জনশক্তি রফতানি খাতে সুশাসন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সুদৃঢ় অঙ্গীকার সত্ত্বেও থেমে নেই বিপদসংকুল অভিবাসন যাত্রা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পন্থায় অব্যাহতভাবে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশী তরুণরা। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্র  এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও যাচ্ছেন তারা। মূলত দালাল ও পাচারকারীদের প্ররোচনা-প্রতারণায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে পা বাড়াচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশীদের গণকবর পাওয়া যাওয়া, গত বছর তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৩৭ জন বাংলাদেশীর মৃত্যু, কিছুদিন আগে লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশীকে অপহরণ, অতঃপর লিবিয়ার মানব পাচারকারী একজনকে হত্যার প্রতিশোধে তাদের নির্মমভাবে হত্যার মতো ঘটনাগুলো স্পষ্টতই মানব পাচারের ভয়ংকর রূপেরই ইঙ্গিত দেয়। এতে একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটছে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কাজেই মানব পাচার প্রতিরোধে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সন্দেহ নেই, মানব পাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। ইচ্ছা থাকলেও এককভাবে বাংলাদেশ সেটি সম্পূর্ণ রোধ করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। দেশে এ-সম্পর্কিত শক্ত আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০১২ সালে আইনটি প্রণীত হলেও মানব পাচারবিষয়ক অপরাধে তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও অপরাধীর দণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। অনেক মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাস্তবায়ন জরুরি। আজকাল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচারকারী ও তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা সহজ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে এক্ষেত্রে আরো চৌকস হতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সীমান্ত এলাকা ও দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গাকে পাচারকারীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এসব জায়গায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে। নতুন কোনো স্থানকে অপরাধীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে কিনা, সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বলতে গেলে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন অনেকাংশে কমে আসবে বৈকি। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদারকি জোরদার বিশেষত বর্ডার টহল আরো শক্তিশালী করতে হবে। চেক পয়েন্টগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কীভাবে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ করা যায়, তার পদক্ষেপও নেয়া প্রয়োজন। 

বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হলেও মানব পাচারকারী চক্রগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য হলো, মূল চক্রগুলো লিবিয়া, দুবাই বা তুরস্কে বসে মানব পাচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহূত দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা যায় কিনা, সেটি ভাবতে হবে। আন্তঃদেশীয় সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে মূল হোতাদের ধরা অসম্ভব নয়। তার জন্য কূটনৈতিক তত্পরতা এবং সরকার টু সরকার পর্যায়ে মানব পাচারবিরোধী আলোচনা জোরদার করা প্রয়োজন। মূল বিষয় হলো, বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ যেন বিদেশে যেতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি করতে গিয়ে আবার অভিবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য জনশক্তি রফতানি কেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করা প্রয়োজন। 

মানব পাচার বা অবৈধ অভিবাসনকে নিছকই আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত ইস্যু হিসেবে ভাবলে অবশ্য ভুল হবে। এজন্য মানুষের সত্যিকারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনটিও ভীষণভাবে যুক্ত। মানব পাচার তথা অবৈধ অভিবাসনের দিক থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থার তালিকায় কেন বাংলাদেশ থাকছে, তার কারণ খুঁজলে প্রথমেই আসবে দেশে কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও বেকারত্বের বিষয়টি। দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ধারণা, বিদেশে গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। পারিবারিক সচ্ছলতা আসবে—এ বিশ্বাস নিয়ে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় তারা। তাদের এই বিশ্বাসকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করে পাচারকারীরা। কাজেই অবৈধ অভিবাসন বন্ধে দেশে মানুষের কর্মনিয়োজন বাড়াতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া চাই। আরেকটি বিষয়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হলেও বর্তমানে জনশক্তি রফতানি অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। তেমন কোনো নতুন শ্রমবাজার আমাদের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হয়নি। এদিকে করোনার অভিঘাতে উৎস দেশগুলোয় অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় নিজস্ব শ্রমবাজারে তারা স্থানীয়দের প্রাধান্য দিচ্ছে। নতুন করে বাইরে থেকে খুব একটা কর্মী নিয়োগ করছে না তারা। মহামারী প্রলম্বিত হলে এ প্রবণতা আরো বাড়বে। এমনটি হলে অবৈধ অভিবাসন যে আরো বাড়বে তা সহজেই অনুমেয়। এটা বিবেচনায় নিয়ে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বিদ্যমান শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারের কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে কাজের ক্ষেত্র প্রসার করতে হবে, যাতে অবৈধ অভিবাসনে মানুষ প্ররোচিত না হয়। একই সঙ্গে অভিবাসন প্রক্রিয়ায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দরকার। আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো দালালনির্ভর। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই রিক্রুটিং এজেন্সির নাম-পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকেন না। ফলে দালাল কর্তৃক সহজেই প্রতারিত হন। অনেক দিন ধরেই দালালদের নিবন্ধনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈধভাবে নিবন্ধিত হলে দালালদের চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। কাজেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি আমলে নেয়া যেতে পারে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত হবে, এটিই প্রত্যাশা।