সারাদিন গুঞ্জন, আর অনেক প্রত্যাশার মাঝে শেখ মুজিব (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সেদিন ছিলেন বাঙালির প্রতিবাদের স্বরূপ এবং তিনি এটাও উপলব্ধি করেছেন, জীবিত শেখ মুজিব আর মৃত শেখ মুজিব কেবল সময়ের ব্যবধান বাংলার স্বাধীনতার জন্য। তাই তিনি বাঙালির বীরত্ব বহন করে শত্রুবাহিনী – পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের কাছে মাথা নত না করে গ্রেফতার বরণ করেন। গ্রেফতার বরণের পূর্ব মুহূর্তে শুরু হয় ধ্বংসলীলা। রাজারবাগ পুলিশ স্টেশন, ইপিআর ঘাটি পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হলসহ প্রভৃতি বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতিরক্ষার ইউনিটগুলিতে আক্রমণ চলে। আর তখনই তিনি তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়ারলেসের মাধ্যমে প্রদান করেন।

এর সাক্ষী হিসেবে হাজী গোলাম মুর্শেদ, যিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে ছায়ার মত লেগে থাকতেন। তার বর্ণনায় তিনি জানান যে ২৫ মার্চ রাত ১২টার পরে হঠাৎ বলদা গার্ডেনের ঠিকানা উল্লেখ করে একটি টেলিফোন আসে এবং জানানো হয় যে বঙ্গবন্ধুর বার্তা প্রেরণ করা হয়ে গেছে এখন আমরা কি করব। এই সংবাদ বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করলে বঙ্গবন্ধু জানান যে ‘ওকে বল ট্রান্সমিটারটা ভেঙে ফেলে দিয়ে ওকে পালিয়ে যেতে বল’। এই প্রত্যক্ষ কথোপকথনে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বলদা গার্ডেন ঠিকানায় বার্তা প্রেরক কর্তৃক বেতার ট্রান্সমিটার থেকে স্বাধীনতার বাণী ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে প্রচারিত হয়েছিল। যা তখন (প্রমাণ হিসাবে) বিশ্বের বেশ কয়েকটি বেতার যন্ত্রে তা ধরা পড়ে।

গোলাম মোরশেদ আল্লাহর রহমতে আজো জীবিত আছেন। তিনি একজন নিরহংকার, প্রচার বিমুখ, কট্টর স্বদেশ প্রেমের অত্যন্ত সৎ সামাজিক কল্যাণধর্মী একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। অরাজনৈতিক সুধীমহলে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে তিনি কেবল শেখ মুজিব গৃহীত কর্মসূচি ঘরে বসে সেই পুরানো দিনের এক টেলিভিশনে চোখ পেতে থাকেন। আর পড়াশোনা করেন, পত্রিকা ও বইপত্র পড়েন। শুধু আফসোস করেন এই বলে যে, বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েছেন সপরিবারে। স্বাধীনতা সংগ্রামকে নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা শহীদ হলেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নিরীহ সদস্যগণকে হত্যা করা হল। এই রাজনীতি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা ভগ্ন হৃদয়ে শুধু এক শেখ হাসিনার প্রতি তাকিয়ে থাকি। আমরা কি সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করি নাই? সত্যিকার অর্থে আমরা বড় অভাগা। যে মানুষটি সমগ্র বাঙালি জাতিকে একটা আত্মমর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে জীবনকে সবকিছু ত্যাগ করে শ্রম দিলেন আর আমরা তাকে সপরিবারে হত্যা করলাম। ওদিন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থাকলেও হয়তো তারা মারা যেতেন! 

আজ স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে যে মতপার্থক্যের বক্তব্য দেয়া হয়ে থাকে তা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় কখনো বলা হয়নি। আজ কেন সংবিধানের সত্য জিনিস বিতর্কিত করা হচ্ছে? আমরা স্বাধীনতা, সাম্য এবং একতা ভুলে গেছি বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সৌহার্দ্য ভুলে গেছি। 

জাতির জনকের স্বাধীনতার ঘোষণাটি ছিল ইংরেজি ভাষায়, ‘This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last.Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved...’ এবং তদানীন্তন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) পিলখানা ঘাঁটির ট্রান্সমিটার এর মাধ্যমে তা প্রচারিত হয়। এর অনেক দলিল পাওয়া যায়। 

১৯৯৮ সালে সর্বনন্দিত প্রজ্ঞাবান ও খ্যাতিমান আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রয়াত গাজী শামছুর রহমানের সাথে রিকশায় করে তার মোহম্মদপুর গজনবী রোডের বাড়ি থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যাওয়ার পথে ফার্মগেটের চত্বরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘নানা, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিএনপি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করেন, এর উপর আপনার মন্তব্য কি?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘জিয়াউর রহমান এর পরিবর্তে আমি গাজী শামছুর রহমান থাকলে একই কাজ করতাম ; তাই বলে কি আমার নাম হবে? আমি বা জিয়া কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেছি- কাজটিকে সেভাবেই দেখতে হবে। আর এসব বিষয় সংবিধানের অংশ; যা অস্বীকার করলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হবে। আমি ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস অস্বীকার করলে আমার বিরুদ্ধে সেকারণে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হতে পারে।’

অতএব, কদাচারে বিভক্ত না হই; সাম্য, মৈত্রী স্বাধীনতা, একতার বন্ধনে সন্ত্রাস- দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার মহান ব্রত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপের সোনার বাংলাদেশ হোক আমাদের বাসযোগ্য মাতৃভূমি ও আবাস।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত কর কমিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড