করোনাজনিত লকডাউনের শুরু থেকেই কিছু হাসপাতাল ও চিকিৎসক মুঠোফোনে অথবা অনলাইনের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দিতেন। রাজধানীতে কিছু বড় বেসরকারি হাসপাতালও এ সেবা চালু করেছে। এছাড়া চিকিৎসকদের বিভিন্ন কমিউনিটি ও অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা পোর্টাল এভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। করোনার বাধা যেহেতু দীর্ঘ হচ্ছে, সেহেতু সারা দেশের সংকটাপন্ন মানুষকে তো বটেই, প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্যও এ সেবা আরো প্রসারিত হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সম্ভাবনা সদ্ব্যবহারের লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো টেলিমেডিসিন গাইডলাইন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। গাইডলাইনের ‘ফি ফর টেলিমেডিসিন কনসালটেশন’ পয়েন্টে বলা হয়েছে, সশরীরে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসাসেবা নেয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে রোগীদের থেকে অর্থ গ্রহণ করা হয়, টেলিমেডিসিন সেবার ক্ষেত্রেও সেভাবে অর্থ আদায় করা হবে। নিবন্ধনকৃত একজন চিকিৎসক টেলিমেডিসিন সেবা প্রদানের জন্য উপযুক্ত অর্থ দাবি করতে পারবেন। তবে অর্থের পরিমাণ কেমন হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়নি এ গাইডলাইনে।

যেহেতু করোনা সামলাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে, সেহেতু হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে সরাসরি রোগী দেখার সুযোগ অনেক কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, শারীরিক সংস্পর্শে থেকে চিকিৎসাসেবা দেয়া ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য রোগীরাও করোনার উপসর্গ গোপন করে। এ তিন সমস্যার কিছুটা প্রতিকার টেলিমেডিসিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার আগে থেকে টেলিমেডিসিন সেবা বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ দেশে করোনার সময় এ সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে মানুষ যে শুধু স্বাস্থ্যসেবাই পাচ্ছে তা-ই নয়, সরাসরি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসককে দেখানোর প্রয়োজন থাকছে না বলে এ সময়টায় এ ধরনের ব্যবস্থা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখায় এবং হাসপাতালগুলোয় নন-কভিড রোগীদের চাপ কমিয়ে রাখায় সহায়ক হচ্ছে। আর কভিড-উত্তর সময়ে যদি এটি অব্যাহত রাখা যায়, সেক্ষেত্রে এর সুফল হবে সুদূরপ্রসারী। কারণ এতে রোগীদের আর্থিক সাশ্রয় হবে, বাঁচবে মূল্যবান শ্রমঘণ্টা, কমবে যানজট আর বাঁচবে পরিবেশও। সবচেয়ে বড় কথা, এটি দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে; কারণ তখন মানুষ জেলা-উপজেলায় বসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বড় শহরের ডাক্তারের সঙ্গে টেলিমেডিসিনেই যুক্ত হতে পারবেন। এমনকি উন্নত দেশের চিকিৎসাসেবাও এর মাধ্যমে সহজলভ্য হবে।

টেলিমেডিসিনের গাইডলাইন প্রণয়ন একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এর সফল বাস্তবায়নের ওপর তা নির্ভর করছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, চিকিৎসকদের ফি। এক্ষেত্রে স্পষ্ট নিদের্শনা থাকা আবশ্যক। সরাসরি রোগী দেখার চেয়ে টেলিমেডিসিনে ফি অবশ্যই কম হওয়া আবশ্যক। বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষত বাংলাদেশের মতো সমপর্যায়ের দেশের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যেতে পারে। ফি বেশি হলে রোগীদের আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সর্বোপরি টেলিমেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণও করে দেয়া আবশ্যক। গত এক দশকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের উচ্চ আদালতে টেলিমেডিসিন সেবাসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে দ্বীপ সঞ্জীব পুষ্কর বনাম মহারাষ্ট্র (২০১৮) মামলার রায়ে দুই চিকিৎসকের টেলিফোনে প্রদত্ত ভুল পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে টেলিমেডিসিন সেবার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন বোম্বে হাইকোর্ট। এর সূত্র ধরে টেলিমেডিসিন সেবা ও এর বৈধতা সম্পর্কিত অস্পষ্টতা দূর করার জন্য ভারতীয় মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি জোরদার আহ্বান জানানো হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে লকডাউন চলাকালীনই গত ২৫ মার্চ ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টেলিমেডিসিনসংক্রান্ত একটি বিস্তারিত গাইডলাইন প্রকাশ করে। ভারতের চিকিৎসাসেবা ও আইন অঙ্গনে এ পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

প্রথমেই প্রয়োজন টেলিমেডিসিন গ্রাহক বা রোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা। আমাদের দেশে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিদ্যমান আইনগত কাঠামোগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে তথ্য চুরি বা অপব্যবহারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন সেবাকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়ার জন্য এর সার্বিক প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর আওতাধীনে আনা জরুরি। টেলিমেডিসিন সেবায় প্রদত্ত চিকিৎসকের অনলাইন ব্যবস্থাপত্রকে হাসপাতাল-ক্লিনিক থেকে প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্রের সমান কার্যকারিতা প্রদান (বিশেষত প্রেসক্রাইবড ওষুধপত্র কেনার ক্ষেত্রে), টেলিমেডিসিন সেবায় কর্মরত চিকিৎসকদের লাইসেন্স ও অন্যান্য শিক্ষাগত-পেশাগত যোগ্যতার প্রকাশ ও প্রয়োজনসাপেক্ষে তার ভেরিফিকেশনসহ আধুনিক ও কল্যাণমুখী স্বাস্থ্যসেবায় একজন চিকিৎসক হাসপাতালে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যেসব অধিকার-কর্তব্য-নিরাপত্তার আইনি বৃত্তে আবদ্ধ ছিলেন, সেই একই বৃত্ত অনলাইন বা ভার্চুয়াল জগতেও যথাসম্ভব টানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টেলিমেডিসিনের প্রায়োগিক দিকগুলো সূচারুভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে লাগসই প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। এ সেবাকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (যেমন চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রশাসক ও  রোগী) আচরণবিধি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি। সমাধান হিসেবে আসতে পারে মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিমেডিসিন নীতিমালা বা প্রবিধান কিংবা প্র্যাকটিস গাইডলাইন, যাতে উল্লিখিত বিষয়গুলোসহ টেলিমেডিসিন সেবাসংক্রান্ত নানা দিকের সংজ্ঞা ও মানদণ্ডসহ একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামো দেয়া থাকবে। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদে বিবেচনাধীন খসড়া স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনটি সংসদে পাস হলে সেখানেও টেলিমেডিসিনসংক্রান্ত বিধানাবলি প্রবিধান বা নোটিফিকেশন হিসেবে অধিভুক্ত করা যেতে পারে।

দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় অবকাঠামোগত বা যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ফার্মা কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অসুস্থ বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার প্রভাব কমিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন সেবা কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা জরুরি। এ খাতে জরুরি ভিত্তিতে আইনি কাঠামো প্রণয়ন করার মাধ্যমে একদিকে যেমন রোগী-চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার ও কর্তব্য সুনিশ্চিত হবে, তেমনিভাবে তরুণ কিংবা প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তারাও এতে এগিয়ে আসার জন্য প্রণোদিত হবেন। ফলে বলীয়ান হবে করোনা-পরবর্তী বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ।