গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুটি পৃথক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্স কমিটি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের যৌথ সভায় চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সরকারি চিকিৎসক অফিস সময়ে বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখতে ও ব্যক্তিগত চেম্বারে প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এমনকি সরকারি চাকরিরত অবস্থায় কোনো বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে খণ্ডকালীন চাকরিও করতে পারবেন না তারা। চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয় সবসময়ই। বিশেষ করে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে বিতর্ক হয় বেশি। অভিযোগটি খুবই পুরনো যে চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন এবং প্রাইভেট চেম্বার বা ক্লিনিকে সময় দিতেই বেশি মনোযোগী। কারণ এতে কম সময়ে বেশি উপার্জন হয়। অথচ বিভিন্ন সময় সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ২০০৮ সালে দেয়া একটি আদেশে সরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোমসহ সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকরিতে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সহকারীদের অফিস সময়ে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়। নির্ধারিত অফিস সময়ে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রদান করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানারও বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ নির্দেশনা কার্যকর হয়নি এখনো।

দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানুষ সেবা পায় না প্রত্যাশিতভাবে। এর অন্যতম কারণ সরকারি ডাক্তার-নার্সদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস। সরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্যের অন্যতম কারণও এটি। বিভাগীয় বা জেলার সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা নার্সিং হোমে ডাক্তাররা নিয়মিত উপস্থিত না থাকার বিষয়টি কারো অজানা নয়। কিছু কিছু চিকিৎসক কর্মস্থলে হাজিরা দিয়েই চলে আসেন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। চেম্বার বা বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে সময় দিতেই তারা বেশি পছন্দ করেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে, তারা সরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা না করে প্রাইভেট চেম্বার বা ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া সরকারি হাসপাতালেও ফি নিয়ে রোগী দেখছেন অনেক চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালের নার্সদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ।   

চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্ররা চিকিৎসাবিদ্যার শুরুতে একটি শপথ নেন, যা তাদের শিক্ষক পাঠ করেন এবং তারা তা সমস্বরে পাঠ করে উদ্বেলিত হন। পবিত্র এ শপথ তাদের সত্যিকার চিকিৎসক এবং মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠার মন্ত্র। ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জেনেভা ডিক্লারেশন নামে যে সিদ্ধান্তটি দিয়েছে তাও চিকিৎসকদের প্রতি এক সুদৃঢ় দিকনির্দেশনা অর্থাৎ হিপোক্র্যাটসের শপথনামার পরিবর্ধিত রূপ। চিকিৎসা ও শিক্ষা অনন্তকাল থেকে মহান পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সুতরাং এর সঙ্গে অন্য  কোনো পেশার তুলনা করা উচিত নয়। চিকিৎসক ও শিক্ষকরা যে অতুলনীয়, সেটাও ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দায়িত্ব তাদেরই। কোনো শপথ বা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার মতো মহাপাপ আর কিছুই হতে পারে না। শপথ এক ধরনের দায়বদ্ধতা। কোনো যুক্তি দিয়ে যার হেরফের করা যায় না। কিন্তু চিকিৎসকরা এখন সেটি ভঙ্গ করে চলেছেন হরহামেশাই। অন্য পেশার সঙ্গে চিকিৎসা পেশাকে মেলানো যাবে না। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, চিকিৎসকরা তাদের শপথ অনুসরণ করবেন। 

বিদেশে চিকিৎসকরা গবেষণা করেন অনেকটা বাধ্য হয়েই। গবেষণা না থাকলে, আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জার্নালে প্রকাশনা না থাকলে মেডিকেল শিক্ষকরা পদোন্নতি পান না। সেখানে গবেষণা কাজে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেয়া হয়। বাংলাদেশে গবেষণা কাজে কিছু সহায়তা করা হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, কিন্তু এটি খুবই নগণ্য। চাকরি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও গবেষণাকর্ম থেকে প্রাপ্ত প্রণোদনা দিয়েই একজন চিকিৎসকের চলে যায়। তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণা কাজে প্রণোদনা নেই। গবেষণা না থাকলে এখানে পদোন্নতি আটকায় না। তবে পদোন্নতির জন্য বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশনা থাকতে হয়। এটিও হয় কিন্তু এগুলো খুব বেশি মানসম্মত নয়। ভারত ও নেপালেই তা হচ্ছে। দিল্লির এইমসের চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না, তারা গবেষণা করেন প্রচুর। আবার নেপালের ইনস্টিটিউট অব মেডিসিনের ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। 

চিকিৎসাসেবা আর ১০টি পেশার মতো নয়। মহৎ পেশা হিসেবে গণ্য এ পেশা সার্বিক অর্থেই ব্রত সাধনার মতো। কিন্তু বাজার অর্থনীতির সময়ে এই মহৎ পেশাটিকেও অনেকাংশে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। ফলে সেবা নয়, বাণিজ্যই যেন অনেকের কাছে প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসকদের বাইরে গিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সরকারি হাসপাতালে বসেই যেন চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা থাকলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রতিও চিকিৎসকরা দৃষ্টি দিতে পারবেন। ঢাকার দুটি বড় হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা আছে। তার ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে। আমরা আশা করব, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সরকারি ডাক্তাররা অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরে, তার নিজস্ব সময়ে অন্য কোনো কাজে মনোনিবেশ না করে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে মনোনিবেশ করতে পারবেন বলে একটি বিধান করেছিল সরকার। উচ্চ আদালত এ-সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনাও দিয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস সংক্রান্ত সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল, যা আজও হয়নি। বিশ্বের সব দেশেই এ ব্যবস্থা চালু আছে। তবে সেখানে এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, আছে তার সঠিক প্রয়োগ। বাংলাদেশেও সরকারি ডাক্তারদের প্র্যাকটিস নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত দ্রুত। শুধু নির্দেশনা দিয়ে এখান থেকে পরিত্রাণ লাভ করা সম্ভব নয়। কোনো ডাক্তার যদি তার দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, সরকারিভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা প্রদর্শন করেন, এটা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে দোষী ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তির বিধান করা। এমনও শোনা যায়, দায়িত্ব পালনকালে কোনো কোনো ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে বসেই ফি নিয়ে থাকেন। এও গুরুতর অপরাধ এবং এমন ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়া উচিত।