মাধ্যমে শ্রেণিবিন্যাস করা ঋণ এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১০ বছর মেয়াদে পুন:তফসিলীকরণের সুবিধা দেওয়া হল। এর মাধ্যমে ঋণ খেলাপীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানিক রূপদান করা হল। কোন নির্দোশ ব্যক্তি থানায় এসে যদি পুলিশকে বলে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে আসামী করুন। ব্যাপারটা কীরকম মনে হবে? বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও ব্যাংকারদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। উল্লেখিত সুবিধা ঘোষনার পর বহু ভাল গ্রাহক ব্যাংকে এসে তদবির করা শুরু করলেন কীভাবে ঋণ খেলাপি হওয়া যায়। এটা হয়ত এদেশেই সম্ভব। ঋণ খেলাপিদের এসব অন্যায় সুবিধা দেয়ার ফলে মূলত খেলাপির মহাসমুদ্র তৈরির ক্ষেত্র তৈরি করা হল।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মুক্ত বাজার বলা হয়, তাহলে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশ বাধ্যতামূলক করা হল কেন? এটা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। তারপরও সুদ হার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। একবছর ১১ শতাংশ, পরের বছর ১০ এবং তারপরের বছর থেকে ৯ শতাংশ করলে ব্যাংকার-গ্রাহকদের মধ্যে সক্ষমতা তৈরি হত। পর্যায়ক্রমিকভাবে সুদ বাস্তবায়ন না করার ফলে ব্যাংকগুলো বিপাকে ফেলে দেয়া হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন দেশের ব্যাংকিং খাত হতে লুন্ঠিত লাখ লাখ কোটি টাকা লোটারদের নিকট হতে ফেরত আনার জন্য কঠোর হাতে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই এদেশের ব্যাংকিং ব্যাবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। যদিও এটা কোনদিনই সম্ভব হবেনা, কারণ ব্যাংক লোটেরা এতটাই ক্ষমতা সম্পন্ন যে তারা দেশের সমগ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান তো বটেই, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচার বিভাগ সহ নীতি প্রণয়ন তাদেরই পকেটে। আমরা মাঝেমাঝেই হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ইত্যাদি স্মৃতি পটে নিয়ে আসি আসলে বর্তমানে এসব গ্রুপ কতটি আছে কে জানে? এদেশের একজন বাচ্চুকে নিয়ে পত্র পত্রিকা সহ ইলেকট্রনিক গনমাধ্যম কতভাবেই তো প্রকাশ করল কিন্তু কাজের কিছুই হয়নি, হবেও না। কারণ এসব বাচ্চুদের প্রেতাত্বা এখন প্রায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথেই জড়িয়ে আছে। তাহলে শুধুই এক বাচ্চুকে দোষ দিয়ে লাভ কি?
দেশের অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন তারা সবাই কমবেশি দেশের নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সম্বন্ধে জানেন। অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে আইসিইউতে আছে। করোনাকাল শুরু হওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। তারপরও আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন নতুন করে “স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড” নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিল বিষয়টি বোধগম্য নয়।
দেশে অনেক বরেণ্য অর্থনীতিবিদ আছেন, কিন্তু দুঃখজনক হলে তারা তাদের বিভিন্ন লেখনি ও আলোচনায় ব্যাংক লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি মতামত দিতে চান না হয়তোবা দিতে পারেন না। বাংলাদেশের দুইজন যোদ্ধা খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ও ড. মইনুল ইসলাম আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে লড়াকু ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
করোনাকালে সবাই অতঙ্কগ্রস্থ। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোকে সুযোগ সন্ধানীর ভুমিকা পালন না করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবিক হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যাংক কর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে গেলে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ভেঙ্গে পড়তে পারে। কর্মীদের বেতন ভাতা হ্রাস বা কর্মী ছাঁটাই নয় বরং অপ্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যায় হ্রাস করা যেতে পারে। কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় সহ অন্যান্য কাজে অধীক মনোযোগী করে তুলতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে লুণ্ঠন ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
লেখক: এম এ মাসুম, অর্থনীতিবিদ










