আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে কোনো কিছুই আর দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডিতে আটকে নেই। বিশ্বের যে প্রান্তে যে ঘটনা ঘটুক না কেন মুহূর্তেই তা পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে অন্য যে কোনো প্রান্তে। ৩০০ বছর বয়সী পুঁজিবাদ এই প্রথম তার টিকে থাকার প্রাণভোমরা পণ্য ও মুনাফার বাধাহীন সঞ্চলনের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। সেটা সম্ভব হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবের উপর ভর করে। ফলে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির চেহারা।  প্রযুক্তি-পণ্যের উদ্ভাবকদের হাতে হাতে যেন এখন আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্য। প্রদীপে ঘষা দিয়েই রাতারাতি তারা বনে যাচ্ছেন শীর্ষ বিলিয়নপতিতে। দিনে দিনে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সম্পদ। দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি সম্পদের মালিকানা এখন ৯-১০ জন মহাধনীর কাছে। ফলে বেড়েই চলেছে সম্পদের মালিকানার বৈষম্য।

শিল্প পুঁজিকে পেছনে ফেলে সেই কবেই সেবা পুঁজি অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখন সবাইকে পেছনে ফেলে ডিজিটাল-প্রযুক্তি খাতই বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হতে চোখ রাঙানি দিচ্ছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে। সভ্যতার ইতিহাসে এই পরিবর্তন অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুত ঘটছে। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এই অভিঘাত দেশে দেশে পুরানো সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন, আচার-আচরণ, অভ্যাস ও জীবন-জীবিকায় এসে লাগছে। ঘটে চলেছে সমাজের দ্রুতগতির রূপান্তর।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক এই প্রবণতার বাইরে  নয়। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে অষ্টম ও অর্থনীতির দিক থেকে ৪১তম বাংলাদেশ গত ৭৫ বছরের মধ্যে দুইবার স্বাধীনতার দেখা পেয়েছে। একসময়ের প্রায় নিশ্চল স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘এশিয়াটিক গ্রাম’কাঠামোর সমাজ কৃষিনির্ভরতা পেছনে ফেলে এখন শিল্প, সেবাখাতের উপর ভর করে নগরায়নের পথে হাঁটছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ধীর লয়ে হলেও ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগুচ্ছে। উৎপাদনী ব্যবস্থার এই পরিবর্তন সমাজ কাঠামো ও মানুষের ধ্যানধারণা, বিশ্বাস, সংস্কৃতির রূপান্তর এনে দিচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের বদ্বীপ থেকে জেগে ওঠা বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অধিকাংশ ভূমি কয়েকশ বছর আগেও জল আর জংলাতে পূর্ণ ছিল। আবার জল-জঙ্গল-বাঘ-সাপের সঙ্গে লড়াই আর কঠোর পরিশ্রম করে যে বসতি স্থাপন করা হতো, দেখা যেত সেটাও  রাতারাতি প্রমত্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। জীবনযাপনের এই অনিশ্চয়তা ও বিরুদ্ধ পরিবেশের কারণে এখানকার মানুষ নতুন কিছুতে বাছবিচার ছাড়াই দ্রুত অভিযোজন করে নিতে পারে। আবার একই কারণেই এখানকার মানুষদের একটা অংশ কর্মবিমুখ ও সুযোগসন্ধানী। ইতিহাসে বারবার এখানে শাসক পাল্টেছে। বহিরাগত সেনাদল এসে পুরাতন শাসকদের হটিয়ে দিয়েছে। রাজধানীর এই মসনদের পরিবর্তন গ্রামের জনজীবনে আলোড়ন তোলেনি। তবে একদল মানুষ শাসকের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, আচরণ, চিন্তার সঙ্গে  নিজেদের মানিয়ে নিত। তারা খুব দ্রুত শাসকের সান্নিধ্যে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলত। রাজচাকুরের বেশে তারা এখানকার গ্রামভিত্তিক অনড় সমাজের ঘাড়ের উপর প্রভু হিসাবে চেপে বসত। উপরতলার এইসব সুযোগসন্ধানীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ‘হাড়ীত ভাত নাহি’থেকে উত্তরণ ঘটেনি। এ ভূমির জনমানুষের এইসব ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য এখনকার যে সামাজিক রূপান্তর, তার সুলুকসন্ধানের সূত্র হিসেবেই কাজ করে।  

