ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে শততম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে স্মৃতিচারণা (পর্ব -চার)

সেলিম জাহান: শামীম,  ক্লাস তো অনেক করেছো, কোন কোন ক্লাসের স্মৃতি এখনো মনে আছে?

শামীম আজাদ: আমি আজ কিছু নাম লিখে এনেছি। কারণ আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়রে শিক্ষকদের নিয়ে কথা বলতে যাই তখন কিছু শিক্ষকের নাম বারবার আমার স্মৃতিতে, আমার লেখায় আসে। যাদের জীবন হঠাৎ করে থেমে গিয়ছে, শেষ হয়ছে, কিন্তু তাদের তো দেয়ার অনেক কিছু ছিল তাই আমাদের সেই সব শিক্ষকদের কথা বারবার ঘুরেফিরে আসে। আমাদের এ শিক্ষকেরা অকালে প্রয়াত  হয়ছেন, দেশের জন্য প্রাণ দিয়ছেন। শহীদ মুনীর চৌধুরী, শহীদ রাশেদুল হাসান, শহীদ আনোয়ার পাশা, শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। তাদের পাশাপাশি আমি ইংরেজী বিভাগের রাশেদুল হাসান স্যারের কথা বারবার বলি কারণ তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তারা কেমন করে  ক্লাসে প্রবেশ করতেন, পড়াতেন সবকিছু এখনো মনে আছে। এছাড়াও অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়ছি, অনেক শিক্ষকের উপদেশ পেয়ছি, অনেক শিক্ষকের তিরস্কারও লাভ করেছি কিন্তু এটা এখন আশীর্বাদ মনে হয়। বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য শিক্ষকগণ; প্রফেসর আহমেদ শরীফ স্যারের কথা যদি বলি, স্যারের কখনো দুটো রঙ ছিল না। স্যার যা বলতেন পরিষ্কার করে বলতেন। অত্যন্ত সোজা ভাষায় কড়া করে বলতেন এবং আমরা আমাদের ভুলগুলো শুধরে নিতাম। নীলিমা ইব্রাহিম, সিদ্দিকা মাহমুদা, ওয়াকিল আহমদ, আকরাম হোসেন, মনসুর মুসা, সিরাজুল ইসলাম, রাজিয়া খান আমিন, পারভিন হক, আফসার উদ্দিন, নরেন বিশ্বাস, রওনক জাহান আপাকে আমরা পেয়েছি।

সেলিম জাহান:  আমার মনে হয় নতুন প্রজন্ম এবং অন্য বিভাগের যারা পড়ছেন তারা এ বিষয়গুলো জানেতে আগ্রহী হবে।

শামীম আজাদ: যেমন ওয়াকিল আহমেদ স্যার আমাদের কালকেতু, ফুল্লরা এবং আলাওল পড়াতেন। স্যার একভাবে পড়িয়ে যাচ্ছেন, তার  ঠোটের দুইপাশ সিক্ত হয়ে যাচ্ছে। আমরা বলতাম স্যার কেন একবারও থামেন না। নিঃশ্বাস নেন না। সৈয়দ আকরাম হোসেন কিংবদন্তীতুল্য শিক্ষক।  আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি তখন তিনি তরুণ।

সেলিম জাহান: খুব সুন্দর চুল ছিল, একদম নায়োকোচিত।  

শামীম আজাদ: এই যে বললে না স্যার কিন্তু একদম নায়কের মতোই ক্লাসে ঢুকতেন। আমাদের মনে হতো ঘরে-বাইরের সদ্বীপ এসেছে বুঝি। স্যার একটার পর একটা শব্দের প্রতিশব্দ বলতেই থাকতেন। আমরা মনে করতাম এই বুঝি স্যার আর পারবেন না, কিন্তু না, তিনি বলে যেতেন। মনে আছে নীলিমা আপা খুব সুন্দর করে দেশী শাড়ি পরতেন। উঁচু করে চুল বাঁধা থাকতো তার।  আপা দীর্ঘাঙ্গী ছিলেন। শুধু পড়ানো  নয়, আপা জীবনযাপন সম্পর্কেও বলতেন। তার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। তার কন্যা ডলি ইব্রাহিমের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব ছিল। ডলি সূর্যদীঘল বাড়তে অসামান্য অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে। আপা ঘরে কেমন; ডলির কাছ থেকে আমরা এগুলো শুনতে চাইতাম।  মনে আছে, সোসিওলজির আফসার উদ্দিন স্যার ক্লাসে ঢুকতেনই দার্শনিক ভাব নিয়ে। সেলিম এবার তোমার শিক্ষকদের কথা বলো।

