স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষিতে এসেছে আশাতীত সাফল্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। ভূমির অনুপাতে লোকসংখ্যা অনেক বেশি। প্রতি বছর লোকসংখ্যা বাড়ছেই। সে তুলনায় কৃষিজমি বাড়ছে না, বরং ১ শতাংশ হারে কমছে। কৃষিজমিতে স্থাপনা, কারখানা, রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে। তার পরও ক্ষয়িষ্ণু আবাদি জমি থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম, ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দেড় টন চাল উৎপাদন হতো। এখন হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আম উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে। আর আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ দশ দেশের কাতারে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রফতানি হচ্ছে বিদেশে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশ উৎপাদন বহুল পরিমাণে বেড়েছে। চিংড়ি রফতানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদনও অনেক বেড়েছে। তাতে বেড়েছে এসব পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের জনপ্রতি প্রাপ্যতা।
বর্গাদারদের ভূমিস্বত্বের নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের আশঙ্কা নিরসন, গ্রামীণ ভিটেমাটিতে বসবাসরতদের দখলিস্বত্ব প্রদান, ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বসতবাটির জন্য প্লট প্রদান করতে হবে। কোনো পরিবারকে আট হেক্টরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে না দেয়া এবং ভাগচাষী ও বর্গাদার কৃষকদের তাদের চাষকৃত জমির কার্যকর মালিকে পরিণত করতে হবে। করোনা মহামারীর এই সময়ে বলতে চাই, আমাদের কৃষির যে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা করা গেলে এর সাফল্য টেকসই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম একটি নিদর্শন বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। গত কয়েক বছরে আবহাওয়া হয়ে উঠছে খামখেয়ালিপূর্ণ। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যেমন বৃষ্টি কম হয়, তেমনি আশ্বিন মাসে কয়েক দিন এমন পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটে যে তাতে সৃষ্টি হয় মারাত্মক জলাবদ্ধতা। খরাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দিন দিন নিম্নমুখী হয়ে সেচকাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। আবার হঠাৎ বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচ ও খরচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকছেন। তাছাড়া পাট, গম ও আখ উৎপাদনও লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্যশস্যের দাম আগামী ২০ বছরে ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে। সঠিক সময়ে জমি চাষ, বীজ বপন, ফসল পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ, বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রভৃতি কাজ ব্যাহত হচ্ছে পরিবর্তিত বিরূপ জলবায়ুর কারণে।
সবজি ও মত্স্য চাষের পাশাপাশি নতুন ফল চাষেও কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। আম, পেয়ারা, লিচু, কলা, পেঁপে, তরমুজ, আনারসের সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রবেরি, কমলা, মাল্টা, ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনের পাশাপাশি ফুল চাষে সফল আমাদের কৃষকরা। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য, আলু অন্যতম সম্পূরক খাদ্য এবং পাট ঐতিহ্যগতভাবে সোনালি আঁশ ও অর্থকরী ফসল। এসব ফসলের ওপর জড়িয়ে আছে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। তবে বিকল্প কৃষি ভাবনায় সবজি ও মত্স্য উৎপাদনে যে সাফল্য ধরা দিয়েছে, তা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। অপ্রচলিত পণ্যের তালিকায় সারা বছরই নানা রকম শাকসবজি রফতানি হলেও প্রতি বছর উৎপাদিত শীতকালীন সবজি ফলনের একটি অংশ রফতানির উদ্যোগ নেয়া হলে তা দেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজে লাগত। সেই সঙ্গে সবজি, ফল ও মত্স্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশে-বিদেশে বাজারজাত করার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়ার মধ্য দিয়ে দেশের কৃষি উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলা যায়। উৎপাদিত ধান, আলু, শীতকালীন সবজি, মাছ ও ফলের উপযুক্ত মূল্য, সংরক্ষণ ও বাজারজাতের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ টন সবজি ও ফল আড়তে পচে যায় অথবা ক্ষেতেই নষ্ট হয়। আবার পেঁয়াজ, আদা-রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলাজাতীয় কৃষিপণ্যে বিদেশনির্ভরতার কারণে দেশের মানুষকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। কৃষিপণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি এর বাজারজাত, সংরক্ষণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির দ্রুতগতির সঙ্গে সীমিত ও সংকুচিত হয়ে আসা জমি নিয়েও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে, যা অভাবনীয়। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার ও যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান উজ্জীবক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তার সঙ্গে বিশেষ অবদান রয়েছে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় উচ্চফলনশীল, কম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন। গ্রামের মানুষদের উপেক্ষা করে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রাম এলাকায় অন্তত উপজেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়লেই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কৃষি এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে রফতানি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু রফতানি আয়ের সুবিধা কৃষকের ঘরে যাচ্ছে না। রফতানি খাতকে আরো জোরদার করতে হলে কৃষকদের রফতানি আয়ের সুফল পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কৃষি আমাদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। এই কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামবাংলার কৃষক। বন্যা, খরাসহ কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধুয়ে-মুছে নিয়ে গেছে স্বপ্নমিশ্রিত ঘাম ঝরানো সোনার ফসল। কোনো বিপর্যয়ই দমাতে পারেনি কৃষকদের। নিঃস্ব, শূন্য অবস্থান থেকেও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাংলার কৃষক। ফলিয়েছেন সোনার ফসল। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নেই। কৃষি খাতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিকে লাভজনক খাতে রূপান্তরের মাধ্যমে সরকার দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে স্থায়ী ভিত্তি দিতে সক্ষম হবে। আর এটাই আমাদের প্রত্যাশা।