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানকার সমাজ  স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামভিত্তিক হওয়ায় প্রাক উপনিবেশিক ও উপনিবেশিক আমলে পরিবর্তনগুলো ছিল খুবই ধীরগতির। কৃষি, কুটিরশিল্প, ক্ষুদে ব্যবসার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ সমাজে ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। ইংরেজরাই প্রথম তাদের রাজস্ব বাড়ানোর স্বার্থে ভূমিতে শর্তাধীন ব্যক্তিগত মালিকানা চালু করে। খনি খনন, শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা, নগরায়ন, রেলসহ যোগাযোগ অবকাঠামো স্থাপন করলেও ইংরেজ শাসনের দুশো বছর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল এখানকার সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করা। উদ্বৃত্ত সম্পদের পুনঃবিনিয়োগ না হওয়ায় উপনিবেশকালে অর্থনীতি কৃষির ভিত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বাজার দখলের মরিয়া প্রচেষ্টার ফল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভয়াবহ এ যুদ্ধের মানবীয় অবচয় প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অনেকগুলো জাতিরাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এনে দেয়। প্রত্যক্ষ উপনিবেশ পুঁজির অবাধ সঞ্চলনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আটলান্টা চুক্তি সে বাধাকে দূর করে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ায়  ভারতীয় উপমহাদেশে প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক শাসন-শোষণের অবসান হয়। হিন্দু-মুসলমান পরিচয়ের উপর ভর করে জন্ম হয় ভারত-পাকিস্তানের।  সাতচল্লিশের দেশভাগ ইতিহাসের এক অমোচনীয়, ব্যথাতুর ঘটনা। ভিন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পাশাপাশি বাস করে আসা প্রতিবেশীর হাতে রক্তাক্ত হতে হয় অন্য প্রতিবেশীকে। দাঙ্গা, সন্ত্রাস, হিংসায় নিজেদের ভিটেমাটি, বসতি থেকে উন্মূলিত হতে হয় অসংখ্য মানুষকে। যদিও এ দেশভাগের ফলেই পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বৈষয়িক উন্নতি ও বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

ব্রিটিশ শাসনামলের মতোও পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছরেও প্রধান সমস্যা ছিল এখানকার উদ্বৃত্ত মুনাফার পাচার। ফলে নগরায়ন ও শিল্পায়নের গতি হয়ে পড়েছিল রুদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হচ্ছিল তারা নিজেদের স্বার্থেই পশ্চিম পাকিস্তানী উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ইতিহাসে সেই প্রথম নিজেদের মতো করে নিজেদের বিকাশের সুযোগ পায় এদেশের মানুষ।

স্বাধীন ভূখণ্ড হিসাবে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে তখন এদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ জীবিকার জন্য নির্ভরশীল ছিলেন কৃষির উপর। ফলে সমাজ ছিল অনড়। স্বাধীনতার পরপর বৃহৎ শিল্পের যে জাতীয়করণ নীতি নেওয়া হয় তার ফল শিল্প বিকাশে সহায়ক হয়নি। আশির দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের পর ভর করে এদেশের অর্থনীতি সেই সঙ্গে সমাজজীবনের একটা পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়।  