সেলিম জাহান: প্রথমত ধরেই নেয়া হয় যে অর্থনীতি বিষয়টা হচ্ছে অনেকটা নিরস বিষয়। তো এই  নিরস বিষয় শিক্ষক হিসেবে আমরা যাদের পেয়েছি বলা চলে তারা ছিলেন সব অতুলনীয় শিক্ষক। ক্লাসগুলোকে সরস করে তুলতে তাদের নানান রকমের প্রক্রিয়া ছিল। এক জনের এক এক রকম। আমাদের বিভাগীয় প্রধান তখন মির্জা নুরুল হুদা স্যার। বিভাগীয় প্রধান বিধায় তিনি আমাদের অর্থনীতির ক্লাসগুলো নিতে পারতেন না বা নেয়ার সময় পেতেন না।  কারণ তিনি এত কিছুর সঙ্গে জড়তি ছিলেন, এত কাজ ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যায়রে বাইরে, সরকারের সঙ্গে এসব কারণেই আমাদের ক্লাসগুলো তিনি নেয়ার সময় পেতেন না। স্যারের বিষয় ছিল কৃষি অর্থনীতি। আমরা কিন্তু তিন কিংবা চার বছরে একটা দিন শুধু তার ক্লাস করতে পেরেছি। তিনি আসলেন একদিনের ক্লাসে। ৪৫ মিনিট পড়ালেন কিন্তু তা ছিল এক দুর্লভ মুহূর্ত। ভীষণ দুর্লভ এক অভিজ্ঞতা। কোনো বই নেই। কোনো কাগজ নেই। বোডের্র দিকে একবারও গেলেন না। চক তুললেন না। কিন্তু ৪৫ মিনিট বলে গেলেন। এটা এখনো আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। উনি একবার আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে অর্থনীতির যে কোনো বিষয়ে তুমি পড়াশোনা করো না কেন, সেটা বাণিজ্য হতে পারে, রাজস্ব হতে পারে কিংবা আন্তজার্তিক বিষয় হতে পারে কিন্তু কৃষিখাত সম্পর্কে তোমার ধারণা থাকতেই হবে। তার যুক্তিটা ছিল যে, যেহেতু বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর, আমি তখনকার সময়রে কথা বলছি, তখন ৮০ ভাগ লোকই গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করে। তিনি বলেছিলেন, এটা যদি তুমি না জানো তাহলে ব্যাষ্টিক অর্থনীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থনীতিতে তুমি যত বড় কিছুই হও না কেন তাতে কিছু হবে না। আমি তার এ কথাটি মনে রেখেছি। আমি যদিও সামষ্টিক অর্থনীতি, আংকিক অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছি কিন্তু আমাদের দেশে ধান কত প্রকার, কখন রোপণ করা হয়, এক একর জমিতে কতটা ফলন হয়- এ বিষয়গুলো মোটামুটি আমার নখদর্পণে ছিল বলা চলে। এর সুফল আমি পেয়েছি যখন আমি কমনওয়লেথ বৃত্তির জন্য আবেদন করি তখন। আমাকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো। কক্ষে ঢুকে দেখলাম তিনজন ব্যক্তি উপস্থিত রয়ছেন। মির্জা নুরুল হুদা, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান কমিশনের প্রধান মফিজ উদ্দিন আহমেদ। মির্জা নুরুল হুদা স্যার ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বললেন, ও তো আমাদের শিক্ষার্থী, তুমিই প্রশ্ন করো। ড. ইউনূস আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘নারা’ মানে কী? আমি উত্তর দিলাম। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের দো-ফসলী জমি, তিন-ফসলী জমির মানে কী?  রবিশস্য মানে কী? এক একর জমিতে কী পরিমান ধান হয়? কী জাতীয় সার ব্যবহার করা হয় ইত্যাদি?

শামীম আজাদ: সেলিম, বাংলা ভাষার একটা শব্দ, শব্দের উৎপত্তি, উচ্চারণ সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে এনে তুমি আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলে। আহমেদ শরীফ স্যারের মাধ্যমে আমার ভেতরে বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে গ্রথিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে পড়ার সময় সবাই না হলেও কেউ কেউ কিন্তু মনে করছেন যে বাংলা তো আমাদের নিজেদের ভাষা এটা পড়াটা বোধহয় খুব সহজ। 

সেলিম জাহান: বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিন্তু অনেক রসিকতা প্রচলিত ছিল। এমন একটা রসিকতার কথা বলি। বাংলা বিভাগ থেকে পাস করেছেন এমন একজন তার চাকরি হচ্ছে না। ঘুরে ঘুরে একদিন তিনি চিড়িয়াখানায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। চিড়িয়াখানার পরিচালকের কাছে গিয়ে বললেন, আমার একটা চাকরি চাই। না হলে, আমি খেতে-পরতে পারছি না। পরিচালক বললেন, ঠিক আছে একটা ব্যবস্থা করা যাবে কিন্তু তুমি কি যে কোনো চাকরি করতে পারবে? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ, সব কাজই আমি করতে পারব। পরিচালক এবার বললেন, আমাদের চিড়িয়াখানার একটা বাঘ মারা গেছে। তুমি কী বাঘের মতো সাজ-পোশাক পরে বাঘ সেজে অভিনয় করতে পারবে? লোকটি রাজি হলো। বাঘের মতো সাজ-পোশাক পরে খাচার ভেতর ঢুকে সে দেখল যে আরও একটি বাঘ ওখানে আছে। তো সে খুব ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে লাগলো। এবার অন্য বাঘটি তাকে বলে উঠলো, ভয় পাবেন না, আমিও বাংলায় পাস করেছি।   

শামীম আজাদ:  গল্পটির মধ্যেই কিন্তু অনেক বিষয় আছে। আমি মনে করি কেউ বাংলায় যদি পাস করে তাহলে সে দেশ চালানো থেকে শুরু করে খাঁচার বাঘও হতে পারে। আমি বাংলায় পড়তে গিয়ে বাংলার ভিতর কত যে মানিকরতন রয়েছে তা আবিষ্কার করেছি। বাংলায় এত অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে। দেশকে খুব ভালো করে ধারণ করেন যারা তারাইতো বাংলা সাহিত্য পড়েন। দেশের জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের বেশিরভাগই বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি তারা কিন্তু বাংলায় পড়ছেন। অর্থাৎ স্বজাত্যবোধ স্বজাতির চেতনা নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ভাষার ধারক-বাহক হয়ে ওঠার জন্য সে মনীষীরা আমাদেরকে দীক্ষা দিয়েছেন এবং তারা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তুমি বাংলায় পড়তে এসেছো বলে একদম হেলাফেলা করলে হবে না। পঠন-পাঠন-ধারনের সেই ব্যাপারগুলো আমরা তাদের কাছ থেকে শিখেছি। রফিকুল ইসলাম স্যারের কাছ থেকে আমরা নওম চমস্কি সম্পর্কে জেনেছি সেই কত আগে। স্যার অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে নওম চমস্কি নামটা উচ্চরণ করতেন। নামটা শুনে আমার মনে হতো লোকটি বোধহয় খুব বৃদ্ধ হবে। পরে জানলাম, না। ইংল্যান্ডে এসে দেখি তিনি এখনো লিখছেন। এখনো বলছেন। ভাবুন, কত আগে সেই ১৯৬৯ এর সময় আমরা নওম চমস্কি সম্পর্কে জেনেছি। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের কথা বলি। স্যার ছিলেন অত্যন্ত নরম। স্মিত হাসতেন। স্যার আমাদের ভাষা ও ছন্দ পড়াতেন। ততদিনে আমি কিন্তু কবিতা লিখতে শুরু করেছি। মনিরুজ্জামান স্যার আমার যে ক্ষতিটা করেছিলেন তা হচ্ছে, তিনি আমাদের ছন্দ, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত বোঝানোর পর আমি আর আগের মতো ছন্দ-মাত্রার বাইরে গিয়ে কবিতা লিখতে পারি না। একটা কবিতা লিখছি আর আঙ্গুলে ছন্দ-মাত্রা গুনছি। সেই যে মাত্রা শিখেছি এখনো মাত্রার বাইরে গিয়ে লিখতে পারি না।

