ফেইসবুকে কোন পোস্ট দেখলেই আমার যে নেতিবাচক প্রশ্নটা প্রথম মাথায় আসে সেটা হল এই সংবাদ বা তথ্যটা কতটুকু সত্য? এর পেছনের ঘটনা কি? যে ব্যক্তি তথ্য বা সংবাদটি শেয়ার করলো সেটা কি তার নিজের লেখা, নাকি কোন লেখা চোরের? মানে একটা সন্দেহ থাকেই, যার কারনে আমি নিজেই খুব বিরক্তবোধ করি।
আমি ফেইসবুক, গুগল জন্ম নেয়ার আগের সময়ের মানুষ। তাই ফেইসবুক গুগল আবিষ্কারের আগে এবং পরের দুনিয়ার পার্থক্যটা কিছুটা হলেও আমি অনুভব করতে পারি। কথায় বলে, ‘ন্যাচেচিটি ইজ দ্যা মাদার অব অল ইনভেনশন’। আবার সব আবিষ্কারের সুবিধার সাথে অসুবিধা ও থাকে। তবে আধুনিকতা বা প্রযুক্তির আগ্রাসনকে কেউ কখনো অস্বীকার করতে পারেনা, পারেনি। অজানাকে জানার এবং প্রয়োজনের স্বার্থে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কার সভ্যতাকে এইভাবেই এগিয়ে নিয়ে চলে।
গুগলের মত ‘ভার্চুয়াল সার্চ ইঞ্জিন’ আবিষ্কারের পর মানুষ তথ্য সংগ্রহের দুনিয়ায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যে কোন অজানা তথ্য বা খবরের সত্যতা জানতে যেন গুগলের দ্বিতীয় কোন বিকল্প নাই। গুগলের প্রতিষ্ঠান ইউটিউব। এটাও আরেকটি তথ্য ভান্ডার। তবে এটা গুগলের মত শুধু তথ্য সরবরাহ করেনা। ইউটিউব তৎকালিন সময়ে অনলাইন মিডিয়ার প্রথাগত ধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিল। গুগল তথ্য অনুসন্ধানের পথ তৈরী করে আর ইউটিউব সেই তথ্যে ইমোশনালি অনুভব করার একটা সুযোগ তৈরী করে দেয়। তার উপর গুগলের ‘ওপেন সোর্স এন্ড্রয়েড মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম’ যেটা তাদের প্রযুক্তিকে টেবিলের উপরে থাকা কম্পিউটার থেকে নিয়ে গেছে সরাসরি মানুষের হাতে। অর্থাৎ একটা পুরো প্যাকেজ। তাদের হাত থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নাই। বের হবেনই বা কেন যদি আপনি সব কিছু ওয়ান স্টপ সার্ভিসে পান।
এরপর পর অনলাইনের দুনিয়ায় আসলো ফেইসবুক। আসতেই ব্যবসা সফল। ফেইসবুকের বরাতে প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনীদের একজন এবং জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। গুগলের প্রতিষ্ঠাতা বিলিওনিয়ার ল্যারি পেইজ এবং সারগেই ব্রিনকে পৃথিবীর যত মানুষ না চেনেন তার বহু গুনে ফেইসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গকে চেনেন। কারন একটাই, ফেইসবুক। এই ফেইসবুক কি সেটা সবাই জানলেও আজকে আমি আমার মত করে বর্ননা করার সুযোগ নিতে চাই। তবে এটা বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে গুগলের বিজনেস বা ব্যবসার মডেল কি রকম? তাদের আয় কিভাবে হয় যে তাদের প্রতিষ্ঠাতারা পৃথীবির শীর্ষ ধনীতে পরিনত হয়? এই ইন্টারনেট হল একটা ডিজিটাল মাধ্যম যেখানে তথ্য গোপন করা