করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এবং ব্যবসা ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন খাতকে প্রণোদনা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিল, যার দায়িত্ব বর্তায় ব্যাংকের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় তার বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে। ফলে ব্যাংকের হাতে তারল্য বেড়েছে। কিন্তু করোনার মধ্যে বিনিয়োগ স্থবির ও ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকের হাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ জমেছে। সরকার ঘোষিত বৃহৎ শিল্পের প্রণোদনার অর্থ ব্যাংকগুলো প্রদান করতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনা এখনো বণ্টন করতে পারেনি। এর জন্য অবশ্য আমলাতান্ত্রিক বিভিন্ন জটিলতাই বেশি দায়ী। বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি অংশ তাড়িত, একটি দেশজ এবং অন্যটি রফতানি খাত। বৈশ্বিক করোনার প্রেক্ষাপটে রফতানি খাত সহসাই ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করা যাচ্ছে না। রফতানি খাতে গতি আনা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভবও নয়। সেক্ষেত্রে দেশজ উৎপাদনশীল খাতকে গতিশীল করাই একমাত্র পথ। কিন্তু সেটিও কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় থমকে আছে। দেশজ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ অধিকার করে আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এর অধিকাংশই করোনার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ পায়নি। ফলে তারা ঘুরে দাঁড়াতেও সময় নিচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ৬০ শতাংশই দেশজ উৎপাদন ও ভোগের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়েছে কিন্তু বাজারে অর্থের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো এক ধরনের ফাঁদের মধ্যে পড়েছে। একে তারল্যের ফাঁদ বললে অত্যুক্তি হবে না। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদান ও ব্যবস্থাপনায় আরো সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সরকারকে কভিড নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নে দৃষ্টি দিতে হবে। রাজস্ব খাতেও প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে শুধু মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে উদ্দীপ্ত করা যাবে না। ব্যাংকের ঋণ প্রদানে এসএমই খাতকে প্রাধান্য প্রদান ও ভোগ বাড়াতে সরকারকে নতুন পথের অনুসন্ধান করতে হবে। যে পদক্ষেপই নেয়া হোক না কেন, লক্ষ্য থাকতে হবে দেশজ উৎপাদনশীল খাতকে চাঙ্গা করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের হাতে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। এতে ভোগ ব্যয় বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে দেশজ অর্থনীতি গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে রফতানি খাতে সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
ব্যাংক টাকা নিয়ে বসে আছে, কিন্তু ঋণ নেয়ার লোক নেই, এমন অবস্থা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। বোঝা যায় সমস্যা অনেক গভীরে। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদান করে যে সুদ অর্জন করে, তার একটি অংশ যায় আমানতের ওপর সুদ দিতে, আর একটি অংশ দিয়ে ব্যাংকের নিজস্ব ব্যয় নির্বাহ হয়। ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার অর্থ ব্যাংকের আয়ও হ্রাস পাবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের অসংগতি আশঙ্কাজনক। সিংহভাগ বেসরকারি ব্যাংক এতদিন করপোরেট খাতে বড় ঋণ বিতরণেই আগ্রহী ছিল বেশি। এ কারণে ব্যাংকগুলোর জনবল কাঠামো ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বিকশিত হয়েছে মূলত করপোরেট ঋণকে কেন্দ্র করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি এখন বড় করপোরেট ঋণেও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে ব্যাংক কর্মকর্তারাও এখন করপোরেট ঋণ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। আবার এসএমই খাতে ঋণ দিতেও ভয় পাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে রিটেইল খাতে ভালো বিনিয়োগ আছে এমন ব্যাংকগুলোই কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে আছে। বড় বিনিয়োগকারীদের কাছে এ মুহূর্তে ঋণের চাহিদা নেই, কারণ বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা তলানিতে। এটি চাঙ্গা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো শুরু থেকেই দক্ষতা আর সক্ষমতা দেখিয়ে আসছে, প্রতিকূল অবস্থায়ও প্রডাক্ট ইনোভেশন দেখিয়েছে এবং লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ‘কোলাট্যারাল সিকিউরিটি’র কারণে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য ঋণ নেই, নেই কোনো পণ্যও। মোবাইল বা টিভি মেকানিক, স্যালুন, ছোট ছোট দোকান যারা চালান, তারা কি ঋণ পেতে পারেন না? ট্রেড লাইসেন্স নেই, এমন যোগ্য প্রার্থীও নিশ্চয়ই আছেন। নিশ্চয়ই ব্যাংক কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হতে চাইবে—ব্যবসার বার্ষিক আয়, ঋণের প্রয়োজন এবং ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা। ব্যাংকিং জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এ ক্ষুদ্ররা বাধ্য হয়ে চড়া সুদে ঋণ নেন ব্যক্তিগত সুদ ব্যবসায়ী বা ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ী এনজিওর কাছ থেকে।
আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের নিচে নেমে এলেও ব্যাংকগুলোয় আমানত আসার প্রবণতা বাড়ছে। ব্যাংকে আমানত এলেও তারা সেভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না। সাধারণ মানুষের কাছেও কোনো বিকল্প নেই। নিশ্চিত মুনাফা ও নিরাপত্তা ভাবনায় তারা ব্যাংকগুলোতেই টাকা রাখছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খাতায় অনাদায়ী ঋণ জমেছে। সেই বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে ভাবতে হবে। কনজিউমার ঋণ প্রদান করে ভোগ বাড়িয়ে অর্থনীতির গতি হয়তো কিছুটা বাড়ানো যাবে, তবে কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে হলে অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা প্রয়োজন। ব্যাংকে তারল্য জমেছে বলে যথেচ্ছভাবে এটি ব্যবহার করা যাবে না। এতে ঋণখেলাপি আরো বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম পথ হলো, এসএমই খাতে ঋণের জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোগকে প্রণোদিত করা। কনজিউমার ক্রেডিট একটি সম্ভাব্য বিকল্প হলেও এটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনশীল খাতে অর্থের ব্যবহার বাড়াতে হবে, যা শুধু সুদের হার বা এডিআর, সিআরআর কমিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য উৎপাদন সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত ও রাজস্ব-উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে।










