নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বেই ব্যবসা-কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। চাকরি হারিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এর মধ্যেও প্রবাসী বাংলাদেশীরা রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে রেকর্ড গড়েছে। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি আজও উপেক্ষিত। বিদেশে কর্মরতরা প্রায়ই নানা ধরনের অনিয়মের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংগঠনগুলোর প্রতি। তিনি বলেছেন, ‘শ্রমিকদের যথাযথ মর্যাদা দিন এবং তাদের যেন কোনো রকম সমস্যা না হয়, সেটা নিশ্চিত করুন।’

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের একটি। এক যুগ ধরে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন গড়ে ছয় থেকে সাত লাখ মানুষ। এ হিসাবে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার কর্মী বিদেশ যাওয়ার কথা। কিন্তু করোনার কারণে এপ্রিল থেকে বিদেশে লোক পাঠানো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সামান্য কিছু কর্মী যেতে পারলেও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে লাখো কর্মীর ভবিষ্যৎ। তাছাড়া টিকা এলেও এর প্রয়োগসহ নানা জটিলতায় অনেক দেশই কর্মী নেয়ার ক্ষেত্রে আপাতত উৎসাহী হচ্ছে না। তাই শিগগিরই পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বন্ধ, অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিনই চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকে ফিরছেন কর্মীরা। সবচেয়ে বেশি কর্মী ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখের বেশি কর্মী ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৪৪ হাজারই নারী কর্মী। সংখ্যা বেড়েছে সৌদি আরব থেকে নিপীড়িত নির্যাতিত হয়ে ফেরা নারী শ্রমিকদের, যা আমাদের শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা দেখতে চাই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অর্থের বিনিময়ে প্রবাসে কর্মী পাঠিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিদেশে আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি তাদের কাঁধেও বর্তায়।

বাংলাদেশ থেকে যত লোক বিদেশে যায়, তাদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা পেশাদার লোকের সংখ্যা মাত্র ২ শতাংশ। বাকি যারা আছেন, তারা অদক্ষ বা আধা দক্ষ। বেশির ভাগই নির্মাণ শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক লাখ বাংলাদেশী আছেন, যারা তথাকথিত ফ্রি ভিসায়  গেছেন। এর মানে তাদের কাগজে-কলমে মালিক থাকলেও বাস্তবে নেই। করোনা পরিস্থিতি শুরু হলে শূন্য হাতেই এসব শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। অদক্ষ বা আধা দক্ষ হওয়ায় স্বল্প মজুরির কাজ নিয়ে বিদেশ গমন করায় একদিকে যেমন কর্মক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হয় না, তেমনি নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারে না। অথচ আমাদের কর্মীরা যদি শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হতেন, তাহলে নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো এড়ানো সম্ভব হতো। দেশে ফিরেও তারা নানা সংকটের মুখোমুখি। সরকারের পক্ষ থেকে আর্থসামাজিকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেখানে নানা জটিলতা দৃশ্যমান। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদানের কথা বলা হলেও খুব বেশি সহায়তা তারা পাচ্ছেন না। কার্যত কর্মহীন হয়ে অসহায় ও মর্যাদাহীনভাবেই দিনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। এক্ষেত্রে টেকসই পুনরেকত্রীকরণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বিদেশফেরতদের দক্ষতার তালিকা করে দেশের ভেতরেই চাকরির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। পাশাপাশি এ কর্মীদের ঘিরে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনও প্রয়োজন। 

করোনা-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা পরিবর্তিত হবে। পোস্ট-কভিড বাস্তবতায় বদলে যাবে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরনও। নতুন এ রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জন জরুরি। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আমরা আমাদের শ্রমিকদের যতটা কারিগরি ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তুলতে পারব, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় তত বেশি এগিয়ে থাকব। বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন ঘটিয়ে পুনরায় বিদেশ প্রেরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া তাদের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কী ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এর সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানও জরুরি।

আশার কথা, সারা বিশ্বেই কৃষি, ইমারত নির্মাণ, হসপিটালিটি/কেয়ারগিভার খাতে কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। করোনার কারণে যেসব পেশার চাহিদা বেড়েছে, সেসব পেশায় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতে কোন খাতের কর্মী পাঠানো যেতে পারে এবং তাদের দক্ষতা কী হবে, সে অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি নেয়াটা হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিকে (বায়রা) উদ্যোগী হয়ে সরকারের সঙ্গে কাজে নামতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকেও। আমরা যদি বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী আমাদের শ্রমিকদের দক্ষ করতে পারি, তাহলে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় আমাদের কর্মীরাই এগিয়ে থাকবেন। পাশাপাশি মানব পাচার বা অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। এভাবেই প্রবাসী শ্রমিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব হবে।