‘আখে লাভ দ্বিগুণ। কিন্তু ওই ধরেন শুরুতিই আম্ফান আইসে আখের ক্ষেত শুই দি গিয়েছে। তারপর আবার বইন্যা। পানির মদিত্তি আখ তুলছি, খচরই উঠাতি পারলাম না। এবেড্ডা আর দাঁড়ানুই গেল নাহ।’ ফোনের ওপারে হাহাকার টের পেতে বিশেষ কষ্ট হয় না। যশোরের শর্শা উপজেলার চাষী রহমত হোসেন, আম্ফান ও বন্যার দুদফা আক্রমণে টালমাটাল হয়ে এভাবেই নিজের অবস্থার কথা জানাচ্ছিলেন। সারা দেশে যখন বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, তখন ভারতের ইছামতি নদীর উজানের পানিতে তলিয়ে গেছে শর্শা উপজেলার দক্ষিণাংশের ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৪শ হেক্টর জমির ফসল।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছিল, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের বন্যাকবলিত অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি পুর্বাভাসের উন্নতি হয়েছে। তাদের পুর্বাভাসের সত্যতা প্রমাণ করতেই কিনা প্লাবিত হওয়ার ৩৪ জেলার নিম্নাঞ্চলের ৩১ জেলাতেই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। ৩৪ জেলার মোট ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক  ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৩ জেলায় ১০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ জন কৃষক। তবে এই হিসাব আংশিক। যেহেতু প্রতি ঘন্টায়, প্রতি দিন, প্রতি সপ্তাহে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে, তাই সঠিক হিসাব রাখাটাও বেশ কষ্টসাধ্য। শুধু এটুকু নিশ্চিত, ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

বন্যাকবলিত মানুষের সংগ্রাম মূলত দুইভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে প্লাবিত হওয়ার পর। এই সময়টা তুলনামূলকভাবে ‘ভালো’। ‘ভালো’ এই কারণে যে, বন্যার পানিতে যখন অঞ্চলগুলো ডুবে থাকে, তখন গণমাধ্যমে নিয়মিত কাভারেজ হয়, ত্রাণের পরিধি বাড়ে, সরকার, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যেই না পানি নেমে যায়, এসব আয়োজনও কমে যায়। এই সময়ে বন্যাকবলিত মানুষগুলো একেবারে একা হয়ে পড়েন। অথচ, সংগ্রামের এই দ্বিতীয়ভাগটিই সবচেয়ে কঠিন। সেটা যেমন খাদ্য সঙ্কটের দিক থেকে, তেমনই উপার্জন, স্বাস্থ্যবিধি এবং সর্বপরি আবারও জীবন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে তোলার দিক থেকে। 

বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছরের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বরাবরের মতো এ বছরেও কুড়িগ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। বন্যা যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন কুড়িগ্রামের মানুষ বাঁচার তাগিদে রাজপথে উঠে এসেছিল, সেখানে পলিথিনে মোড়া সংসার বেঁধেছিল। এই জেলার বন্যার পানি নেমে গেছে। খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু মাথায় হাত কৃষকের। সদর উপজেলার ধরলা নদীর পাড়ের কৃষকদের একেবারে ডুবিয়ে মেরেছে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র এই জেলার ধরলা নদীর দুই ধারে ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় ১০ টি ইউনিয়ন সবজি আবাদের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এবারের বন্যায় সে আবাদের সুখ শেষ। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন হাজার হাজার কৃষক। ঝিঙ্গা, করলা, মরিচ, বেগুন আর পটল মরে, পচে শেষ। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ৩ দফা বন্যায় জেলার মোট ৯৫৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

প্রায় দুই মাসব্যাপী দীর্ঘ বন্যায়, দুর্গত এলাকার মানুষের একার পক্ষে বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে পারা সম্ভব, তা সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। তাদের এই দুর্ভোগ প্রতি বছর চক্রাকার হারে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু এসব অঞ্চল মূলত কৃষিকেন্দ্রিক, তাই দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রকৃতির ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করার থাকে না। ফলাফল, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কৃষকের মাথায় বাড়ে ঋণের বোঝা। সেই ঋণ শোধ হওয়ার আগে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও বন্যা, আবারও নতুন ঋণের সন্ধান। একে তো করোনাভাইরাসের প্রভাবে মার্চ থেকে কৃষকের অবস্থা এমনিতেই সঙিন, সঙ্গে আম্ফান কবলিত এলাকায় মড়ার উপর ঘা। তারপর এই বন্যা। 

