খেলাপি ঋণসহ নানা কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত আগে থেকেই সংকটে ছিল। এখন করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবেলায় ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের ভার পড়ায় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। চাপটা দুই দিক থেকেই। এক. স্বল্পতম সময়ে গ্রাহকের কাছে ঋণের অর্থ পৌঁছে দেয়া এবং দুই. সেই ঋণ যথাসময়ে আদায় করা। পুরনো খেলাপি ঋণের সঙ্গে সংকটকালীন ঋণ প্যাকেজের অর্থ আদায়ের কাজটি নিঃসন্দেহে আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। এ অবস্থায় সুদক্ষভাবে পরিচালিত একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই ব্যাংকিং খাতের অপরিহার্যতা, প্রয়োজনীয়তা নতুনভাবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত সংশ্লিষ্ট ওয়েবিনারে আমন্ত্রিত বক্তাদের ভাষ্যেও এর অনুরণন ঘটেছে। তারা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং খাতকে আরো বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিরাজমান অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো নিরসনপূর্বক এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তত্ত্বাবধানমূলক ভূমিকা আশা করব।

বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সরকার তথা রাষ্ট্রের এখনকার বড় প্রাধিকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার। আধুনিক অর্থ ব্যবস্থার আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হিসেবে এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিশেষ সময়ে বিশেষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের কাছে প্যাকেজভুক্ত ঋণ পৌঁছে দিতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতে না পারলে ব্যাংকের পরিস্থিতি খারাপ হবে। এজন্য বক্তাদের আলোচনায় কাজের ক্ষেত্রে দ্রুততা এবং সাবধানতা উভয় বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ এসেছে। এটি আমলে নিয়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কর্তৃপক্ষের বিশেষ উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু সময়োপযোগী নীতি সহায়তার কারণে মহামারীতে আমাদের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়েনি। আপাতত খেলাপি ঋণ গণনা স্থগিত থাকায় গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ব্যাংকগুলোর মুনাফার হার বেশি। খেলাপি ঋণের সময় গণনা শুরু হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতেও পড়তে পারে। কাজেই বিরূপ অভিঘাত থেকে ব্যাংকিং খাতকে বাড়তি সঞ্চিতি সংরক্ষণের কথা বলা হচ্ছে। ঝুঁকি কমাতে এটি খুব জরুরি। করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক ভিত যাতে দুর্বল না হয়, সেজন্য অবশ্য ব্যাংকগুলোকে সাধারণ সঞ্চিতির পাশাপাশি সব ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু নির্দেশ দিলে হবে না, কঠোরভাবে এর পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

করোনা মহামারী এখনো চলমান, এর শেষ কবে, তা অজানা। সাম্প্রতিক সময়ে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ফের বাড়ছে বলে খবর মিলছে। কিস্তি পরিশোধে ছাড়ের ক্ষেত্রে আপাতত চলতি মাস পর্যন্ত একটি সময়সীমা ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতি পরিকল্পনা সাজিয়েছে। এর পরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বা ব্যবসায়িক-অর্থনৈতিক মন্দা প্রলম্বিত হলে কী করতে হবে তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এটি এখনই নির্ধারণ করা জরুরি। আগে থেকে প্রস্তুতি না নিলে হঠাৎ অবনমন হওয়া পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ বাস্তবায়ন সহজতর করতে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কম-বেশি আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতোই নীতি উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তফাত হলো, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিতভাবে তত্ত্বাবধান করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্ষেত্রে কিছুটা খামতি রয়ে গেছে। যেমন ছোটদের প্রণোদনা প্যাকেজভুক্ত ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিতে শর্ত শিথিলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হলেও তাতে খুব একটা অগ্রগতি নেই। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে নজরদারির অভাবে ব্যাংকগুলো ছোটদের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ওয়েবিনারে আলোচনায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য তাদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব এবং ফেরত না আসার ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। দেশটি একে তো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কোনো ধরনের জামানতবিহীন ঋণ দিচ্ছে, তদুপরি ব্যাংকগুলো যাতে তাদের ব্যাপারে আগ্রহী হয়, সেজন্য ওইসব ঋণের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ শতাংশ ক্রেডিট গ্যারান্টি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এটি অনুসরণ করতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো ছোটদের ঋণ প্রদানে আগ্রহী হবে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহায়ক হবে বৈকি। কাজেই এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় নীতি নির্দেশনার পাশাপাশি তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতে তদারকি বাড়াতে হবে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, কেবল আশু অর্থনৈতিক উত্তরণ নয়, নিকট ভবিষ্যতে দেশকে উচ্চমধ্যম আয় ও ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যও একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত প্রয়োজন। কাজেই এ খাত ঘিরে সমস্যাকেন্দ্রিক তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। ব্যাকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ঋণ-আমানত অনুপাত সীমার শর্ত পূরণ, পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলীকরণ নীতি, শ্রেণীকরণের বিন্যাস, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন, তারল্য পরিস্থিতি, স্বীকৃত ঋণমান প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিতসহ অন্যান্য সূচকেও আমাদের ব্যাংকিং খাত এখনো আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও উত্তম চর্চাগুলোর উল্টো রথে অবস্থান করছে। আপত্কালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনা সংকটে নীতিগত কিছু ছাড় দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানদণ্ডগুলো পরিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। নইলে সংখ্যার দিক থেকে বাড়লেও ব্যাংকিং খাত মোটেই স্থায়িত্বশীল হবে না।

আজকে পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাত গুটিকয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এটি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক চলনের বাইরে সংশ্লিষ্ট খাতের গভীর বাজার ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতার দিকটিই তুলে ধরে; ব্যাংকিং ইকো সিস্টেমের জন্য যা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। এটি বদলাতে ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার জরুরি।