সেলিম জাহান: আমি তো বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয় একটি হাস্যরসাত্মক কথা বলেছি। বিষয়টিকে সমান্তরাল করতে এবার আমি অর্থনীতি বিষয়কে ঘিরে তেমন একটি মজার কথা বলব। নামকরা একজন অর্থনীতিবিদ যখন তার প্রথম নোবেল পুরস্কারটি পেলেন তখন তিনি ও তার সঙ্গী ভীষণ খুশি হলেন। তবে কিছুদিন পর তার সঙ্গীর সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করল। একপর্যায় বিবাহ বিচ্ছেদের কথা উঠলো। তখন সঙ্গী শর্ত দিলেন যে ও যদি দশ বছরের মধ্যে আবার নোবেল পুরস্কার পায় তাহলে তার অর্ধেক অর্থ আমাকে দিয়ে দিতে হবে। অর্থনীতিবিদ তো একথা শুনে একেবারে হেসেই অস্থির। আবার কবে নোবেল পুরস্কার পাবেন- এটাতো মোটামুটি  অসম্ভব। কিন্তু দেখা গেল সাত বছরের মাথায় ওই অর্থনীতিবিদ আবারো নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এবার নিউইয়র্ক টাইমসে বড় করে ছাপা হলো যে,  যিনি অর্থনীতিবীদ তিনি হচ্ছেন বড় বুদ্ধু। যার সঙ্গী সারাজীবন ঘরকন্যা করেছেন, সংসার করেছেন তিনিই আসলে বড় অর্থনীতিবিদ। এ গল্পের মূল কথা হচ্ছে, অর্থনীতিবিদরা তাদের অর্থ এবং অন্যান্য হিসাব রাখতে ব্যর্থ। আমি হচ্ছি তার প্রমাণ। আসলে অর্থনীতিবিদরা নিজেদের পণ্ডিত  মনে করেন কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষদের সিদ্ধান্তগুলো অনেক বেশি যথার্থ এবং প্রাসঙ্গিক। 

শামীম আজাদ: আমি নিজের একটা কথা বলি। সেদিন আমাকে আমার এক ছাত্র বলেছে, আপা, আপনি জীবনে এত রকমের কাজ করেছেন। সবাই বলে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না। আমি কিন্তু ইংল্যান্ডে ইংরেজীতে সাহিত্য চর্চা করছি আবার বাংলাতেও করছি। আমার জীবন দিয়ে আমি নানারকম মিথ ভেঙে চলেছি। দুই ভাষায় আমার সাহিত্যচর্চা ঠিকই চলছে।  ইংল্যান্ডে দেখেছি যে উপস্থাপনা করে সে অভিনয়, আবৃত্তি  থেকে  শুরু করে নাচতে কিংবা গাইতেও পারে। এটা খুবই দরকার। সব কিছুই জানতে হয়। তবে একটা বিষয়ে মাস্টার হতে হয়। অনেকে মনে করেন যে তিনি  হয়তো ইতিহাস পড়ছেন বলে ইতিহাসের বাইরে অন্য কোথাও কাজ করতে পারবেন না। তা কিন্তু নয়। আপনি জানেন না যে আপনি আরও কত কিছুতে আরো ভালো করতে পারেন। 

