দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বিদ্যায়তনিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ভূমিকা অপরিহার্য। মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বিভিন্ন খাতের চাহিদা উপযোগী জনশক্তি জোগান দেয়া সম্ভব। কিন্তু বিরাজমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কিছু অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতায় অনেক ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ আরো বেশি মাত্রায় একীভূত হচ্ছে, নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এখানে প্রবেশ করছে এবং অর্থনীতিরও দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতিজগতে দক্ষতা উন্নয়ন একটি বড় প্রাধিকার হিসেবে সামনে এসেছে। এজন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, বাড়ানো হচ্ছে সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যাও। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বড় মাত্রায় এক্ষেত্রে সংযুক্ত হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে থাকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ৮৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের। অথচ দুঃখজনকভাবে এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধিকাংশই মানহীন; আছে প্রশিক্ষণ ছাড়া অর্থের বিনিময়ে সনদ বাণিজ্য ও প্রতারণার মতো অভিযোগও। এসব অনিয়ম রোধ করে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও তদারকি বাড়াতে হবে। দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা।

বর্তমানে বেসরকারি খাতের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে এনজিওগুলোর মাধ্যমে, আরেকটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান দ্বারা। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উল্লেখযোগ্যসংখ্যকেরই নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ও অন্য সুবিধাদি। আবার কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সরকারি নিবন্ধনও নেই বলে খবর মিলছে। ফলে ভুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় মানুষের প্রতারণার সুযোগ থেকে যাচ্ছে। এটা শক্তভাবে দমন করতে হবে। অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে মানুষের বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা চাহিদা আরো বাড়বে। প্রশিক্ষণ একটি লাভজনক ব্যবসা বিবেচনায় অনেকেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হবে। সুতরাং এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুশৃঙ্খলা নিশ্চিতের জন্য এখন থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিবন্ধন পেতে অবকাঠামো, প্রশিক্ষক ও অন্য আনুষঙ্গিক লজিস্টিকস সুবিধার একটি ন্যূনতম মানদণ্ড ও শর্ত বেঁধে দেয়া যেতে পারে। সব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য খাতওয়ারি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে যুগোপযোগী বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডিউল ও ম্যানুয়েল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিজস্ব ম্যানুয়েল আছে বটে, কিন্তু সেগুলো যুগ চাহিদা মেটাতে পারছে না। ফলে প্রশিক্ষণ ও বাস্তব কর্মজগতের ব্যবধানজনিত দক্ষতা ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। কাজেই মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত ও জনশক্তির দক্ষতা বাড়াতে খাতভিত্তিক হালনাগাদ প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কাজটি করতে হবে এনএসডিএকে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক ম্যানুয়েল প্রণয়ন করে সেটি ছাপা আকারে এবং অনলাইনে সহজলভ্য করলে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া এনএসডিএর তত্ত্বাবধানে একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকাটাও দরকার। প্রশিক্ষণ যেখানেই হোক না কেন, প্রশিক্ষণ শেষে সরকারিভাবে এ ধরনের একটি পরীক্ষা নেয়ার কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এমনটি হলে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করে জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন করা কঠিন হবে না।

দেশে এখন জনমিতিক বোনাসকাল চলছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিপুল। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে প্রবেশ পর্যায়ের চাকরি থেকে শুরু করে উচ্চ দক্ষ পদগুলোয় কর্মনিয়োজন বৃদ্ধির সুযোগ আছে। কাজেই এটা মাথায়  রেখে দেশের দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনা সামগ্রিকভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতির সঙ্গে শ্রমবাজার ও সামাজিক সুরক্ষা নীতি, শিল্প, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নীতিগুলোর সম্মিলন ঘটাতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখন আমাদের দোরগোড়ায়। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো এর প্রভাব এখানেও পড়তে বাধ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক হিসাবমতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাহিত প্রযুক্তিগুলো এবং অটোমেশনের কারণে ২০৪১ সাল নাগাদ আমাদের পোশাক খাতে ৬০ শতাংশ, আসবাব শিল্পে ৫৫, পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে ২০ ও চামড়া খাতে ৩৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মচ্যুত হতে পারেন। এটা বড় শঙ্কার বিষয়। অন্যদিকে আলোচ্য শিল্প বিপ্লবে নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষত এর ফলে ডিজিটাল মার্কেটিং, স্বয়ংক্রিয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডাটা অ্যানালিটিকস, মোবাইল প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টার অপারেটর, মডেলিং ও সিমুলেশন, অটোমেশন ও রোবোটিকস কনট্রোল, ব্লকচেইন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি প্রভৃতি ক্ষেত্রে কাজের চাহিদা বাড়বে। কাজেই কোন কোন খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে আর কোন কোন খাতে বাড়তে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত, শিক্ষাগত রূপান্তরের সঙ্গে প্রশিক্ষণের কাজটি  বেগবান করতে হবে।

আইএলওর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের প্রতিযোগী পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে আংশিক বা পুরোপুরি অটোমেশন প্রবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা বস্ত্র ও পোশাক শিল্পে পাঁচজনের মধ্যে তিনজন শ্রমিকই কর্মচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখানেও এ ধরনের লক্ষণ এরই মধ্যে পরস্ফুিট। কাজেই দেশ দুটি শ্রম চাহিদা কমে যাওয়া খাতগুলো থেকে যেখানে লাগবে সেখানে শ্রমশক্তিকে কী ধরনের নীতি নিয়ে স্থানান্তর করছে এবং কী ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে, তা অনুসরণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এখনো পরিবর্তন ঘটছে। ক্রান্তিকালীন পর্বে দেশগুলো অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়ানোর কাজটি যুগপত্ভাবে করে গেছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো পর্যালোচনা করে আমাদের সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ জরুরি।