বাংলাদেশ বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন, ভোগ বৃদ্ধিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ও জনগণের বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনে সফল হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ সরকারি বিনিয়োগের কারণে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বণ্টন, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সীমান্ত জ্বালানি বাণিজ্যে জড়ানো, সঞ্চালন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে লোকসান কমানো এবং বাজারে চাহিদা ব্যবস্থাপনাও এই লক্ষ্য পূরণে কাজ করেছে। এখন বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর কার্যক্ষমতার ক্ষতি রোধ করতে দক্ষ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিত উত্থান-পতন ছাড়াই স্থিতিশীল ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়ন করতে হবে। টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতকরণের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিশক্তির বিস্তার ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ক্লিন এনার্জি রিসার্চ ও প্রযুক্তি সুবিধা নিশ্চিতকরণের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা-অংশীদারিত্ব আরো বাড়ানো জরুরি। কিন্তু তথ্য-পরিসংখ্যান বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী গত এক দশকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ আসার কথা ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে। যদিও এখন পর্যন্ত এ পরিকল্পনার এক-তৃতীয়াংশও অর্জিত হয়নি। এখনো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পাওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ ৪ শতাংশেরও নিচে।
চীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, ভারতে দিন দিন তাদের সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা এসব বিষয় উপেক্ষা করে ব্যয়বহুল জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ছি। এজন্য ব্যয়বহুল জ্বালানি প্রকল্পও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এলএনজি যোগ হচ্ছে, গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু উত্তরোত্তর জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কোনো জ্বালানি নিরাপত্তা নীতির জন্য যৌক্তিক হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে উৎসাহ বাড়ছে। জ্বালানি ব্যবহারের শীর্ষ দেশগুলোও এ খাতে মনোযোগী হচ্ছে। ভারতও আগামী বছরে তার দেশের জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য উেসর অবদান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন থেকে শুরু করে বিশ্বের বহু দেশ যখন সবুজ জ্বালানি খাতের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন ভারতও ঘোষণা দিয়েছে যে ২০২১ সালে এই জ্বালানি খাতে সর্বাধিক অবদান রাখা দেশ হতে চায় তারা।
যেকোনো খাতের সুষ্ঠু বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন। সরকার ঘোষিত সুষ্ঠু নীতিমালা একদিকে যেমন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়, অন্যদিকে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক গবেষণা ও মানোন্নয়নের নিশ্চয়তা প্রদান করে, আর সেই সঙ্গে সবাইকে কোনো বিশেষ খাত সম্প্রসারণে উৎসাহ দেয়। অন্যান্য দেশ যেখানে বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ধীরে ধীরে একে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তুলছে, ঠিক সে সময়ই বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রতি ইউনিটে প্রায় ৬০ টাকা খরচ করে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে গ্রামগুলো আলোকিত করছে নিতান্তই অসচ্ছল, গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ। এতেই বোঝা যায় বিদ্যুতের চাহিদা আর নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের তাত্পর্য কতটা তীব্র। অথচ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে মাত্র তিন ভাগ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে মেটানোর নিয়মটিকে শহুরে মানুষ অগ্রাহ্য করেছে তীব্রভাবে, নিয়েছে সোলার প্যানেল ভাড়া, কর্তাব্যক্তিদের ঘুষ দেয়াসহ নানা ছল-চাতুরির আশ্রয়। টাকা না থাকার অজুহাতে শিল্প-কারখানার মালিকরা সোলার হিটিং সিস্টেম ব্যবহার করেন না, বায়োগ্যাস ব্যবহার অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও নামমাত্র দামে গ্যাস সরবরাহের সুবিধা থাকায় নামিদামি হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর একটিও বায়োগ্যাস উৎপাদনে এগিয়ে আসেনি। অন্যদিকে শ্রীলংকায় বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলার সুযোগ না থাকায় এবং সরকারি সহযোগিতায় বিভিন্ন সংস্থা আর্থিক ও কারিগরি সুবিধা প্রদান করায় বাণিজ্যিক রেস্টুরেন্টগুলোয় বায়োগ্যাস ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে, আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের চাহিদা কমছে, অন্যদিকে উচ্চমানের জৈব সারের জোগানও বাড়ছে।
আলবেনিয়া, কঙ্গো, আইসল্যান্ড, প্যারাগুয়ের মতো দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিতে বেশ সফল হয়েছে। আমাদেরও সফল না হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্বব্যাংকের জ্বালানিবিষয়ক কর্মসূচি ও ‘সোলারজিস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় গড়ে সাড়ে চার ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়া ৭২ শতাংশ এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৯ ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস ও বায়োগ্যাস উৎপাদনে কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা, তাতে শিগগিরই এসব প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় এটি একটি আশু করণীয় পদক্ষেপ হিসেবে সব দেশই গ্রহণ করেছে। বিশ্বে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ১৯ শতাংশ এখন আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। তাই সব দেশই সম্পদ ও সামর্থ্য অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আমাদেরও পিছিয়ে থাকলে চলবে না। আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখনো কম। বলা বাহুল্য, এর বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য অন্যান্য জ্বালানি খাতের প্রসারে মনোযোগ বাড়াতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের জনগণ বা সরকারের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অত্যধিক প্রাথমিক স্থাপন ব্যয়। বাংলাদেশকেও সেই বাধা দূর করে এগোতে হচ্ছে। প্রয়োজন এ অগ্রযাত্রার ধারা অব্যাহত রাখা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে, সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে সংশ্লিষ্টদের।