সেলিম জাহান: আমার বাবা বলতেন, ইউ হ্যাভ টু নো সামথিং অব এভরিথিং অ্যান্ড এভরিথিং অব ওয়ান থিং। অর্থনীতিতে খ্যাতিসম্পন্ন অনেক শিক্ষককে আমরা পেয়ছি যেমন অধ্যাপক আনিসুর রহমান। যারা তার ছাত্র তারা জানেন ক্যাপিটালস থিওরির মতো নিরস বিষয় কি চমৎকারভাবে পড়িয়েছিলেন। এটা শুধু নিরসই নয়, আংকিক বিষয়। যার মধ্যে প্রাণ বলে কিছু নেই। এখনো মনে আছে তিনি গ্রিক অর্থনীতিবিদ গ্যারিগন্যানির একটি আর্টিকেল ধরে ক্যাপিটাল থিওরির পুরোটা আমাদের পড়ড়িয়ে দিলেন। কী অসামান্য ছিল তার পড়ানো। অনেক তরুণ শিক্ষক আমাদের ক্লাস নিতে আসতেন। আমরা তখন নানান রকম ব্যাপার করতাম। আমি কিন্তু সরাসরি দুষ্টামি করিনি। কিন্তু দুষ্টুমির উপকরণ-ভাবনার ইন্ধন জুগিয়ছি। যেমন, আমি ক্লাসে ব্লেড নিয়ে আসতাম। না না, ভয়ের কিছু নেই! ব্লেডগুলোকে মাঝখান দিয় ভাঙা হলে ৫টি থেকে ১০টি টুকরো করা যেত। এমন যখন হতো যে  ক্লাসে আর আমরা মনোযোগ দিতে পারছি না তখন বেঞ্চের ফাঁকে ফাঁকে ব্লেডগুলোকে রাখা হতো এবং আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করা হতো। শিক্ষকরা ধরতে পারতেন না কোথা থেকে এ ধরনের শব্দ আসছে। আমার মনে হয়, আমার সহপাঠীদের মনে থাকবে যে আমি পকেটের মধ্যে মারবেল নিয়ে আসতাম। পেছনের দিকে যারা বসতো তাদের দিতাম। ক্লাসের মধ্যে মেঝেতে একটা মারবেল ফেলে দিলে অদ্ভুদ শব্দ হতো। এটাতে স্যাররা ভীষণ বিরক্ত হতেন। আরেকটা দুষ্টুমি আমরা করতাম তা হলো, ক্লাসের মাঝখানে পেছনের দরজা দিয়ে কেউ একজন বেরিয়ে যেতো। কোনো কোনো অধ্যাপক কিন্তু এটা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কিন্তু কেউ কেউ ছিলেন যারা এটা পছন্দ করতেন না এবং ‘কে বেরিয়ে গেল’ বলে সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে তাকে দেখতে যেতেন। তিনি সামনের দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে আরেকজন ততক্ষণে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আজ এতো বছর পর স্বীকার করছি যে, এসব উবর্র চিন্তাধারা আমার মস্তিষ্ক থেকে এসেছে। 

শামীম আজাদ: ক্লাস করতে করতে যখন বিরক্ত হই তখন আমরা যেটা করতাম তাহলো আমাদের কেউ কেউ মেঝেতে পা ঘষতে শুরু করতো। অথচ দেখো, মুনীর স্যার ক্লাসে রেজিস্টারই করতেন না। আমি নিজেকে দিয়ে বুঝেছি শুধু ভালো ছাত্র হলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। আবার ভালো ছাত্র না হলেও অসম্ভব ভালো শিক্ষক হওয়া যায়। শিক্ষকতা একটা শিল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছু অক্সফোর্ড ক্যামব্রিজ থেকে এসেছে। সেখানে যেমন টিউটোরিয়াল, হাউস টিউটর ব্যবস্থা ছিল আমাদের ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিতেও তা ধারণ করা হয়ছে। টিউটোরিয়ালের সময় আমরা গ্রুপে ভাগ  হয়ে শিক্ষকদের কক্ষে গিয়ে বসতাম। আমাদের খাতাগুলো স্যারের কাছে দিয়ে আসতাম এবং তা দেখে তিনি আমাদের ভুল-ক্রটিগুলো শুধরে দিতেন।

আজকালকার দিনে অনেকেই হয়তো আপনারা পুস্তক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আছেন। মনে আছে শিক্ষকরা আমাদের খাতাতে বিভিন্ন রঙের কালি দিয়ে লেখাগুলো সম্পাদনা করে দিতেন। আমাদের লেখার ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন। 

সেলিম জাহান: অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসাবে আমি মনে করি যে আমরা এটা থেকে বঞ্চিত হয়ছি। কারণ আমাদের টিউটোরিয়াল ছিল না। যেহেতু অক্সফোডের্র নমুনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়ছে তাই টিউটোরিয়াল ব্যবস্থা ছিল। আমার মনে হয় টিউটরিয়াল ব্যবস্থার একটা দিক হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়ন। 

শামীম আজাদ: আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে মেন্টরিং। ইংল্যান্ডে ক্রিয়টিভ রাইটিং বিষয়ে পড়াতে গিয়ে দেখেছি  মেন্টরিং বিষয়টা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু ক্লাসে পড়িয়ে গেল তা নয়,  পাশাপাশি তার তার শিল্পবোধ, দর্শন, জীবনচিন্তা এগুলো থেকেও শিখবার  ও জানবার আছে। ক্লাসে ২৯টা ছেলেমেয়রে কাছে একসঙ্গে পৌঁছানো যায় না,  টিটোরিয়ালে এ বিষয়গুলো অতিক্রম করা যায়। 

সেলিম জাহান: কারণ এক ধরনের নিবিড় সংযোগ হয়। আর টিউটোরিয়ালে প্রত্যেকবারই কিছু না কিছু লিখতে দেয়া হতো। পরে শিক্ষক আবার সে লেখাগুলো  সংশোধন করতেন। আমার বাংলা এবং ইংরেজি অনেক বন্ধু বলেছে তাদের লেখার হাতেখড়ি কিন্তু ওইখানে।

শামীম আজাদ: টিউটোরিয়াল এর মাধ্যমে তুমি এত সুন্দর একটা প্রসঙ্গ আনলে। আমার বিদ্যাসাগরের কথা মনে হচ্ছে। বিদ্যাসাগরের হস্তাক্ষর ছিল অসম্ভব সুন্দর। আমাদের সময় একটা বিষয় ছিল যে, যারা খুব ভাল ছাত্র নম্র-ভদ্র হতো তাদের হাতের লেখা খুব সুন্দর হতো। জানেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন হাতের লেখার শাস্তি হতো। আমি তখন মর্গান স্কুলে পড়তাম। ড. সাফিয়া খাতুন, ভাষা সৈনিক, তিনি তখন আমাদের স্কুলের হেড টিচার ছিলেন। তখন আমার বয়স ১২ কি ১৩ বছর হবে। আমাদের স্কুলের বাস রাখার গ্যারেজের ফাঁক দিয়ে আচারওয়ালার আমাদের কাছে আচার বিক্রি করতো। এগুলো স্কুলে নিষিদ্ধ ছিল। টিফিন হলে দেখা যেত আমরা দু আনা চার আনা দিয়ে ওই আচার কিনে খাচ্ছি। মাঝে মাঝে আপা তার বাহিনী নিয়ে এসে আমরা যে দরজা দিয়ে গ্যারেজে ঢুকেছি ওই দরজাটা বন্ধ করে দিতেন। একদিন এরকম করলে আমি ধরা পরে গেছি।  সেদিন আমাকে আড়াইশবার সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখতে হয়ছিল যে, ‘আর চুরি করিয়া আচার খাইবো না’! 

