সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত যৌথ এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তিন মাস আগেই রাজধানীর ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মার্চ থেকে যে তথ্য দিয়ে আসছে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ছিল। তাদের ধারণা, সরকার যে সংক্রমণের তথ্য প্রচার করছে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি হিসাবে ঢাকা শহরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই লাখের কম। আর গবেষণা বলছে, এ সংখ্যা প্রায় এক কোটি। গবেষণার তথ্য এমন সময় প্রকাশ করা হলো, যখন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে আলোচনা চলছে। আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলছে সরকার। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পিকে উঠে তিন মাস পর আবার কমে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে সংক্রমণ একটি বিশেষ উচ্চতায় ওঠার পর তা একই জায়গায় প্রলম্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশে মহামারী প্রতিরোধের বিষয় বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। তাই এটি প্রলম্বিত হচ্ছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সফল দেশগুলো সংক্রমণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুত লকডাউন, পরীক্ষা, কন্টাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন, চিকিৎসা ইত্যাদি করেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেছনের সারিতে বলতে হয়। এখনো ১০৯টি পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে সব সীমিত। প্রতিটি জেলায় করোনার পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেনি সরকার। এর মধ্যে আবার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসা নিশ্চিতও করা যায়নি। এখন প্রধান দায়িত্ব হলো আমরা কোন পর্যায়ে আছি সেটা নির্ণয় করা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় র?্যান্ডম স্যাম্পলিং করে দেখতে হবে কী পরিমাণ মানুষ এরই মধ্যেই ইনফেক্টেড হয়েছে ও এক্সপোজড হয়েছে তার একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা। করোনাভাইরাসকে কীভাবে প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করা হবে তার একটা রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের এপিসেন্টার বা কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকা। দেশে যত কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে তার প্রায় অর্ধেকই ঢাকায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন, সংক্রমণের যে সংখ্যা বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে তা সঠিক চিত্র নয়, কারণ যথেষ্ট পরীক্ষা হয়নি। গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য সেটির পক্ষেই কথা বলছে। আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কমসংখ্যক পরীক্ষা করেছি। টেস্ট করতে আসা মানুষজন নানাভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছে। একদিন নাম লেখানো, একদিন এসে নমুনা দেয়া, রেজাল্ট পেতে দেরি, তারপর আবার ফি ধার্য করা—সব মিলিয়ে মানুষ করোনা পরীক্ষায় বিমুখ হয়েছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশ থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না গেলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই। শপিংমল, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত সর্বত্র একই অবস্থা। যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে দায়িত্বশীল নন। মুখে মাস্ক নেই। জীবাণুনাশক ছিটানোরও কোনো ব্যবস্থা নেই। বলা হচ্ছে, শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে। কাজেই স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। রাজধানীর জীবনযাত্রা মহামারী শুরুর প্রায় আগের অবস্থায় চলে এসেছে। রাস্তায় মানুষের ঢল আর যানজট অনেকটা আগের মতো। খুব কম মানুষ মাস্ক পরে রাস্তায় বের হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার বিষয়টি গুরুত্ব হারিয়েছে। কাঁচাবাজার শুধু নয়, অফিস ও ব্যাংকপাড়ায়ও পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা যাচ্ছে না। মানুষ অনেকটা বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে চলাফেরা ও যাতায়াত করছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগ মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। মানুষের সামনে কোনো বিধিনিষেধ কার্যত নেই। তাই বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে সংক্রমণ থেমে নেই। অধিকাংশ করোনা আক্রান্তের কোনো উপসর্গ নেই। এতে তারা করোনা ছড়াচ্ছে বেশি।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ উন্মুক্ত হচ্ছে এবং হতে থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়েও জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এসবের কারণে আমাদের দেশেও পুনরায় সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি সংক্রমণ হলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখা দরকার। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে এখনই করণীয় বিষয়ে রোডম্যাপ প্রস্তুত করে সেই মোতাবেক পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কয়েক সপ্তাহ ধরেই দেশে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী, যদিও এ হার স্বস্তিকর মাত্রায় এখনো পৌঁছেনি। সম্প্রতি কিছু কিছু হাসপাতালের শয্যা খালি থাকছে আবার অন্যান্য রোগের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। কোনো কোনো হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা একেবারেই কম। অন্যদিকে সেসব হাসপাতালে অনেক সংখ্যায় চিকিৎসকসহ অনেক স্বাস্থ্যকর্মী যুক্ত, হাসপাতাল পরিচালনায় অনেক অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এখনো আইসোলেশন কেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সংকোচন করা হলেও পুরোপুরি বন্ধ না করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যাতে পুনরায় ব্যবহার করা যায় সেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। করোনা চিকিৎসায় এক্স-রে ও রক্তের কিছু পরীক্ষার ভূমিকা রয়েছে। শহরের হাসপাতালগুলোতে এ ব্যবস্থা থাকলেও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে তা বাড়ানো প্রয়োজন। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ দ্রুত নির্ণয়ের লক্ষ্যে বর্ধিত হারে টেস্ট করা প্রয়োজন। কভিড-১৯-এর নমুনা পরীক্ষার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে সংক্রমিত ব্যক্তিকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইসোলেট করতে হবে।

কালক্ষেপণ না করে দ্রুত র্যাপিড অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্টিং শুরু করা এবং করোনা টেস্টের সব অন্তরায় দূর করা প্রয়োজন। অ্যান্টিজেন টেস্টিং যেমন টেস্টের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমাবে, পাশাপাশি অধিকসংখ্যক মানুষকে টেস্টিংয়ের আওতায় নিয়ে আসবে। ফলে সংক্রমিত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পৃথকীকরণ সহজতর হবে। বিভিন্ন জেলায় করোনা সংক্রমণের মাত্রা ভিন্ন হওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে করোনা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে। কিন্তু বিভিন্ন অফিস-আদালত, গণপরিবহন ও তৃণমূল পর্যায়ে এ স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানা হচ্ছে, তা নির্ধারণে কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি ও গাইডলাইনের যথার্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।