বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের ‘মুক্তির’ কথা বলতেন বিজ্ঞানের আলোকে। মুক্তির অগ্রভাগে রয়েছে 'অর্থনৈতিক মুক্তি’, তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ৬ ছয় দফা, যা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে সমাদৃত। বললে ভুল হবে না, এই কাজে রেহমান সোবাহান, নুরুল ইসলাম, মোশারফ হোসেন, হাবিবুর রহমান, আখলাকুর রহমান এবং আনিসুর রহমানের মত অর্থনীতিকদের বৌদ্ধিক অবদান ছিল অসামান্য। যা সম্পূর্ণরূপে বৈজ্ঞানিক গবেষণা নির্ভর। অন্যটি, শিক্ষা, যা একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ বিনির্মাণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কারিগরি শিক্ষার প্রতিও সমভাবেই গুরুত্ব দেন তিনি।
আমরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছি -চেয়েছিলাম বৈষম্যহীন একটি সমাজ বিনির্মিত হবে। কারণ, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে ব্রিটিশদের দেখানো অসমতা, পাকিস্তানের লাহোর ও ইসলামাবাদের শাসকেরা একই কাজ জারি রেখেছিল। দেশ ভাগের ‘আগে ও পরে’ দুই সময়েই শোষিতদের পক্ষ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ সরব থেকেছে। তার অর্থনৈতিক পর্যালোচনা বা দর্শনের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই ছয়দফা মধ্যে। ‘অর্থনীতি-সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রগতি দর্শন’ আলোচনা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন আলোপাত করেছেন। আবুল বারকাত উল্লেখ করেছেন, ‘...‘বঙ্গবন্ধু’ -জাতির পিতা, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি দর্শনের প্রবণতা ও বাস্তবায়নকারী মূল ব্যক্তি। যে দর্শনটাও মানুবমক্তির দর্শন, বৈষম্যহীন অর্থনীতি-সমাজ বিনির্মাণের দর্শন’। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ছয় দফা তো বটেই সাথে তার সমগ্র জীবনপ্রণালীতে। এই মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন কারাগারে, শুধু এই মানুষের মুক্তির জন্য। একটি মানুষ ‘অর্থনৈতিক দর্শন’ হয়ে উঠেছেন -এদেশের মানুষ'কে বুঝে, মানুষের সাথে থেকে এবং গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বুঝেছেন -দেশের চালিকা শক্তি হিসেবে যারা কাজ করে, দিন শেষে তারাই ‘ভুখা-নাঙ্গা’ হয়ে জীবন-যাপন করেন, থাকেন আশ্রয়হীন, বস্ত্রহীন-অসহায় অবস্থায়। কারণ হল, উৎপাদনের বেশির ভাগ অংশই চলে যায় লাহোর-ইসলামাবাদে। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারিত হতো, লাহোর-ইসলামাবাদের গোলটেবিলে। যার পরিণতি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য'কে নিয়ে গিয়েছিল আকাশচুম্বীতে। অর্থনৈতিক মাপকাঠি ছিল 'জিডিপি ও মাথাপিছু ব্যয়ের পরিমাপের সঙ্গে সম্পর্কিত'। একটি ছোট পরিসংখ্যান দেখা যাক, ‘১৯৪৯-১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য পরিমানে বেশি এবং তা ১৯৫৩-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ওই অবস্থায় থাকে। তবে জিডিপির অবরাদ্দযোগ্য অংশগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়র সঙ্গে যুক্ত করা করলে দেখা যায় যে ১৯৪৯-১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের হিস্যা পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য পরিমানে বেশি ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণেই এটি ঘটে। ১৯৪৯-১৯৫০ সালে জিডিপির পশ্চিম পাকিস্তানি হিস্যা ছিলা ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৫৯-১৯৬০ সাল নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের হিস্যা বেড়ে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ দাঁড়ায়। এ ব্যবধান ১৯৬৯-১৯৭০ সালে নাগাদ আরও প্রসারিত হয়ে পাকিস্তানের জিডিপিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ (রেহমান সোবাহান-২০১৭)।