খুব কঠিন বিষয়। গুগল আপনার কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্রাউজারে ‘কুকি’ নামে একটি সফটওয়্যার প্রযুক্তি সেট করে দেয়। এটা তারা এখন অনুমতি নিয়েই করে কারন কুকি নিয়ে বিশেষ আঈন (কুকি পলিসি) পাস করা হয়েছে। এই ‘কুকি’ কি? এটা স্পাই বা গোয়েন্দা কুকি। এই কুকি দিয়ে গুগল আপনার অনলাইন ব্যবহারের ধরন সম্বন্ধে জানতে পারে, মানে সোজা বাংলায় আপনি কোন ধরনের বিষয় বেশী পছন্দ করেন বা কোনটা কম পছন্দ করেন তা তারা অতি সহজে (গুগল) জেনে নিতে পারে। এখন আপনি বলতে পারেন গুগলের সেগুলো জেনে কি লাভ? গুগল কি আপনাকে ফ্রী সার্ভিস দেয় বলে মনে করেন? কখনোই না। তাদের মুল আয় হচ্ছে বিজ্ঞাপন এবং ভোক্তা বা ব্যবহারকারীদের তথ্য। এখন তারা কুকির মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংগৃহীত তথ্য তাদের সার্ভারে তারা সংরক্ষণ করে রাখে। এতে লাভ কি? গুগল বিভিন্ন কোম্পানী সাথে চুক্তির বিনিময়ে তাদের যে পন্য বা সার্ভিসের বিজ্ঞাপন করে, তা তারা ইন্টারনেট ব্যবহারকারিদের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রকৃতিকে বিশ্লেষন করে কাদেরকে কোন বিজ্ঞাপন দেখালে বানিজ্যিক মুনাফা বেশী হবে তার একটি টার্গেট ডাটাবেইজ তৈরী করে। অর্থাৎ যারা যে বিষয় বা তথ্য নিয়ে ইন্টারনেটে বেশী সময় ব্যয় করে তাদের সেই সব পন্য বা সার্ভিসের বিজ্ঞাপন গুলোই গুগল বেশী বেশী করে দেখায়। এতে কি হয়? ধরেন, আপনি কক্সবাজার যাবেন। অনলাইনে কক্সবাজারের হোটেলগুলোর ঠিকানা, রুমের ভাড়া তথ্য খুঁজছেন। গুগল আপনি যেখানেই যান তাদের ‘এডসেন্স’ প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনাকে বিজ্ঞাপনদাতাদের নিদ্ধিষ্ট হোটেল গুলোই প্রথম দেখাবে। আপনি চান বা না চান, সেগুলো প্রথম দেখাবেই। এভাবেই তারা টার্গেট করে মার্কেটিং বা বিজ্ঞাপন করে বিজ্ঞাপনদাতাদের ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে এবং বিনিময়ে তারা বিজ্ঞাপনের জন্য কিছু টাকা কামিয়ে নেয়। এখানে ও আবার ঘন্টা, দিন, মাস, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বয়স গ্রুপ, দেশের এলাকা ভেদে আপনার বিজ্ঞাপনের খরচ নীর্ভর করে। যত বেশী মানুষকে টার্গেট করে বিজ্ঞাপন করতে চান তত বেশী বিজ্ঞাপনের খরচ। ইউটিউবের ও একই প্রকৃতি। তারাও আপনাকে অনুসরন করে আপনি কোন ধরেনের ভিডিও কন্টেন্ট বেশী দেখেন। তবে তাদের ব্যবসা মডেল গুগল থেকে কিছুটা ভিন্ন। যারা ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করেন তারা ও এই ইউটিউব থেকে আয় করতে পারেন, যেটা গুগলে করা যায়না। এটা করার কারন এখানে ব্যবহারকারীরা যে ভিডিওগুলো ইউটিউবে আপলোড করেন সেগুলোই ইউটিউবের আয়ের পেছনে মূল পুঁজি বা মুলধন। আর আমরা ব্যবহারকারীরা যখন বিনামুল্যে নানারকম ভিডিও দেখতে ইউটিউবে হুমড়ি খেয়ে পড়ি তখন তারা দশ বিশ সেকেন্ডের জন্য একটা বিজ্ঞাপন চালিয়ে দেয়। সংক্ষেপে এটাই গুগল এবং ইউটিউবের ব্যবসার মডেল।
এখন ফেইসবুকের মার্ক জুকারবার্গ চিন্তা করলো গুগলের পুরো ব্যবসার মডেল নকল না করে একটু ব্যতিক্রম আনলে প্লেইজারিজমের বা আইপি কপিরাইট আঈন লঙ্ঘনের দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত হতে হবেনা। কারন সে গুগলের প্রতিষ্ঠাতাদের চেয়ে একটু বেশী স্মার্ট। কিরকম? সেটা বুঝাতে হলে আগে আমাদের মানুষের চিরাচরিত চারিত্রিক এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে খানিকটা বুঝতে হবে। মানুষ সমাজবদ্ধ প্রানী। সেই প্রাচীন যুগ থেকে গোত্র করে বাস করা মানুষের স্বভাব। তারা বন্ধু বানাতে আগ্রহী কারন তারা একাকিত্বের জীবন পছন্দ করেনা। আবার মানুষের মধ্যে মতের অমিল থাকে। তাই তারা নিজের মতের মানুষের গ্রুপ বা গোত্র করে। তারা আনন্দ খুশী দু:খ বেদনা, সফলতা নিজের মতের মানুষদের মাঝে ভাগাভাগি করতে ভালবাসে। এতে তারা খুশি বা আনন্দিত হয়। পৃথীবিতে মানুষই একমাত্র বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন প্রানী যারা অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ করতে জানে এবং সমস্যার সমাধানের পথ তৈরী করতে পারে। একমতের মানুষরা নিজের মতের মানুষের সাথে নিজেদের চিন্তা চেতনা ভাগাভাগি করে, আলাপ আলোচনা করতে পছন্দ করে। তারা ঘৃনা করে, আবার তারা ভালবাসে। তারা পরচর্চা করতে পছন্দ করে। তারা হিংসা করে। এই সব মার্ক জুকারবার্গ ২০০৪ সালে উপলব্ধি করতে পেরেছে যেটা আমি বা আমরা পেরেছি অনেক পরে, তাও তার ফেইসবুক ব্যবহার করার পর।
এখন মার্ক জুকারবার্গ তার এই গভীর উপলব্ধি থেকে এমন একটা গ্রাউন্ড তৈরী করলো যেখানে বয়স, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান। সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং এই ভার্চুয়াল গ্রাউন্ডটি ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করবে সম্পূর্ণ বিনামুল্যে। তারপর সবাই বিনামুল্যে একাউন্ট খুলে যার যার নিজস্ব গ্রুপ বা গোত্র বানানো শুরু করলো। এটা ছিল ফেইসবুকের প্রাথমিক মডেল। যারা প্রথমদিকে ফেইসবুক ব্যবহার করেছেন তারা জানেন যে ফেইসবুকে আগে ব্লগের মত ছিল। পারসোনাল একাউন্ট থাকলেও সেটা এখনকার মত বন্ধুর সাথে বন্ধুর বন্ধুরা কানেক্টেড ছিলনা, কাউকে অনুসরন করার কোন পথ ছিলনা। তারপর মার্ক জুকারবার্গ মানুষের চরিত্রের সাধারন প্রবৃত্তি (মানুষের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপরে লিখলাম) সেগুলো ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের এনগেইজ বা জড়িত করা শুরু করলো। অর্থাৎ আপনি সামাজিক ভাবে বাস্তব দুনিয়ায় যেভাবে নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন বা বলতে চেয়েছিলেন সেটা করার জন্য একটা ‘ভার্চুয়াল’ বা কৃত্রিম সুযোগ তৈরী করে দেয়া হল। খুব ভালো করে খেয়াল করেন ‘ভার্চুয়াল’। আপনি যেটা স্বপ্ন দেখেন সেটাও ভার্চুয়ালি মানে বাস্তবে ঘটছে এমন সত্য নৎ, কিন্তু আপনি মন থেকে চান এই ভাবে কিছু হোক বা এই ভাবে কিছু আপনি বলেন। পরাধীন বাস্তব দুনিয়াতে যা কিছু মুখে বললে আপনি বিপদে পড়বেন সেটা ফেইসবুকে বলে দিয়ে আপনি মনকে একটু হালকা করতে পারেন, মনের ভেতর প্রশান্তি অনুভব করতে পারেন। আপনার গোত্রের মানুষরা আপনার পোস্টে বা কথাতে লাইক, লাভ এর মত রিয়্যাকশন দিয়ে ভার্চুয়ালি আপনাকে তাদের মতামত বা সমর্থন জানিয়ে দেয়। এখানে ফেইসবুক সব ব্যবহারকারীদের মধ্যে আরেকটি অলিখিত প্রতিযোগীতায় তৈরী করেছে, সেটা হল ‘ফলোয়ার’ এবং তাদের ‘রিয়্যাকশন’ এর ব্যবহার। ফেইসবুকে ফলোয়ারের সংখ্যা এবং তাদের রিয়্যাকশন ব্যবহারকারীদের মধ্যে অলিখিত শ্রেনীবিন্যাস তৈরী করেছে। তাই ফেইসবুকে যে ব্যবহারকারীর ফলোয়ারের সংখ্যা এবং পোস্টে রিয়্যাকশন সংখ্যা বেশী সেই ব্যবহারকারী ফেইসবুক সমাজের হাই ক্লাস সেসাইটির মানুষ। পোস্টের বিষয়ের উপর ভিত্তি করে লাইক, লাব রিয়্যাকশন বেশী পেলে ব্যবহারকারীরা খুশী এবং সন্মানিত হয়। আবার ক্ষেত্র বিশেষে হা হা, এংগ্রী রিয়্যাকশনের সংখ্যার উপর হতাশ ও হয়। মোটকথা, স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা, একটি ভার্চুয়াল পরিতৃপ্তি। সাথে ফেইসবুক ব্যবহারকারিদের ‘মেসেন্জারের’ মত মাধ্যম ও দিয়ে দিল যেটা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা ভার্চুয়াল থেকেই গ্রুপের বন্ধুদের সাথে বিনামুল্যে আলাপ আলোচনা করতে পারছে। খেয়াল করুন ‘বিনামুল্যে’। এই বিনামূল্য ব্যপারটিই হচ্ছে ‘ফাঁদ’।
এবার ফেইসবুকের ব্যবসার মডেল নিয়ে কিছু কথা বলি। গুগলেরটা তো আলোচনা করলামই। ফেইসবুকের ব্যবসার মডেলের মুল মুলধন হচ্ছে পাবলিককে যে কোন উপায়ে ‘এনগেইজ’ করা বা মিলিয়ে দেয়া বা মুখোমুখি করা। সেটা সত্য দিয়ে হোক বা মিথ্যা বা গুজব দিয়ে, সেটা ফেইসবুক কতৃপক্ষের চিন্তার বিষয় না। মোট কথা সামাজিক প্রাণির উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর দূর্বলতা নিয়ে খেলা করাই তাদের কাজ। এই পাবলিক ‘এনগেইজমেন্টের’ মাঝে গুগলের পদ্ধতিতে ফেইসবুক ও তাদের বিজ্ঞাপনের ব্যবসাটা চালিয়ে নেয়। মানে আপনি বন্ধুদের সাথে কেন তথ্য বা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, কার বা কোন ধরনের লেখা বা ছবিতে লাইক, লাভ, এংগ্রী রিয়্যাক্ট করেন, কোন বিষয় বেশী শেয়ার করেন, কোন তথ্যের বেশী খোঁজ করেন এগুলোর প্রকার ভেদে ফেইসবুক সেই সব বিষয়ের বা তথ্যের বিজ্ঞাপন আপনার চোখের সামনে হাজির করে।
