একদিকে করোনার প্রকোপ, অন্যদিকে দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। নভেল করোনাভাইরাস ও বন্যা মোকাবেলায় সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে নানা ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ সহায়তা যথাযথভাবে সঠিক ব্যক্তির হাতে পৌঁছেনি বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা সিপিডি। বন্যাদুর্গত খুব কম মানুষই সরকারি ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে। অন্যবার বেসরকারি সংস্থাগুলো সহায়তার হাত বাড়াত। করোনার কারণে এবার তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে শুকনো খাবারই ত্রাণসামগ্রী হিসেবে বিতরণ করা হয়। কোথাও চালের সঙ্গে ডাল ও শিশুখাদ্য থাকে। কোথাওবা শুধু চাল। যে মানুষগুলোর ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে ডুবে গেছে, তারা চাল দিয়ে কী করবে? ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেশ কয়েকটি জেলা থেকে বরাদ্দ করা ত্রাণসামগ্রী ওজনে কম দেয়ার খবরও মিলছে। চাহিদার তুলনায় ত্রাণসামগ্রী সবসময়ই কম থাকে। কিন্তু চাহিদা ও জোগানের ব্যাপক ব্যবধান কাম্য নয়। ক্ষতিগ্রস্তদের মাথাপিছু বরাদ্দও অনেক কম। সব জেলায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে যেসব জেলার বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, সেসব জেলার দুর্গত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে কম পেয়েছে।
১৯৯৮ সালে বন্যার স্থায়িত্বকাল ছিল দুই মাসেরও অধিক। এবার এক মাসেরও অধিক সময় বন্যা রয়ে গেছে। বন্যা স্থায়িত্বের দিক থেকে ৯৮ প্রথম, এরপর এটি দ্বিতীয়। ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে প্রবল মৌসুমি বৃষ্টি, ব্যাপক বন্যা ও মারাত্মক ভূমিধসের ফলে লাখ লাখ শিশু ও তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪০ লাখেরও বেশি শিশুর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ঝুঁকির মুখে থাকা এই শিশুদের জীবন রক্ষাকারী জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। যদিও এমন বিরূপ আবহাওয়ার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের সঙ্গে অঞ্চলগুলো আগে থেকেই পরিচিত, তার পরও কভিড-১৯ মহামারী, সংক্রমণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ এখন এক বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। সব ধরনের দুর্যোগেই যারা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়ে, সেই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় খাদ্য ও নিরাপদ পানির সংকট। বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে ঘরে ঘরে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে; কুড়িগ্রামসহ অধিকাংশ বন্যাপ্লাবিত এলাকার পানীয় জলের প্রধান উৎস অগভীর নলকূপগুলোর বেশির ভাগই তলিয়ে গেছে। এটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ নিরাপদ পানির অভাব থেকে পানিবাহিত নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বন্যাদুর্গত মানুষের পক্ষে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বসবাস করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক মানুষকে একসঙ্গে আশ্রয় নিতে হয় উঁচু সড়ক, বাঁধ, স্কুলঘর ইত্যাদি জায়গায়; দিনরাত কাটাতে হয় গাদাগাদি করে। এ রকম বসবাস ভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির অনুকূল। বন্যার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। বন্যার ঢল ঠেকানো সম্ভব নয় বটে, তবে বন্যাদুর্গত মানুষকে করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় নেই—এটা মনে করারও কোনো সুযোগ নেই। মানুষকে বাঁচাতে হবে, সেজন্য অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর পন্থাগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
যেকোনো দুর্যোগে সবার আগে মানবিক বিপর্যয়ের দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া জরুরি। এজন্য বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় অসহায় মানুষ যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পায়, এ ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় যেভাবে মাঠ প্রশাসনের সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সর্বাত্মকভাবে পালনের বিকল্প নেই। বন্যা-পরবর্তী সংস্কার ও পুনর্বাসনের ব্যাপারেও এখন থেকেই ভাবতে হবে। দুর্গতদের কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা দরকার।
বন্যার্ত মানুষের এখনকার সবচেয়ে বড় চাহিদা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য ও বিশুদ্ধ পানি। এটা শুধু আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যাপার নয়, পানিবন্দি হয়ে নিজেদের বাসাবাড়িতে আটকা পড়েছে, এমন লোকজনের জন্যও এ সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে স্যানিটেশন বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। নারীদেরও কিছু বাড়তি সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ তত্পরতায় যুক্ত ব্যক্তিদের এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত। ত্রাণ উদ্যোগের পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হলে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা সহজ হবে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে সরকারের উচিত গতানুগতিক বিতরণ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা এবং একটি সুষ্ঠু নীতিমালার ভিত্তিতে কাজটি করা।










