ভূমি নিবন্ধন ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ অনেক দিনের। কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও একে পুরোপুরি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি। তার মধ্যেই একটি সুখবর মিলল নিবন্ধন ও নামজারি নিয়ে। সফটওয়্যার ব্যবহার করে স্বচ্ছতার সঙ্গে জমির রেজিস্ট্রেশন করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি ও রেকর্ড সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে জমির রেজিস্ট্রেশন শেষ হওয়ার আটদিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি হয়ে যাবে এবং এসি ল্যান্ডকে বাধ্যতামূলকভাবে সেই জমির রেকর্ড সংশোধন করতে হবে। এর মাধ্যমে ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণের এক ধাপ অগ্রগতি অর্জিত হলো। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও অনেক দিনের চাওয়া ছিল এটি। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ। এতে জমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা অনেক কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক দিন থেকে কার্যক্রম চলছিল জমির রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশন কীভাবে আরো স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করা যায়, মানুষের হয়রানি না হয় এবং সময়ও যাতে কম লাগে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাব-রেজিস্ট্রার অফিস করে। আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন উপজেলা অফিস বা সার্কেল ভূমি অফিস জমির নামজারির কাজ করে। দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হয় বলে সমন্বয় করা কষ্টসাধ্য ছিল, এজন্য দীর্ঘসূত্রতা ছিল। রেজিস্ট্রেশনে অস্পষ্টতা ছিল। যেকোনো জমি যে কেউ গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে পারত। আবার মিউটেশনের ক্ষেত্রে ঝামেলা হতো। দলিল পাওয়া যেত না। এসব কারণে দীর্ঘদিন এগুলো পড়ে থাকত। এখন থেকে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও এসি ল্যান্ডের অফিসের মধ্যে ইন্টার অপারেটেবল সফটওয়্যার থাকবে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও এসি ল্যান্ড অফিসের একজন আরেকজনের ডাটাবেজে প্রবেশ করতে পারবে। আশা করব, দ্রুতই উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাও সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন করা হবে।

মালিকানার রেকর্ড ব্যবস্থাপনায়ও একেক জায়গায় একেক রকম। কিছু জায়গায় জমি বিক্রি হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেয়া হয়। নাইজেরিয়া ও বেলারুশে জমির মালিকানার প্রমাণপত্রে লেখা থাকে সেই জমি কতদিন পর্যন্ত ভোগদখল করা যাবে। ভিয়েতনামে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে না। সেখানে দলিল মানে ভূমি ব্যবহারের অধিকার পত্র। আর জাপানে ভূমি ও স্থাপনাকে আলাদাভাবে দেখা হয়। ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ভূমি রেজিস্ট্রি এবং ক্যাডেস্টারে কেবল গ্রামীণ এলাকার জমিসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। শহরের জমির তথ্য তত্ত্বাবধান করে অঙ্গরাজ্য ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। বিশ্বব্যাপী সম্পত্তি আইন ও ব্যবস্থাপনায় অনেক তারতম্য থাকার কারণে স্থানীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। সম্পত্তির রেকর্ড সাধারণত জাতীয়ভাবেই রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভূমি মালিকানা রেকর্ড থাকে স্থানীয় পর্যায়ে, সাধারণত কাউন্টি নথিরক্ষক বা কর নির্ধারকের কার্যালয়ে। অনেক জায়গায়, বিশেষত সাব-সাহারান আফ্রিকায় অল্প কিছু জমির নিবন্ধন বা মালিকানা নির্দিষ্ট করা আছে। সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় বেশির ভাগ জমির মালিকানা নির্ধারিত হয় প্রথা-নিয়ম মেনে, কাগজে-কলমে নয়। তাই মালিকানার দাবি নিয়ে প্রায়ই সংঘাত দেখা দেয়। তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে গিয়ে সরকারও অহরহ বিতর্কের জন্ম দেয়। এর সমাধানে ডিজিটালাইজেশন ও ভূমি অফিসের কাছে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

অনেক ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্রেশন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা বা অপ্রতুলতা রয়েছে। অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিস পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কাজের পরিধি ও নিয়োজিত লোকবলের তুলনায় কক্ষের অপ্রতুলতা রয়েছে, বিশেষ করে নকলনবিশদের ক্ষেত্রবিশেষে ২০-২৫ জনকে একটি কক্ষে এমনকি সিঁড়ির নিচে ও বারান্দায় বসে কাজ করতে হয়। একইভাবে অধিকাংশ জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত রেকর্ড রুমগুলো পুরনো ও প্রয়োজনের তুলনায় অপরিসর এবং কক্ষগুলো স্যাঁতসেঁতে থাকায় পোকামাকড়ের (উইপোকা) উপদ্রবে গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও বিভিন্ন নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এখন এসব বিষয়েও দৃষ্টি দিতে হবে। ভূমি জরিপ ও নিবন্ধন ডিজিটালকরণের যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে, তাতে ভূমিসংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতি পুরোপুরি কমবে না। শুধু কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে জমির পুরনো কাগুজে রেকর্ডপত্র স্ক্যান করে রাখলেই সার্বিকভাবে এর সুফল জনগণ পাবে না। ডিজিটাল পদ্ধতির সুফল নিশ্চিত করতে হলে ভূমির রেকর্ডপত্রসহ সব ধরনের তথ্য কম্পিউটারাইজ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমির রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ, রেজিস্ট্রেশন, নকশা প্রণয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে জালজালিয়াতির কারণে ভূমি নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ রয়েছে। তা বাড়ছেও বটে। আর এসব বিরোধের জের ধরেই চলে এ খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। এটি দূর করতে ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নকলনবিশ ও দলিল লেখকদের কঠোর তদারকির আওতায় আনা; অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন বাড়ানো; প্রতি বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হালনাগাদ আয় ও সম্পত্তির বিবরণ বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোয় মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অফিস কর্তৃক নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোয় অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এবং যথাযথভাবে গণশুনানির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। এ-সংক্রান্ত আইনি ও পদ্ধতিগত সংস্কার এবং আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবা জনগুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও এ সেবার যুগোপযোগী মান উন্নয়নে আইনি, পদ্ধতিগত ও  প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। দলিল নিবন্ধন সেবায় আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে নিবন্ধনসংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নকলনবিশ ও দলিল লেখকদের একাংশের পারস্পরিক যোগসাজশ থাকায় অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা কাঠামোর কার্যকারিতায় ঘাটতি রয়েছে। ভূমি নিবন্ধন সেবার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির উপস্থিতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে এবং সেবাগ্রহীতা ও সরকার উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভূমিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকার কারণে যথাযথ ভূমি নিবন্ধন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সার্বিকভাবে আইনি, পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান। জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী, নকলনবিশ ও দলিল লেখকদের কার্যক্রম এবং আচরণ নিয়মিত কঠোর তদারকির আওতায় পরিদর্শন বৃদ্ধি, প্রতি বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হালনাগাদ আয় ও সম্পত্তির বিবরণ বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোয় মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অফিস কর্তৃক নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।