এখন আপনি বলতে পারেন, আমি তো কোন বিজ্ঞাপন থেকে কোনদিন কিছু কিনিনি বা সার্ভিস ব্যবহার করিনি। আমি বলবো করেননি তবে ভবিষ্যতে যে করবেন না এটা কিভাবে জানেন? ফেইসবুক আজকের দিনে বিশ্বের সব মিডিয়া আউটলেটগুলোর হেড অফিস। একসময় আমরা কাগজের পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়তাম, তারপর অনলাইনে ঐ সব পছন্দের পত্রিকার নিজস্ব ওয়েবসাইটে। আর এখন বেশীর ভাগ সময়ই ফেইসবুক লিংকের মাধ্যমে। মানে আপনাকে ফেইসবুকে এনগেইজ হতেই হবে। আর এনগেইজ হতে গিয়েই স্বর্গীয় এডাম-ইভসের (আদম-হাওয়া) মত আপেল খেয়ে ফাঁদে পড়ে যাবেন, যেটা আপনি টের ও পাবেন না। আপনি ফেইসবুকের সুবিধাগুলোর মোহে পড়ে, আনমনে ফেইসবুককে আসল দুনিয়ার বিকল্প বলে মেনে নেবেন। কারন বাস্তব দুনিয়ায় আপনি যে মানুষগুলোর সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, ধারের কাছে যেতেও আপনার জীবন শেষ হয়ে যেতো, তাদের সাথেই আপনি তথ্য বিনিময় করতে পারছেন। এটাই তো আমরা বাস্তবে চাই, যেগুলো ফেইসবুকে অতি সহজে করে ফেলতে পারছি। কিন্তু এখানে কিছু সমস্যা আছে। ঐ যে আমি শুরুতেই বলেছিলাম, সব আবিষ্কারের সুবিধার পেছনে অসুবিধাও আছে।
মানুষের সাধারন চারিত্রিক প্রবৃত্তি সম্বন্ধে আমি উপরে লেখেছি, মানুষ সামাজিক প্রানী হিসেবে কি কি করতে পছন্দ এবং অপছন্দ করে। এখন এই চাওয়া, পাওয়া, না চাওয়াকে কেন্দ্র করে ফেইসবুক আমাদের সবাইকে কিভাবে এনগেইজ করছে সেটা দেখার বিষয়। যে বিষয়টি নিয়ে আপনি কথা বলছেন বা বলতে আগ্রহী সেটা কতটুকু সত্য বা অসত্য? সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষ যেমন ভালবাসতে জানে, তেমনি হিংসা ও করতে জানে। মানুষ যেমন সত্য কথা বলতে পারে তার বহুগুন বেশী মিথ্যা ও বলতে পারে। আর ফেইসবুক তাদের ব্যবসার স্বার্থে মিথ্যা এবং গুজব দিয়েই ইদানিং সবাইকে ‘এনগেইজ’ করার চেষ্টা করছে। কারন মানুষের কাছে সত্য তেমন ‘এ্যাপিলিং’ বা হৃদয়স্পর্শী না, যতটা মিথ্যা বা গুজব বা কাল্পনিক কোন বিষয় মানুষের মনকে নাড়া দেয়। এই মানুষের চরিত্রের আদিম বৈশিষ্ট্যগত দূর্বলতা। সবাই না, তবে অধিকাংশ মানুষই এরকম। আর এই বৈশিষ্ট্যগত দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ফেইসবুক তাদের ব্যবহারকারিদের মাঝে তথ্য আদান প্রদানের প্রবণতা তৈরী করে, যাতে তারা টার্গেট মারকেটিং করার একটা বিশাল জনগোষ্টি সহজে পেতে পারে। আর এটার বাস্তব উদাহরন আমরা ২০১৬ এর আমেরিকান নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ করেছি। যেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনে জেতানোর উদ্দ্যেশ্যে (যদিও অভিযোগটি সেভাবে প্রমানিত হয়নি) নানা রকম বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল। কিন্তু