তৈরি পোশাক শিল্প বিকাশের কারণে একদিকে যেমন গ্রামের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগোষ্ঠীর একটা অংশের নগরে আসার সুযোগ হয়, তেমনি আবার নগর থেকে পাঠানো উদ্বৃত্ত অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে। পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরের বিস্ময়কর এক যাদুস্পর্শ। এই একটা ঘটনায় বাঙালির শত শত বছরের গ্রামীণ রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মূলে আঘাত করে। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বড় পরিসরে  শ্রমশক্তি বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর যুক্ত হবার এই সুযোগ পুরুষকেন্দ্রিক পরিবার ও সমাজ কাঠামো থেকে নারী-পুরুষের অপেক্ষাকৃত সমতার সমাজ ও পরিবার কাঠামোর ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। মাত্র চার দশকের ব্যবধানে, শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতার যে সূচক সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু দক্ষিণ এশিয়াতে নয় সমগ্র এশিয়ার মধ্যেই আশা জাগানিয়া। ২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট’অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৫০তম। চীন, জাপান, ভারতের অবস্থান যেখানে ১০০-এর উপরে। বর্তমানে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ মোট শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ। একদশক আগের তুলনায় যা দ্বিগুণ। আর ৫ দশক আগে মানে সত্তরের দশকের তুলনায় তা সাড়ে দশগুণ।

শ্রমক্ষেত্রে নারীর এই বিপুল অংশগ্রহণ রূপকথার জীয়নকাঠির স্পর্শের মতো এখানকার নিশ্চল-ঘুমন্ত সমাজকে জাগিয়ে দিয়েছে। শুধু চাকরি নয় ব্যবসা-বাণিজ্য, দেশরক্ষা, পাহাড়চূড়ো জয়, বিমান চালনা সবক্ষেত্রেই নারীরা এখন এগিয়ে এসেছে। করোনা মহামারীর এই সময়টাতেও ডিজিটাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে সেখানেও সমানতালেই নারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর এই যুক্ততা পরিবার কাঠামোতে যেমন পরিবর্তন আনছে ঠিক তেমনি সামাজে মানুষের মনস্তত্ত্বেও বদল ঘটাচ্ছে । পিতৃতান্ত্রিক ও যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক ও একক পরিবার কাঠামো তৈরি হচ্ছে। আবার শহরে পরিবার প্রথার বাইরে এককভাবে বসবাসের প্রবণতাও বাড়ছে। বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদসহ যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীর মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে কন্যা শিশু ও ছেলে শিশুর লালনপালনের ক্ষেত্রে যে অসমতা ছিল তা অনেকটাই  দূর হয়েছে।

বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরের আরেক জীয়নকাঠি প্রবাসী শ্রমিকেরা। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তি রফতানি যে শুরু হয় তা আশির দশকে এসে গতি পায়। এখন বিশ্বের কোনো প্রান্তই পাওয়া যাবে না যেখানে বাংলাদেশি নেই। তারা তাদের আয়ের একটা বড় অংশ দেশে পাঠিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। করোনা মহামারীর সময়েও আমদানি-রফতানিসহ অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে নি তার কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। পাঁচ দশক আগে জনশক্তি যখন রফতানি শুরু হয় তখন মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত। বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করেন। গত অর্ধ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুত নগরায়ন ঘটেছে। প্রবাসীরা শুধু টাকা পাঠিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখেননি, বাইরে থেকে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিও বয়ে নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশে  নগরায়ণের গতি বাড়িয়েছেন। বিশেষ করে মফস্বলি অর্থনীতির ভিত্তি প্রবাসী আয়ের উপর ভর করেই সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের উপর ভিত্তি করে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। প্রসার ঘটেছে ব্যবসা বাণিজ্যের।

তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী শ্রম বাংলাদেশের অর্থনীতি একইসঙ্গে সামাজিক রূপান্তরের শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। নিশ্চল গ্রাম থেকে মানুষকে টেনে নগরে নিয়ে আসছে, আবার দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিনদেশে ভিন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। নগর আর প্রবাস থেকে তারা শুধু অর্থই পাঠায়নি, পুঁজির এই সঞ্চালনের সঙ্গে চিন্তা-সংস্কৃতিরও মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে। নিশ্চল-গণ্ডিবদ্ধ সমাজ হয়ে উঠেছে গতিশীল।  

লেখক: সংবাদকর্মী