সেলিম জাহান:  তখন কিন্তু এরকম নিয়ম ছিল। যেমন: এক হাজারবার লিখতে হবে, ‘সদা সত্য কথা বলিব’। গ্রীষ্মের ছুটিতে মনে আছে প্রতিদিন এক পাতা ইংরেজী ও এক পাতা বাংলা লিখতে হতো। যাইহোক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে আমাদের বিভাগের শিক্ষক তো ছিলেনই তবে এমন কিছু শিক্ষক ছিলেন যাদেরকে আমরা বলি সর্ববিভাগীয় শিক্ষক। তাদের পড়ানোর ভঙ্গি এত চমৎকার ছিল যে বাইরের বিভাগ থেকে ছাত্রছাত্রীরা তার ক্লাস করতে আসতো। যেমন, মুনীর চৌধুরী। তার ক্লাসে এত ভিড় হতো যে বাইরে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা তার ক্লাস করত। অর্থনীতিতে যেমন ছিলেন আনিসুর রহমান স্যার। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা তার ক্লাসে আসতো। রেহমান সোবহান স্যারের ক্লাসেও তাই। যেহেতু তিনি রাজনীতির কথা বলতেন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির কথা বলতেন, তার ক্লাসকে ঘিরে সবাই আগ্রহী হতো। 

শামীম আজাদ: সেলিম, তুমি যখন ক্লাস নিতে তোমার ক্লাসেও তো অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা চলে আসতো। 

সেলিম জাহান: সেটা সত্যি- কার্জন হল থেকেও শিক্ষার্থীরা এসেছে। আমি যখন শিক্ষক হয়েছি তখন আমি কতগুলো নিয়ম পালন করেছি। আমি পেশাগত দিক  দিকে বিভিন্ন জায়গাতে কাজ করেছি তবে আমি সবসময় আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে শিক্ষকতা জীবনকে সবচাইতে সুখময় হিসেবে মনে করি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদেরকে আমি আমার শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছি তারা সবসময় আমার গর্ব এবং অহংকারের জায়গা। এ জন্য নয় যে তারা খুব প্রতিষ্ঠিত, যদিও এটা খুব ইতিবাচক বিষয় তবু আমার মনে হয় যে তাদের সঙ্গে আমার অন্তরের একটা যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। আমি তিনটা নীতি মেনে চলি। প্রথমত, আমি কখনো অপ্রস্তুত অবস্থায় ক্লাসে যাইনি। দ্বিতীয়ত, আমি আমার পড়ানোর সময় সর্বপ্রথম সবচেয়ে দুর্বলতম ছাত্রটির কথা মনে রেখেছি কারণ আমি মনে করি সব থেকে দুর্বল ছাত্রটির কাছে যদি আমি পৌঁছাতে পারি তাহলে বাকিদের কাছেও পৌঁছাতে পারবো। তৃতীয়ত, আমি কখনো ছাত্রদেরকে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করিনি। আমি যদি কিছু না জানি তাহলে আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে না আমি তো জানি না, পরবর্তীতে হয়তো একত্রে বসে সেটার একটা সমাধান খুঁজে বের করেছি। 

শামীম আজাদ: আমি তোমার তৃতীয় প্রসঙ্গটা ধরেই বলি, আমার জীবনের শিক্ষকতার শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়ছি আসলে ঢাকা কলেজে। আমি মৌলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে পড়িয়েছি, তিতুমীর কলেজে পড়িয়েছি। আবার ইংল্যান্ডে এসে আমি যেমন একেবারে ছোটদের পড়িয়েছি তেমনি বড়দের ক্রিয়টিভ রাইটিং পড়িয়েছি। কখনো ব্যর্থ হইনি। কারণ  যখন নতুন জায়গায় গিয়েছি তখন নতুন জিনিস পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে আমি আমার পুরনো জানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছি।

মাইকেল রোজেন একসময়ের লিটারেচার লরিয়েট। তিনি একটা কথা বলেছিলেন যে, ‘অলওয়জে বি প্রিপেয়ার্ড অ্যান্ড রিমেম্বার দ্যাট ইউ শুড নো ইউর কোর কন্টেট।’ ইংল্যান্ডে তো আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে দেখতে আমি ইংরেজদের মতো নই, আমার বর্ণ, আমার উচ্চারণ ইংরেজদের মতো নয়। এ কারণে যখন আমি কোনো স্কুল বা প্রতিষ্ঠানে যাই তখন আমি আমার চ্যালেঞ্জের কথা মনে রাখি। আমি যে বিষয়টি  নিয়ে পড়াবো তা জেনে বুঝে আমি ক্লাসে যাই। ঢাকা কলেজের কথা যেমন, সমস্ত দেশের ছাত্ররা এখানে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হয়েছে। আমার ছাত্রটিই হয়তো আমার থেকে মেধাবী, আমার থেকে কোনো বিষয় ভালো জানে। তাই আমি ক্লাসে তাদের মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রস্তুতি নিয়ে যেতাম। 