এই ব্যপারটা নির্বাচনের পর মার্কিন সিনেটের চোখ এড়ায়নি। ফলশ্রুতিকে ফেইসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গকে সেই থেকে ফেইসবুকে অনেক ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছিল এবং নানা সময় দিতে হয়েছে মোটা অংকের জরিমানা। তারপর সে তার অসাধু কাজ আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোতে বন্ধ করতে বাধ্য হলেও বিশ্বের বাকি দেশগুলোতে ঠিকই পূ্র্বের মডেলেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
এখন আপনারা প্রশ্ন করবেন, এই সব কথা শুনতে আমারে এত বড় লেখা পড়তে হলো? না, আমি মুল প্রসংগটা এখনো বলিনি। এতক্ষন যা বলেছি তা আমার বাকি কথাটুকু বিশ্বাস করানোর জন্য বা সমর্থন পাওয়ার জন্য তুলে ধরেছি মাত্র। আমরা বাংলাদেশীরা ফেইসবুক ব্যবহার শুরু করেছি খুব বেশি দিন হচ্ছেনা। তার কিছু দিন আগে অনেক ব্যবহারকারীরা ফেইসবুক দূরের কথা, ইন্টারনেট কি সেটাই বুঝতো না। সবাই না, কিন্তু অধিকাংশই জানতো না। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে এই ফেইসবুক প্রযুক্তি জাতি হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি লুফে নিয়েছি। যার মুল দুইটি কারন হচ্ছে ১. ফ্রী বা বিনামুল্য ব্যবহার করতে পারা ২. মত প্রকাশের স্বাধীনতার মত সুবিধা উপভোগের জন্য। তাহলে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, এখন কি আমাদের বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাই? উত্তর হচ্ছে, আছে তবে স্বাধীনতা এমন এক জিনিষ যেটা মানুষ শুধু বেশী বেশী চায়। বাস্তব দুনিয়ায় আপনি আপনার সব অনুভুতি (What on your mind) দুই মিনিট পর পর কাউকে জানাতে বা বোঝাতে পারবেন না। আমরা যেমন ছোট বেলায় ভাই বা বোনেরা মিলে ঝগড়া করে মা-বাবার কাছে অভিযোগ করতাম, এখন এই ফেইসবুক ও আমাদের মত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঠিক সেই মা-বাবার পদ পালন করে। অর্থাৎ ফেইসবুক সবার মনের কথা শুনে আর শুনে, কিন্তু কখনো কোন অভিযোগ করেনা। এখন জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমরা ১৭ কোটি বাংলাদেশী এই ফেইসবুক কিভাবে ব্যবহার করি? ঐ একই ভাবে যেভাবে বিশ্বের বাকি ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করে। তবে এখানে আরো কিছু ব্যপার আছে। একটা ছোট কাল্পনিক গল্প বলে, আমি এই শেষ বিশ্লেষনটা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। ধরেন সৌদিআরবের ফেইসবুকের গ্রুপ বা গোত্রগুলোতে সৌদি (দুষ্ট রাজা) রাজাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা, প্রতিবাদ হচ্ছে। রাজার কি সেটা পছন্দ হবে? না, কখনো না। এমন একটা ঘটনা ঘটার পর সৌদি রাজা সরাসরি ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে মার্ক ভাই, আমি আপনাকে ঘরে ঢুকতে দিলাম বলে আপনি তো আমার বেড রুমের বিছানা সহ দখল করে নেয়া শুরু করলেন? তখন মার্ক বললো, না মাননীয় আপনার উপকার এবং খেদমতের স্বার্থেই সদা উপস্থিত আছি। রাজা বলবে কিভাবে সেটা বোঝান আমাকে? মার্ক জুকারবার্গ বলা শুরু করলো, এই যে যারা আজ আপনার বিরুদ্ধে কথা বলছে বা প্রতিবাদ করছে তারা যদি ফেইসবুকে তাদের রাগ, অভিমান, ক্ষোভ ঝাড়তে না পারতো তাহলে তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতো। এই ক্ষেত্রে ফেইসবুক অনেকটা ‘এংগার মেনেজমেন্ট সিস্টেম’ বা ‘রাগ ক্ষোভ দমানোর মাধ্যম’ হিসেবে কাজ করে। মানে কৃত্রিমভাবে মানুষকে কৃত্রিম স্বাধীনতা দিয়ে মনে প্রশান্তি এনে দেয়। তাই এখন প্রতিবাদিরা আর রাস্তায় নামেনা। তারা ফেইসবুকেই আন্দোলন করতে থাকে। প্রতিবাদকারীরা মন থেকে বিশ্বাস করে, ফেইসবুকই প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী এবং নীর্ভরযোগ্য মাধ্যম। রাজা বললো, হুম..আপনার কথায় যুক্তি আছে তবে যদি তারপরও তারা যদি রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে, তাহলে তো আমার মহা সমস্যায় পডতে হতে পারে? তখন মার্ক বললো, প্রতিবাদিদের সব তথ্য আমি আপনাকে দিয়ে দিবো হুজুর, শুধু বিনিময়ে আপনি আমাকে বিনা ট্যাক্সে আপনার দেশে ব্যবসা করতে দেন। রাজা শুনে তো মহা খুশী। চোরকে বলে চুরি কর আর গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকো। রাজা মনে মনে ভাবে, থাক বাদ দেই, আমার কি ক্ষতি? আমি তো বিরোধীদের, প্রতিবাদিদের নাম ঠিকানা সব পেয়ে গেলাম। তাদের ধর থেকে শরীর আলাদা করতে পারলেই আমি সারাজীবন ক্ষমতায় থেকে যেতে পারবো। রাজা মিটি মিটি হাসতে হাসতে মনে মনে বলতে লাগলেন, ফেইসবুক তুমি খুব ভালো।
শেষ কথা, ফেইসবুক প্রযুক্তিটি তৈরীর পিছনের মুল উদ্দ্যেশই ছিল দুনিয়ার আপামর মানুষকে যে কোন উপায়ে মুখোমুখি করা এবং যে কোন বিষয়ে মানুষের সামাজিক অনুভুতিগুলোর প্রকৃতি বা ধরন সম্বন্ধে জানা, যা ফেইসবুক সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সরবরাহ করে । দেশের সরকারদের সহযোগীতা না করলে ফেইসবুক পৃথীবির কোন দেশেই তারা এতদিন টিকে থাকতে পারতোনা। যেমন: চায়না, উত্তর কোরিয়া, ইরানে ফেইসবুক চলতে দেয়া হয়না। আমি আগেই বলেছি ফেইসবুক অনেকটা ‘এংগার মেনেজমেন্ট সিস্টেম’ বা ‘রাগ ক্ষোভ দমানোর মাধ্যম’ হিসেবে কাজ করে। মানে ফেইসবুক তার ব্যবহারকারীদের কৃত্রিমভাবে বাক-স্বাধীনতা দিয়ে ব্যবহারকারীদের মনে কৃত্রিম প্রশান্তি এনে দেয়ে। দুধের বদলে ঘোল খাইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে দেয় ‘যাও বাছা তুমি প্রতিবাদ করেছো, তোমার দায়িত্ব তুমি পালন করেছো, এইবার ঘুমাও’।