দেশের মোট ফসলের ৮৫ শতাংশ শতাংশ উৎপাদন করেন যেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, এবং কৃষি শ্রমিক যারা এই কাজের বাইরে অন্য কোন কাজ করেন না, তারা এরই মধ্যে খেই হারিয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর হেক্টরের পর হেক্টর জমি ফাকা পড়ে আছে। কৃষকের পকেটে পয়সা নেই, বীজ নেই, চারা নেই। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যগত দুর্ভোগ। গত ২০ জুন থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ১৬৯ জন। বজ্রপাতে ৩৩ জন, সাপের কামড়ে ১৭ জন, ডায়রিয়ায় ১ জন ও অন্যান্য কারণে ২ জন সহ মোট ২০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা আরও বৃদ্ধি পাবে, বাড়বে পানিবাহীত রোগের আক্রান্তের সংখ্যা।

এই সবকিছু পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে, বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি সামালে সরকারের সামনে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এই চ্যালেঞ্জ সরকার মোকাবেলা করবেন কিনা, তা একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। কারণ যারা বন্যাদুর্গত এলাকার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা রাখেন, তারা জানেন বন্যাপরবর্তী সময়ে দুর্গত এলাকার মানুষগুলো নিজেরাই বিভিন্ন ঋণ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন।

আর এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্থ ৫০ লাখের বেশি মানুষ, যারা সার্বিকভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত, তাদের জন্য প্রয়োজন বড় ধরণের খাদ্য সহায়তা। সেই ধারাবাহিকতায়, বন্যা দুর্গতদের মাঝে আগামী ৬ মাস বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা জরুরি। এখানে সবচেয়ে জরুরি হলো এলাকাভিত্তিক পরিস্থিতি বুঝে এসব সহায়তা সরবরাহ করা। আমরা দেখেছি, বন্যাকালীন সময়ে বারবার একটা অভিযোগ এসেছে, তা হলো যেসব এলাকা আংশিক প্লাবিত হয়েছে, সেখানে যে পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে, সেই একই পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে প্লাবিত হওয়া এলাকায়। এতে করে বন্যার্তদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিচ্ছে। তাই বন্যার পরিস্থিতি বুঝে ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ করা, ত্রাণ কার্যক্রমে বেসকারি সংস্থাসমূহকে এগিয়ে আসা এবং এই জাতীয় দুর্যোগে সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম সমন্বিতভাবে করা প্রয়োজন ।

বন্যাকবলিত এলাকায় কৃষকের হাতে অর্থ নেই। নিতে হয় চড়া সুদে ঋণ। তাতে কৃষকের আবাদে প্রভাব পড়ে, জীবনযাত্রার মান আরও নিচে নেমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে  কৃষকদের সব ধরণের কৃষিঋণ, এনজিও ঋণ মওফুক করা অথবা পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করার সুযোগ দিতে হবে। কৃষকদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করে নগদ অর্থ সহায়তা দিতে হবে। সরকারের দেওয়া ২,৫০০ টাকা সহায়তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বন্যার্ত এলাকায় এর পরিমাণ বর্ধিত করতে হবে।

বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে মাঠে থাকা ধানের। বন্যার পানি যখন নেমে গেছে, সেখানে মিলেছে শুধু পচে যাওয়া গোড়ার অংশ। অথচ বন্যার আগে সবুজ ধানগাছ হাসি ফুটিয়েছিল কৃষকের মুখে। শুধু তাই নয়, এই সময়ে আমনের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়। যদিও কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় বীজতলা তৈরিতে ট্রে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে শুধু আমন ধানই যথেষ্ট নয় এই মুহূর্তে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার পরামর্শক কৃষিবিদ ড. শহীদুল ইসলামে ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের পরামর্শ অনুসরণ করা যেতে পারে। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা কৃষকদের মধ্যে নাজিরশাইল, বিনাশাইল, লতিশাইল, বিআর২২ এবং অন্যান্য স্থানীয় জাতের চারা এবং স্বল্প সময়ে উৎপাদিত হয় এমন সবজি ও ফসল দ্রুত রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন। 

এতোকিছুর মধ্যে বড় একটি বিষয় এড়িয়ে গেছে। তা হলো বন্যার আগাম প্রস্তুতি। কেন্দ্রীয়ভাবে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগে থেকে প্রস্তুতির কোন নজির নেই। বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই তৎপরতা শুরু হয়। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়ে গেলে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন সমন্বয় সাধন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এজন্য বন্যা মৌসুমের আগেই প্রস্তুতির জন্য মনিটরিং কমিটি গঠনের জোর দাবি জানাচ্ছি।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ভাটির দেশ। তাই উজানের ঢলের পানি হতে সৃষ্ট বন্যা আমাদের এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে অতীতে বন্যা এতো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু উন্নয়নের নামে নদীবিনাশী বাধ, পরিকল্পনাহীন স্লুইস গেট, কালভার্ট, সেতু নির্মাণ করে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনছি। যার বলি হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।  

লেখক: যোগাযোগ কর্মকর্তা
খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), বাংলাদেশ