আজ পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা তো কাল চালের। একটি স্থিতিশীল হয়ে এলে আরেকটি পণ্যের দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। করোনার কারণে বাজার তদারকির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ভোজ্য থেকে শুরু করে সবজিতে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন বলে খবর মিলছে। এমনকি আলুও বাদ যায়নি। আলুর দাম ৫০ টাকা ছুঁয়েছে। অন্যান্য সবজির দামও ৮০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। মরিচের কেজি ২০০ টাকা অনেকদিন ধরে। এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা রয়েছে সংকটে। আশঙ্কার বিষয় হলো, ভোক্তা বেশি দামে পণ্য কিনলেও কৃষক এর সুফল পাচ্ছেন না। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, কৃষক ১০-১২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করলেও বাজারে তা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এখন। শিমসহ অন্যান্য সবজির ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। মধ্যস্বত্বভোগীরা এর সুফল ভোগ করছে। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পদক্ষেপ সাময়িক কিছু কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানির মতো উদ্যোগ নেয়ার দক্ষতাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেখাতে পারছে না। আগামীতে বাজারের অবস্থা কেমন হবে, সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা বা গবেষণাও নেই।
বাজারে যখন সব ধরনের শাকসবজির দাম বেশ চড়া, তখন আলুর দাম যদি আরো বেড়ে যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে আর্থিক চাপ আরো বাড়বে। এমনকি তাদের পুষ্টিগত সমস্যাও সৃষ্টি হবে। এ পরিস্থিতিতে আলুর বাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর দাম বেঁধে দিয়েছে। হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি ২৩ টাকা, পাইকারি ২৫ ও খুচরায় ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। সরকারের নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে নিয়মিত নজরদারি দরকার। অভ্যন্তরীণ বাজারে আলুর চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধ করা
অথবা রফতানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি তুলে নেয়া যেতে পারে।
মূলত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও নভেম্বরে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে স্বাভাবিকভাবেই। এবারো তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে এবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বন্যা, করোনা, বিশ্ববাজারে টালমাটাল অবস্থা এবং অনেক দেশের শুল্কারোপ দাম বাড়ার প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় অবস্থায় রাখার তাগিদ এসেছে। এক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনতে বাজারের কারসাজি নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর বাজার মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত পণ্য, যেমন চিকিৎসাসামগ্রী, যাতায়াত ব্যয়, বাড়িভাড়া ইত্যাদি মানুষের সক্ষমতার মধ্যে রাখার পরামর্শ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ইতিবাচক কোনো তত্পরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
বাজার ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাজার স্থিতিশীল রাখা। সার্বিকভাবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে স্থানীয় উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও চাহিদার সামঞ্জস্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকাও দরকার। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আমদানির পাশাপাশি রফতানির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এতে শুধু ভোক্তাবাজার নয়, আর্থিক বাজারেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বাজার নিয়ন্ত্রণ যেকোনো রাষ্ট্রের সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে অনেক বেশি কৌশলী ও আন্তরিকতা দেখাতে হবে। এ বিষয়ে জনসচেতনতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। সরকার সবসময়ই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলে আসছে। কিন্তু বাজারে সে কথার কোনো প্রতিফলন নেই। সংগত কারণেই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং পদ্ধতি যুগোপযোগী ও আধুনিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। তবে সবার আগে ভাঙতে হবে বাজার সিন্ডিকেট। পথে পথে চাঁদাবাজিও বন্ধ করতে না পারলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবে, তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা ও দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের জীবন হয়ে ওঠে স্বাচ্ছন্দ্যময়। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারে দুর্ভোগের শেষ থাকে না। মূলত দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি জনদুর্ভোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই ক্রান্তিকালে সরকারের পক্ষে কিছু ইতিবাচক কথা বলা হচ্ছে। বাজার যাতে বিক্রেতারা ইচ্ছামতো বাড়াতে না পারেন, তার জন্য দোকানে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য তালিকা টানানোর নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। আর বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য ‘টিসিবি’-কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে স্পর্শকাতর পণ্যের খুচরা ও পাইকারি মূল্যের তালিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ এসেছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী দোকানে দোকানে পণ্যের মূল্য তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কিনা, তা যথাযথভাবে তদারক করা হচ্ছে না বলে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছেন। ফলে বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটলেও সরকার বা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। সবকিছুই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে কালোবাজারি, মুনাফালোভী, মজুদদাররা পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাচ্ছে। পণ্য ক্ষেত থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত আসতে চাঁদা, দালালি, মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন খরচ প্রভৃতি বাবদ প্রচুর অর্থ গুনতে হয়। কৃষকের পক্ষে তখন সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ রেখে অপ্রত্যাশিতভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। অনেক সময় আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বিক্রয় করেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া মাথাপিছু ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, জমির অনুর্বরতার দরুন উৎপাদন কম হওয়া, অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে পর্যাপ্ত পণ্য বাজারজাত না হওয়া, চোরাচালান ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।