সেলিম জাহান: সাবসিডিয়ারি ক্লাসগুলো নেয়ার মাধ্যমে আমি আমার শিক্ষকতা শুরু করেছি। ড. নুরুল হুদা স্যারের একটা নীতি ছিল যে, বিভাগে নতুন যে শিক্ষকই আসুক না কেন তাকে প্রথমে সাবসিডিয়ারি ক্লাস দিতে হবে। তার কথা ছিল এত বড় ক্লাস এবং বিভিন্ন বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছে তাদের সঙ্গে যদি তুমি মানাতে পারো তাহলে অনার্স পর্যায়ের ছাত্রদের পড়াতে তোমার কোন অসুবিধা হবে না। আমার ছাত্ররা বলতো যে, আমি তাদের নম্বর অনেক বেশি দিতাম। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমি নাম ডাকার পক্ষপাতী নই কারণ আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যলয়ে যারা ছাত্র হিসেবে আসছেন তারা একটা দায়ত্বিবোধ নিয়ে  আসছেন এবং তাদেরকে যদি নাম ডাকার ছুতো দিয়ে আমার ক্লাসের মধ্যে ধরে রাখতে হয় তাহলে আমি মনে করি যে শিক্ষক হিসেবে আমি ব্যর্থ। আমি যা পড়াই তার গুনে ছাত্ররা আমার ক্লাসে আসবে। আর বেশি নম্বর দেয়ার বিষয়ে বলবো, আপনারা সবাই ভেবে দেখতে পারেন আমাদের প্রত্যকটা বিষয়ে নাম্বার ১০০ করে। কিন্তু প্রথম শ্রেণী পাওয়া যায় ৬০ নাম্বার হলে বাকি ৪০ নাম্বার কোথায় যাবে? আমার মনে আছে নাম্বার বেশি প্রদানের কারণে আমাকে  বিশ্বাবদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে তলব করা হয়েছিল। আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে যে আমি মার্কস হিসেবে ৮০ থেকে শুরু করে ৯৫, ৯৬ পর্যন্ত দিয়েছি। যেটা নাকি বিশ্ববিদ্যায়রে নীতিমালা বিরোধী। 

শামীম আজাদ:  হ্যাঁ, তুমি বিষয়টি নিয়ে আমাকে বলেছ। বিদেশে দেখো ওরা কিন্তু এভাবেই নাম্বার দেয়। কোনো শিক্ষার্থী যদি বেশি নাম্বার পায় তাহলে আমি ইচ্ছে করে কেন তাকে কম দিব? 

সেলিম জাহান: আরেকটা বিষয় হচ্ছে এই নাম্বার নিয়ে আমরা যখন বিদেশে পড়তে এসেছি তখন কিন্তু আমরা নানা রকম সমস্যার মধ্যে পড়েছি। এখানে ব্যবস্থা কিন্তু প্রথমে স্বীকার করতে চায়নি ৬০ নাম্বার মানে ওটা প্রথম শ্রেণী। তাদের বোঝাতে হয়েছে। এবং বুঝতেও খুব অসুবিধা হয়েছে। তারা তখন একটা শব্দ ব্যবহার করেছে যে, ইকুইভ্যালেন্ট বা সমতুল্য। 

শামীম আজাদ: বিদেশে এসে আমাদের অনেকেরই এটা বলতে হয়েছে যে ইকুইভ্যালেন্ট টু ফার্স্ট ক্লাস। কোনোক্রমে ৬০ এর ওপর পেলে ফার্স্ট ক্লাস কিন্তু সেই ছাত্রছাত্রীটি হয়তো ৭৫ পেতে পারে। এটাতে তো কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। আমি কেন শিক্ষক হিসাবে শিক্ষার্থীদের কম নম্বর দিব সে যদি পরিপূর্ণ উত্তরটি দেয়। 

সেলিম: ঠিক বলেছ।  

শামীম আজাদ: এ পর্যায়ে একটা গল্প বলি। আমেরিকার একটা অঞ্চলে ছেলেমেয়দের লেখাপড়া নিয়ে পিতা-মাতারা শঙ্কিত কারণ ওখানে বন্দুকবাজি চলে। শিক্ষার্থীরা কিছুতেই আর ক্লাসে আসতে চান না। সেরকম একটা পশ্চাৎপদ স্কুলে অনেক কষ্টে একজন শিক্ষক জোগাড় হল। শিক্ষক আবার খুবই ভালো। তিনি খুব পড়াশোনা করে ক্লাসে যান। শিক্ষার্থীদের বিনোদিত করেন। কিন্তু তিনি দেখলেন ক্লাস শেষে প্রশ্ন করলে শিক্ষার্থীরা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। শিক্ষক খুব দুঃখিত মনে প্রধান শিক্ষককে বললেন যে আমি চাকরি ছেড়ে দিব।  উত্তরে প্রধান শিক্ষক বললেন যে, আপনি চাকরি ছাড়বেন কেন আপনি যে ওদের ৪৫ মিনিট ক্লাসের মধ্যে আটকে রাখতে সমর্থ হন সেটাই তো আমাদের জন্য অনেক বড় মঙ্গলজনক কাজ। সেলিম, তোমার ওই সাবসিডিয়ারি ক্লাসটাও কিন্তু তাই।   

সেলিম জাহান: শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার কাজটি কিন্তু কঠিনই। 

শামীম আজাদ: জানো, আমি যখন বিচিত্রায় কাজ করতে শুরু করি সেখানে ওরকম একটা পদ্ধতি ছিল। শাহদাত চৌধুরী প্রথম দিনেই আমাকে বিশাল বিশাল কয়েকটা অনুবাদ করতে দিলেন। আমি বাসায় অনেক খেটেখুটে অনুবাদগুলো করে নিয়ে যাওয়ার পরে কিন্তু সেগুলো কখনও ছাপা হয়নি। পরে বুঝেছিলাম যে আমি এ পেশায় টিকবো কিনা তা পরীক্ষার জন্য তিনি আমার আমার ধৈর্য পরীক্ষার ও আমার জানাশোনাকে যাচাই করার জন্য ওগুলো আমাকে অনুবাদ করতে দিয়েছিলেন। চমৎকার একজন সম্পাদক ছিলেন শাহদাত চৌধুরী। সেলিম এইবার বলো তোমার পরীক্ষার শুরুর আগের কথা মনে আছে কিনা। পরীক্ষার আগে আগে কিন্তু আমরা পড়াশোনা করতে লাইব্রেরিতে গিয়ে বসতাম আর উঠতামই না।

 সেলিম জাহান: বলো তো ঠিক কটার সময় লাইব্রেরি খুলতো?