এসব আঞ্চলিক বৈষম্য দেখিয়ে দেয় যে ১৯৪৯-১৯৫০ এবং ১৯৬৯-১৯৭০ মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে দ্রুততার সঙ্গে বর্ধিত হয়। এই বৈষম্যের আঁধার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৭১ সালে 'স্বাধীনতা-সাম্য- মানবিক মর্যাদার জন্য ৩০ লাখ প্রাণ ও দু'লাখ মা-বোনের [মতান্তরে, আবুল বারকাত তার ‘বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ’ দাবি করেছেন প্রায় ১০ লাখ আত্মত্যাগের এই স্বাধীনতার প্রদীপ ছয় দফা মধ্য দিয়ে জ্বালিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান তার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘উতল রোমন্থন পূর্ণতার সেই বছরগুলোতে’ উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৬৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে জাতির সামনে ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপনা করে এই সংগ্রামকে মহিমান্বিত করে বৃহৎ হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা। ...ছয় দফার চারটি দফা ছিল অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তানের পূর্ব অঞ্চলে নীতিনির্ধারণে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি...’ এই ভাবে। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবির আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেখানে থাকবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, থাকবে সামাজিক সমাধিকার। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক ক্ষমতা অথ্যাৎ পূর্ব পাকিস্তানের আমদানি ও রপ্তানি নীতি নির্ধারণের অধিকার। কারণ, পূর্ব পাকিস্তান সবুজ-শ্যামলে পরিপূর্ণ যা উৎপাদনে পদ্ধতিতে কাচামালের চাহিদা পূরণ করত সহায়ক এবং রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতেও সচেষ্ট। এটির পাকাপোক্ত করতে, ছয় দফার ৫ নম্বর দফাটি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, এতে বলা হয়- ফেডারেশনভুক্ত ইউনিটসমূহ নিজ নিজ সরকারের অধীনে প্রতিটি ইউনিটের বৈদেশিক মুদ্রা আয়পী পৃথক পৃথক হিসাব রাখার জন্য শাসনতান্ত্রিক বিধান থাকবে। কিন্তু তখনও পাকিস্তানি শাসকেরা সেই রফতানি কৃত সম্পদ কুক্ষিগত করত লাহো-ইসলামাবাদে। অন্য দিকে, পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের থেকে আয়কৃত করের টাকা, এখানকার মানুষের জন্য ব্যয় না করে 'পাচার' করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। এই শোষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে বঙ্গবন্ধু এটা বিপরীতে ছয় দফার চতুর্থ দফাটিতে উল্লেখ করলেন- সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা-কর ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে ফেডারেশনভুক্ত আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ। বঙ্গবন্ধুর এটি বুঝতে কষ্ট করতে হয়নি, তাই তিনি দেশ স্বাধীনের পর পরেই আদমজী পাটকল'কে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করেন, যা অর্থনীতির একটি দূরদর্শীক পরিকল্পনা ।
প্রযুক্তিগত দিকে থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেখতে পাই , ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নে (আইটিইউ) বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ। আইটিইউ স্যাটেলাইট অরবিট বা ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরি এবং এর বরাদ্দে সহযোগিতা দেওয়া ও সমন্বয়ের কাজ করে থাকে। এবং অন্যটি হচ্ছে, বেতবুনিয়ায় ভূউপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ উদ্বোধন করেন। প্রযুক্তির প্রসার ও "প্রযুক্তি শিল্পবিপ্লব"কে মাথা নিয়ে এই চিন্তা নিসন্দেহে ফলপ্রসূ হয়েছে "বঙ্গবন্ধু সেটেলাইট"।
আর একদিকে, শিক্ষাকে যেখানে একটি জাতির ‘মেরুদণ্ড’ বলা হয়, বৈষম্যমূলক শিক্ষা সেখানে জাতির 'বক্র-মেরুদ-' হয়ে থাকে।যা কখনই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা সেটাই চাইতেন। তারা বাঙালিদের সবসময় মনে করত ‘অধিনস্থ’। তার বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো শিক্ষা। পাকিস্তান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ারবুক, ১৯৬৮'র পরিসংখ্যানের কয়েকটি যদি উল্লেখ করাতে হয় তাহলে দেখবঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৪৯-১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভর্তি হয় ১৬২০ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ভর্তি হয় ৬৫৪ জন; ১৯৫৯-১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ভর্তি হয় ৩৯৭০ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ভর্তি হয় ৫০৮৪ জন; ১৯৬৭-১৯৬৮ সালে এটা দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তানে ৯৯৮৪ জন এবং পশ্চিম বেঁড়ে দাঁড়ায় ১৪৪২৫ জন।* অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যা পরিমান বেশি, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা অধিক হওয়ার কথা। শোষকেরা করেছে উল্টো!
