চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ২০ শতাংশেরও কম। করোনার এ সময়ে সরকারি ব্যয়ের এমন চিত্র হতাশাজনক। কভিড-১৯-এর কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তাই রাজস্ব আহরণও তুলনামূলক কম। বিপরীতে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ব্যয় বেড়ে গেছে। তাই সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে এডিপির আওতায় বাস্তবায়নাধীন কম গুরুত্বপূর্ণ ও মধ্যম অগ্রাধিকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ খরচ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে ‘মধ্যম অগ্রাধিকার’ প্রকল্পের যেসব খাতে অর্থ ব্যয় না করলেই নয়, সেক্ষেত্রে খরচের বিষয়টি ‘কঠোর’ বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্পের অর্থ ব্যয় অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে। ফলে সরকারের খরচ বেশ কমেছে। গত কয়েক বছরে অর্থনীতি গতিশীল রাখতে সরকারি বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যার ফল প্রবৃদ্ধিতে দেখা গেছে। এ সময় বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল স্থবির। করোনার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন আরো শ্লথ হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বা বাজেট বাস্তবায়ন শ্লথ হলে অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা করোনায় আক্রান্ত অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেয়ার শঙ্কা রয়েছে।
করোনার কারণে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, আয়ে ধস; রফতানিতে মন্দা ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন ও জীবিকা দুই-ই হুমকির মুখে। এ সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী করে এ মহামারী দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনর্জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করা যায়। অর্থনীতি চাঙা রাখার অন্যতম শর্ত হলো ভোগ ধরে রাখা। বিশ্বের প্রায় সব দেশই জনগণের হাতে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কেউ কেউ সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান করছে, কেউ আবার কখনো সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতা বৃদ্ধি করেছে। এর কারণে দেশগুলোর বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিরাজ করছে এর বিপরীত চিত্র, বাজেট ঘাটতি কমছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশই মানুষের হাতে অর্থের সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে চলছে, এমনকি অর্থ ছাপানোর পথও বেছে নিয়েছে কেউ কেউ; সেখানে বাংলাদেশ কৃচ্ছ তার নীতি গ্রহণ করেছে, যা অর্থনীতির স্থবিরতাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে শঙ্কা রয়েছে।
২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বেশি করে ব্যক্তিগত সঞ্চয় শুরু করে। এ প্রবণতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোকে অনেক কমিয়ে দেয়, যাতে অর্থনৈতিক সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশের সরকারগুলো জনগণকে বেশি সঞ্চয় না করে প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করতে কিছু পদক্ষেপ নেয়। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার লাখ লাখ কোটি ডলার বাজারে ছাড়ে। পেনশন সঞ্চয়ের একটা অংশ অবমুক্ত করা হয়, যাতে সবাই বেশি খরচ করে। এ উদ্যোগের ফলে ২০১০ সাল থেকে মন্দা ক্রমে কাটতে থাকে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে করোনা মহামারীর মধ্যে অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বিভিন্ন উপায়ে জনগণের হাতে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য ভোগব্যয় স্বাভাবিক রাখা। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হয়ে অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়বে। সাফল্য এসেছে অনেক দেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের সরকারও দরিদ্র মানুষের হাতে নগদ অর্থ প্রদানের কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।
কভিড-১৯ মহামারী সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রতিটি দেশই সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫-৬ শতাংশের নিচে রাখার আন্তর্জাতিক চর্চাটিও অনেকাংশে শিথিল করা হয়েছে। আইএমএফ এরচেয়ে বেশি ঘাটতি হলেও আপাতত সমস্যা দেখছে না। মূলত সরকারি ব্যয় বাড়াতে এ ধরনের নীতি শিথিলতা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চাহিদা সৃষ্টির জন্য প্রতিটি দেশেই নগদ সহায়তা ও প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশেও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে সমরূপ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের বাজেটেও এর প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
করোনায় দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং প্রবাসী আয় বাড়লেও ভোগ বা খরচ করার প্রবণতা কমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও উৎপাদন খাতের বেতনভুক্ত কর্মীদের জীবন-জীবিকার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আয় কমে যাওয়ায় সার্বিকভাবে ভোগ করার প্রবণতা কমে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ভোগনির্ভর। আর এ ভোগের বড় অংশের জোগান আসে ব্যক্তি থেকে। সামষ্টিক অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি ব্যয় অনেক বেশি কার্যকর। সরকারি ভোগ ব্যয় একটি নিশ্চিত খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়; যা অর্থনীতির গতি সঞ্চারে কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
এ মুহূর্তে প্রধান করণীয় হলো অর্থনীতি উদ্দীপ্ত রাখা। দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় ঠিক রাখতে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। এমনকি উৎপাদকরাও বলছেন, করোনার অভিঘাতে স্থবির অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজের সবার হাতেই টাকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেমনটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও করা হচ্ছে। কারণ, শুধু উৎপাদকদের হাতে টাকা গেলে হবে না, উৎপাদিত পণ্য কিনবেন যিনি তার হাতেও টাকা থাকতে হবে। নইলে পণ্য কিনবেন কীভাবে? উৎপাদক-ভোক্তা কাউকে এখানে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তদুপরি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগব্যয়ের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল। ভোগব্যয় বাড়াতে হলে ক্রেতা শ্রেণীর হাতে অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাকরি যারা হারিয়েছেন, তাদের পাশাপাশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বিশাল এক কর্মীবাহিনী। এরই মধ্যে অনেকেই আয়ের সংস্থান না থাকায় শহর থেকে গ্রামমুখী হয়েছেন। এক্ষেত্রে আর্থসামাজিক অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদার জোগান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যারা স্বকর্মসংস্থানে ছিলেন, তথা অসংগঠিত খাতের অবস্থাও ত্রাহি। তারা ব্যাংকিং সুবিধারও বাইরে। বড় কিছু খাত ছাড়া অনেক খাতই রয়ে গেছে প্রণোদনার বাইরে। সর্বোপরি ক্রেতাদের সংখ্যাই বেশি। ক্রেতার হাতে টাকা না গেলে পণ্য কিনবেন না। ক্রেতা পণ্য না কিনলে কারখানার মালিকের লোকসান হবে—এটাই স্বাভাবিক। তাহলে কারখানার মালিককে দেয়া ব্যাংকের ঋণও খেলাপি হবে। আর ক্রেতাদের যদি ক্রয় সামর্থ্য বাড়ানো যায়, তাহলে উৎপাদকও লাভবান হবেন। অর্থনীতিও গতিশীল হবে। করোনার দুর্যোগে দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ও অর্থনীতি চাঙ্গা রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতার পরিচয় যেমন দিতে হবে, তেমনি কাজটি বেগবানও করতে হবে। অর্থনীতির দ্রুত পুনরুজ্জীবনের জন্যও এটি দরকার।