শামীম আজাদ: খুব সকালে।

সেলিম জাহান: সকাল ঠিক সাড়ে ৭টায়।

শামীম আজাদ: রোকেয়া হলের কাছাকাছি থাকাতে আমরা যেতাম বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি ও পাবলিক লাইব্রেরিতে... 

সেলিম জাহান: যেখানে নভেরার কয়েকটি ভাস্কর্য ছিল। 

শামীম আজাদ: আমরা বাংলা সাহিত্যের যারা তারা বাংলা একাডেমিতে যেতাম। ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতেও গিয়েছি। বাংলা একাডেমিতে যাওয়ার সময় আমরা কিন্তু সরাসরি রেসকোর্স ময়দান দিয়ে যেতাম। সাদা কাঠের সীমানা করা ছিল। সেখান দিয়ে ঘোড়া দৌড়াতো। সেহরাওয়ার্দ্দী উদ্যান হয়েছে পরে। আমরা কিন্তু ভাগাভাগি করে পড়তাম। বন্ধুদের বলতাম যে তুই ওই চ্যাপটার পড়বি আমি এই চ্যাপটার পড়বো। পরে আমি তোকে বোঝাবো তুই আমাকে বোঝাবি । আমার বাংলার পার্টনার ছিল ফজিলুতুন্নেসা লিলি। ওর হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল।

আচ্ছা, সেলিম, লাইব্রেরির নিচে সবসময় ভিড় থাকতো কেন বলোতো? 

সেলিম জাহান: লাইব্রেরিতে ঢুকে যদি প্রথমে ডান দিকে যাও তাহলে সেখানে ক্যাটালগ ও বিভিন্ন দেশের জার্নাল পত্রিকাগুলো কাঠের কাঠামোতে আটকানো থাকতো। বড় বড় গোলটেবিল ছিল ওখানে বসে সবাই আড্ডা দিতো।  তুমি যে ভিড়ের কথা বলছো তা মূলত কোনো সহপাঠী হয়তো সহপাঠিনীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে তখন তারা মূলত ওই জায়গায় বসে কথা বলতো। 

শামীম আজাদ: তোমার কি মনে আছে যে আমাদের লাইব্রেরিতে ছোট একটি জায়াগা মত ছিল যেখানে বইয়ের টোকেন নাম্বারটা রাখা হতো। ক্যাটালগের ছোট ছোট বক্স ছিল। তখন তো কম্পিউটার ছিল না। আমরা ক্যাটালগের  মাধ্যমে দেখতাম কী কী বই আছে। 

সেলিম জাহান: শিক্ষকেরা কিন্তু এক সঙ্গে ২৫টি বই নিতে পারতেন। এ কারণে অনেক সময় দেখা যেত যে আমরা আর ওই বইটি পাচ্ছি না। তাই আমি সাড় ৭টায় গিয়ে যে বইটা আমার লাগবে ওটা ইস্যু করে নিতাম। এরপর জিনিসপত্র রেখে নিচে তুমি যেটাকে বলে সবাই যেখানে বসে আড্ডা দিতো ওখানে বসতাম।   

শামীম আজাদ: আমি আর বাবলী কী করতাম জানো, আমরা অন্য জায়গায় বই লুকিয়ে রাখতাম যাতে পরেরদিন গিয়ে বইটা আমরা সহজে পেতে পারি। 

সেলিম জাহান: লাইব্রেরির ওখানে ভিড় হওয়ার অনেকগুলো কারণ ছিল। পেছনের দিকে ছিল শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন। সামনের দিকেও একটি ক্যান্টিন ছিল। মালিকের নাম মনে নেই। কিন্তু যে ছেলেটি চা এনে দিত তার নাম ছিল পেড্রো। এখানে বসার একটা কারণ হচ্ছে চা খাওয়া। দ্বিতীয় আড্ডা দেয়া। তৃতীয়, যত সহপাঠিনী যাচ্ছে তাদেরকে দেখা। 

শামীম আজাদ: আমরাও কিন্তু আমাদের সহপাঠীদের দেখতাম। আমাদের সহপাঠীরা তখন বেল-বটম প্যান্ট পরতো। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। মুক্তিযুদ্ধের পর ছেলেদের লম্বা চুল রাখার একটা ফ্যাশন হয়ে গেল এবং সে চুলের মধ্যে চিরুনি পড়তো না।

সেলিম জাহান: লাইব্রেরির সামনে প্রতিদিন যাকে দেখা যেত তিনি ছিলেন নির্মলেন্দু গুণ। তিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতেন না কিন্তু লাইব্রেরির সামনে সিমেন্টের বাঁধাই করা যে জায়গাটা ছিল সেখানে অন্যদের সঙ্গে বসে গল্প করতেন। পাবলিক লাইব্রেরি সম্পর্কে দুটো কথা খুব সংক্ষেপে বলছি। পাবলিক লাইব্রেরিতে একটা মিলনায়তন ছিল সেখানে মুনীর চৌধুরীর নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা’ নাটকগুলো মঞ্চস্থ হয়েছে। আজকাল আমার জায়গাটা দেখলে খুব খারাপ লাগে এ কারণে যে, লাইব্রেরিতে ঢুকলে একটা বারান্দা ছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মাচের্র ভাষণ আমি ওই বারান্দা থেকেই দেখেছি ও শুনেছি। ওই বারান্দাগুলোকে এখন তারের জাল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়ছে। ছাত্ররা নাকি বই নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। এটা প্রতিহত করতে খাঁচার মতো তারের জাল দিয়ে ঢেকে দেয়াটা দুঃখজনক। 

