সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে জনগোষ্ঠীগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টিকাদান খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগের মহামারীগুলো থেকে পরিত্রাণ এবং পোলিও, হাম, গুটিবসন্ত, ধনুষ্টঙ্কারসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। চলমান কভিড-১৯ মহামারীর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। সংগত কারণে তাই প্রথম থেকে বিশ্বব্যাপী ওষুধ কোম্পানি এবং বিজ্ঞানী ও গবেষকরা টিকা উন্নয়নে ব্যাপকভাবে মনোযোগ দিয়েছেন। এরই মধ্যে চূড়ান্ত ট্রায়ালে কয়েকটি কভিড-১৯ টিকার কার্যকারিতা প্রমাণ হয়েছে এবং সেগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্সসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশে প্রয়োগ শুরু হয়েছে। যেহেতু প্রতিরোধ তৈরির মাধ্যমে করোনা টিকা নাগরিকদের নতুন স্বাভাবিক জীবন ফেরাতে পারে, সেজন্য বিপুল আশাবাদের সঙ্গে সময়মতো টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে প্রতিটি দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন উৎস থেকে আমাদের সমপর্যায়ের দেশগুলো টিকা নেয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও টিকা পাওয়ার দৌড়ে শামিল। কিন্তু দ্রুত টিকা পাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এর অবসান জরুরি।
টিকা কেনার জন্য সরকার আর্থিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বারবার বলে আসছে, সম্ভাব্য সব উৎস থেকে টিকা কেনার উদ্যোগ নেয়া হবে। বিভিন্নভাবে জনগণকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকা বেশ আগেই অনুমোদন পেয়েছে। রাশিয়া ও চীনের টিকা একাধিক দেশে ব্যবহূত হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে একাধিক কোম্পানির টিকা ব্যবহূত হচ্ছে। আগামী দু-এক মাসের মধ্যে আরো কয়েকটি নতুন টিকা ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এসব উৎস থেকে টিকা সংগ্রহে স্বাস্থ্য বিভাগ কী করছে, তা অনেকটাই অস্পষ্ট। কোভ্যাক্স উদ্যোগের সঙ্গে এপ্রিলের দিকে যুক্ত হলেও প্রাথমিক আলাপ ছাড়া অন্য কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিকার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। ফলে দ্রুত টিকা পাওয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে বিকল্প কম। বাংলাদেশ মূলত ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকার ওপর নির্ভর করে আছে। মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন করছে ভারতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি। তাদের কাছ থেকে টিকা কিনছে বাংলাদেশ সরকার। এরই মধ্যে ঔষধ প্রশাসন উল্লিখিত টিকাটি বাংলাদেশে আমদানি ও ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। সেরাম ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বেক্সিমকো ফার্মার মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ধাপে ধাপে তিন কোটি টিকা পাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কারণে যদি সেরামের টিকা সময়মতো না পায়, তাহলে কী হবে তা ভাবার সময় এসেছে। এদিকে আগামী জুনের আগে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে সেরামের টিকা না এলে বাংলাদেশকে জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাই একটি উেসর ওপর নির্ভর করে সরকারকে একাধিক বিকল্প উেসর সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার পরামর্শ জনস্বাস্থ্যবিদদের। এটি আমলে নিয়ে টিকাকেন্দ্রিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে।
আমরা কিছু সুযোগ হারিয়েছি। চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক্স তাদের টিকা এখানে ট্রায়াল করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর অনুমোদন দেয়া হয়নি। সিনোভ্যাক্সের ট্রায়াল হলে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকত। বড় বিষয়, এর মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝা যেত, টিকা পেতে অর্থও লাগত না। এখন কোনো ধরনের ট্রায়াল ছাড়াই এখানে সেরামের টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। তাতে যদি আরো বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, সংক্রমিত হয়, তার দায়ভার কে নেবে? সুতরাং নাগরিকের ওপর এ টিকা ব্যবহারের আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমতি নিতে হবে, অন্যান্য টিকা ব্যবহারের বেলায় যেমনটি হয়। এই জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগের একটা বিহিত জরুরি।
বলা হচ্ছে, সেরামের টিকাটি পেতে মাত্রাপ্রতি খরচ পড়বে ৩-৫ ডলার। এত টাকা ব্যয় করে কতজন আসলে টিকা নিতে পারবে তাও বিবেচ্য। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিয়ে সেটি পুরোপুরি বিনা মূল্যে দেয়া হবে, নাকি অর্ধেক মূল্যে দেয়া হবে, তা এখন থেকেই ঠিক করতে হবে। মজুদেরও একটি বিষয় আছে। টিকা একটি ন্যূনতম তাপমাত্রায় রাখতে হয়। সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের ক্ষেত্রে আমাদের কাঙ্ক্ষিত কোল্ড চেইন নেই। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে এক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কোন বয়সগোষ্ঠী, কারা কারা আগে টিকা পাবে এবং কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তার একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার একটি অগ্রাধিকার নীতি ও তালিকা প্রণয়ন করেছে। তার ভিত্তিতে কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বরাবরই দেখা যায়, প্রভাবশালীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকে। ফলে বাস্তবে যাদের প্রয়োজনটা বেশি তারা অনেক সময় বঞ্চিত হয়। কভিড-১৯ টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় দেখতে চাইব। অগ্রাধিকার নীতির যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি মহামারীর টিকা প্রদান চালিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে বিরাট কর্মযজ্ঞের। এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে। খুব সংবেদনপূর্ণ ও ঝুঁকির হওয়ায় কভিড-১৯-এর টিকা প্রয়োগে বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। সেটি মাথায় রেখে টিকাদান কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যন্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারের সুবাদে একটি বড় জনবল আছে। রয়েছে গতানুগতিক টিকাদান কর্মী। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এনজিওগুলোরও একটা বিশাল কর্মী বাহিনী বিদ্যমান। তাদের কাজে লাগাতে হবে। সুন্দরভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে এই কর্মযজ্ঞে তাদের ব্যবহার করা সহজতর হবে। এছাড়া টিকা দেয়ার পর স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া তদারকি ও পর্যবেক্ষণের জন্য টিকাদান কেন্দ্রগুলোয় একটি নিবিড় টিম দরকার। নইলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। এটি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা চাই।
কভিড-১৯ মহামারী একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। প্রতিটি দেশই টিকাদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে অন্তত ৩০টি দেশ টিকা প্রদান শুরু করে দিয়েছে। তারা কীভাবে টিকাদানের কাজটি সম্পন্ন করছে, সেসব অভিজ্ঞতা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। বৈশ্বিক নীতিগুলো অনুসরণ করে এখন থেকে টিকাদানের সার্বিক প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় এলেই কেবল দেশব্যাপী সুরক্ষাবলয় তৈরি হবে। সংখ্যাটি প্রায় ১৩ কোটির বেশি। এ সংখ্যা পূরণ করা খুব একটা সহজ নয়। এছাড়া শতভাগ কার্যকারিতা অজানা থাকায় টিকার পরেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাই স্বাস্থ্য নির্দেশনাগুলোর পরিপালন নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বিভাগ আরো সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।