বাংলাদেশের শিক্ষা বিষয়ে যে কোন আলোচনা-বিশ্লেষণ-বিক্ষণ'র জন্য ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এখানে বঙ্গবন্ধুর ছিল অপরিমেয় অংশগ্রহণ। ব্রিটিশদের পশ্চিমা শিক্ষাতত্ত্ব, পাকিস্তানিদের শিক্ষা কমিশন ষড়যন্ত্র আর প্রচলিত মধ্যযুগীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক মৌলিক শিক্ষাদর্শন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আরও জরুরি বিষয় হলো, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অন্যান্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ে মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষা। সেই সাথে যুক্ত হয় 'ভাষা'। শিক্ষার মাধ্যমে কি হবে? এটি একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন -এই প্রশ্নের জবাব আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রাম। যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে । এখানে বাঙালিরা সফল হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন আলোকপাত করতে হলে, গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যনীয় বিষয় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিক্ষা নিয়ে তার কার্যক্রম। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশেই শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষার ওপর বঙ্গবন্ধু যে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে। সে বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে তিন কোটি ৭২ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মূল কথা -বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্ত-বুদ্ধিচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে সভাপতি করে বঙ্গবন্ধু গঠন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শিক্ষা কমিশন। কমিশন শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে শূন্য কোষাগার নিয়েও বঙ্গবন্ধু দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মাঝে বিনা মূল্যে বই, খাতা, পেনসিল, দুধ, ছাতু, বিস্কুট বিতরণ করা হতো। এতো গেল তাঁর কাজ। তিনি কি বলতেন, সেগুলোর দিকে যদি নজর ফেরাই তাহলে দেখব, তিনি বলেছেন, ‘আমলা নয়, মানুষ সৃষ্টি করুন’। তিনি চাইতেন, একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ। যে মানুষ মানবিক গুণ সম্পন্ন হবেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং নতুন নতুন জ্ঞান সৃজনে নিয়োজিত থাকবেন, নির্মাণ করবেন "জ্ঞানভিত্তিক সমাজ"। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উত্কৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। ...দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’ এটি বক্তব্যটি প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা সর্বজনীনতা । যেখানে সকল মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্য সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘একটি সুষ্ঠু জাতি গঠনে শিল্প, যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন উন্নয়ন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবে না। এই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্য থেকেই তাঁদের সৃষ্টি করতে হবে।’ ড. মনিরুল হকের জবানিতে বলতে হয়, 'বাংলার মানুষ ছিল বঙ্গবন্ধুর পাঠশালা। শিক্ষার লক্ষ্য ও স্বপ্নকে বঙ্গবন্ধু আত্মার সন্তান হিসেবে লালন করেছিলেন।' বঙ্গবন্ধু সব কিছুর মধ্যে একজন মানুষ'কে খুঁজতে। যে মানুষ কোন জাতি বা বর্ণ দিয়ে বিভক্ত সমাজ নির্মাণ করবে না। মানুষ শুধু মানুষের জন্য, মানুষের নিমিত্তে, মানুষের সমীপে । আর সেই মানুষের বেরিয়ে আসবে শিক্ষা মধ্যে দিয়ে, যে শিক্ষার কথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছেন এবং কাজ করেছেন ।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু প্রকৃত অর্থেই ছিলেন একজন বাস্তববাদী নীতিনির্ধারক। তিনি বাস্তবতার নিরিখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর ‘শিক্ষা’ ও ‘অর্থনীতি’কে নির্মাণ করেছেন। সেই ৭ মার্চ ভাষণের কথাকে প্রাসঙ্গিক মনে করে ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘মুক্তি’ দিয়ে শেষ করতে চাই। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিদিষ্ট ভূখণ্ডের স্বাধীনতা খুবই জরুরি, কিন্তু যখনই মুক্তির মুখোমুখি আমরা দাঁড়াব, তখন মানুষের সামাজিক- অর্থনৈতিক- সাংস্কৃতিক- মনস্তাত্বিক সহ যাবতীয় কিছুর মুক্তির দিকে নির্দেশ করবে। যেখানে আমি শুধু অর্থনৈতিক ও শিক্ষার মুক্তি ও সর্বজনীনতা নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি যে বিজ্ঞানমনোস্কতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্য খুবই দরকারি।
লেখক, শিক্ষার্থী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; গোপালগঞ্জ