শামীম আজাদ: আমি একটু বলে রাখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে শততম বর্ষ উপলক্ষে ‘শতরূপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ হয়ছে সেখানে তোমার ও আমার লেখা স্যারের সর্বশেষ লেখাটি রয়েছে। ওখানে আমি আমাদের শহীদ শিক্ষকদের নিয়ে লিখেছি। অনেক শিক্ষার্থী এসে গ্রন্থখানা নিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের জানবার এ আগ্রহ আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে। 

সেলিম জাহান: আমাদের এ অনুষ্ঠানের কারণে আমাদের শহীদ শিক্ষকদের সন্তান-সন্তানরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সম্প্রতি রাশেদুল হাসান স্যারের ছেলে মাহমুদুল হাসান এবং কন্যা সুরাইয়া আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এবং মাহমুদ আমাকে লিখেছে  যে আমার বাবা ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন কিন্তু তিনি ভীষণরবীন্দ্র ভক্তও ছিলেন।

শামিম আজাদ: যারা ইংরেজীর ছাত্র তারা কিন্তু বাংলা সাহিত্যেও অসামান্য। আবু সায়ীদ, নূরুল হুদা, মুনীর চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। 

সেলিম জাহান: আবুল হাসান কিন্তু ইংরেজীতে ভর্তি হয়েছিলেন। 

শামীম আজাদ: ইংরেজীর ছাত্ররা ইংরেজীতে পঠন-পাঠন করেছে। ইংরেজী আত্মস্থ করেছে। তারপরে বাংলার দিকে তাকিয়ছে। ইংরেজী সাহিত্যের যে কতগুলো প্রথা, নিয়ম এবং কায়দা তারা রপ্ত করেছেন তার জন্য তাদের লেখা সবসময় খুব চমৎকার হয়।  

সেলিম জাহান:  আমি যদি অর্থনীতির দিক থেকে বলি আমরা সবাই মনে করি শওকত ওসমান বাংলার ছাত্র মোটেই কিন্তু তা নয় তিনি অর্থনীতির ছাত্র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একবছর অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন। প্রথম বর্ষে খুব ভালো শিক্ষক পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়বর্ষ যখন তার শিক্ষক আর ভালো লাগলো না তিনি অর্থনীতি ছেড়ে দিলেন। আমাদের স্মৃতিচারণে আমরা কিন্তু সব সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকছি না, থাকার ইচ্ছাও নেই। আমরা আমাদের সময়টা নিয়ে কথা বলছি। আমাদের সময়টা নিয়ে আসছি এবং এই সময়টাকে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয়ছে সেটা সম্পর্কে বলছি। 

শামীম আজাদ: তোমার একটা খুব সুন্দর লেখা পড়ছিলাম। যেখানে তুমি বলছিলে পাড়ার অভিভাবকদের কথা বলেছিলে। আসলে আমরা কিন্তু সবাইকে নিয়ে বড় হয়ছি। আমাদের সময়ে পাড়ার অভিভাবকদের মধ্যে থেকে কেউ যদি জানতেন যে ওই ছেলেটি বা মেয়েটিও তার মতো  সৃষ্টিশীল বা তার সম্পর্কে আগ্রহ আছে তখন তিনি কিন্তু তাদের বাসায় আসতেন। আমি এখানে বাবলীর কথা বলব। বাবলী তখন লিখতে শুরু করেছে। বাবলী আর কবি জসীমউদ্দীন এক পাড়াতে থাকতো। বাবলী, কবি জসিম উদ্দিনকে দাদু বলে ডাকতো। জসীমউদ্দীন বাংলার ছাত্র ও শিক্ষক ছিলেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বছর সেই ১৯৬৯ সালে সোনারগাঁয়ে গিয়েছিলাম। তিনিও আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। পুরাকীর্তি পুনরুদ্ধার করার জন্য শিল্পী, সাহিত্যিক কবি সবাই  মিলে  সেদিন সেখানে গিয়েছিলেন। সোনারগাঁয়ের সত্যাগ্রহ রক্ষা করতে সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শিল্প সাহিত্যিক সবাই মিলে সোনারগাঁয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের শিক্ষকেরা তারা যে যে বিভাগের হোন না কেন জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে গেছেন।  

সেলিম জাহান: ‘স্মৃতি সততঃ সুখের’ আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। কিন্তু  নিজেদের কথা বলার পাশাপাশি আমরা আমাদের মূল্যবোধ, যেভাবে আমরা বড় হয়েছি, সে সময় যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেগুলোকে আবার সামনে তুলে নিয়ে আসতে চেষ্টা করবো। কারণ আমরা ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে সাধারণ জীবনযাপনের অধিকার-অভিজ্ঞান নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ- সহনশীলতা ইত্যাদি নিয়ে বড় হয়েছি তা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো 

শামীম আজাদ: এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিন্তু বহু অমূল্য রতন সংগৃহীত হচ্ছে। আমরা যেমন নতুন নতুন মানুষের সন্ধান পাচ্ছি তেমনি অনেক ছবি আসছে, অনেক লেখা আসছে, এগুলো আর্কাইভ হিসেবে থেকে যাবে।

(চলবে)

লেখক পরিচিতি:  

শামীম আজাদ একজন কবি, লেখক ও গল্পকথক। তিনি বাংলা ও ইংরেজী দু’ভাষাতেই লেখেন। সত্তুরের দশকে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ শামীম তরফদার নামে প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে ফ্যাশান সাংবাদিকতার। যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষার অন্যতম কবির গ্রন্থসংখ্যা প্রায় চলি­শের কাছাকাছি।

ড. সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দু’দশক ধরে। ইংরেজী ও বাংলায় তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

শ্রুতিলিখন: রুহিনা ফেরদৌস