কভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশে মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। এর পর থেকে শিক্ষার পরিস্থিতি একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে। সাত মাস আগেও শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন আক্ষরিক অর্থে ফাঁকা অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। আর শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে শিক্ষা-শ্রেণীকক্ষ থেকে। মাঝখানে তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও থমকে গেছে। বর্তমানে তারা ঘরবন্দি হয়ে আছে। স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাইরে যাওয়ার জো নেই। মাঠে আপাতত খেলার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের। ফলে সব মিলিয়ে তারা এখন এক পীড়নকর সময় পার করছে, যা তাদের মনস্তত্ত্বে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, বিশেষত কভিড-১৯-এর কারণে শিক্ষার্থীরা এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তরুণ সমাজ ভীষণ সংবেদনশীল হওয়ায় স্বভাবতই এ ধরনের মনঃসামাজিক পরিবেশে তারা বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা বিশেষত বিষণ্নতা ও হতাশায় ভোগে। এতে তারা অনেক সময় আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। কেউ কেউ আবার নেশায়ও আসক্ত হয়ে পড়ে। এ-সংক্রান্ত খবর আজকাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মাঝেমধ্যেই আসছে। মহামারী একসময় থামবে। কিন্তু এর প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মনোদৈহিক জীবনধারায় যে বিপর্যয় ঘটছে, তার রেশ পড়বে পরিবার ও সমাজে। কাজেই প্রতিকূল সময়টি খুব সাবধানতার সঙ্গে পাড়ি দেয়ার জন্য সর্বোত সহযোগিতা দরকার। এর মধ্যেও একটি সহায়ক মনঃসামাজিক পরিবেশ বিনির্মাণে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেতে হবে বৈকি।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, শিক্ষার্থীরা আপাতত ঘরে বসে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকের পক্ষে আবার তারও উপায় নেই। কারণ তাদের হাতে সব বই-ই নেই। অনলাইনে কিছু ক্লাস নেয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দেশের সব প্রান্তে এর সমান সুফল মিলছে না। কেননা গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে সাইবার প্রযুক্তি পৌঁছেনি। আবার দূরশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কিছু ক্লাস সংসদ টিভিতে সরকার প্রচার করলেও সব শিক্ষার্থীর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। কারণ অনেক পরিবারে টেলিভিশন নেই। ফলে চলমান মহামারীতে শিক্ষায় ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্যও ভীষণভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। এটিও বিশেষত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের বৈষম্যজনিত মানসিক পীড়ন কীভাবে নিরসন করা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তার উপায় অন্বেষণে তত্পর হতে হবে।

এটা সত্য যে করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন স্বাভাবিকতায় অনেক কিছু বদলে যাবে। শিক্ষা খাতেও এর একটা প্রভাব থাকবে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ফিরলেও তাদের আসনবিন্যাসে বড় পরিবর্তন আসবে। অনলাইননির্ভর পাঠদান ভবিষ্যতে বাড়বে। এসব বিষয় মাথায় নিয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের নতুন পরিবেশে অভিযোজন করায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের মানসিকতা পরিবর্তনে শিক্ষক ও অভিভাবকদের গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ছুটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। সরকার এ শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে অনলাইন পাঠদানে জোর দিলেও ইন্টারনেট ও ডিভাইস না থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ সুবিধার বাইরে থেকে গেছে। একদিকে অনলাইন শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার এখনো ইন্টারনেট থেকে ভ্যাট নিচ্ছে। এগুলো সাংঘর্ষিক। সবার জন্য ইন্টারনেট সুলভ করতে হলে এর ব্যয় কমাতে হবে। এর আরো প্রসার ঘটাতে হবে। প্রয়োজনে অনলাইনে বিনা ব্যয়ে যেন শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণে অংশ নিতে পারে, তার জন্য সর্বত্র সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার কিছু দেশ দূরশিক্ষণ ও অনলাইন শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে। এসব দেশের নীতি ও অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ঝরে পড়া রোধে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো যায়, তার উপায়ও বের করা জরুরি।

আরো কতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে, সে বিষয়টি অনিশ্চিত। সুতরাং শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার কাজটি অভিভাবকদেরই করতে হবে। কোনো ধরনের হতাশায় যেন তারা না ভোগে এবং গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত থাকে, তার জন্য পরিবারের সদস্যদের তাদের গুণগত সময় দিতে হবে। পড়াশোনায় তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণেও সর্বোচ্চ চেষ্টা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে চিত্তবিনোদন ও ইনডোর খেলারও ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের সামাজিক দক্ষতা অর্জনও ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা যেন বাসা-সংলগ্ন সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। শিক্ষায় কভিডের ক্ষত অনেক গভীরতর। আগামীতেও এর রেশ রয়ে যাবে। শিক্ষা প্রশাসক ও নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি ভুললে চলবে না। সুতরাং তার জন্য এখন থেকেই কাজ করতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের প্রত্যেক উপজেলায় একজন করে চাইল্ড সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে চিন্তা করছে। এটা ইতিবাচক। এর সফল রূপায়ণ জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষা অনকূল পরিবেশ তৈরি হবে, এটিই প্রত্যাশা।