অন্য দেশের সঙ্গে এফটিএ চুক্তি করে লাভবান হয়েছে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ড। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের পর দেশটিতে ভিয়েতনামের রফতানি অনেকাংশে বেড়ে যায়। চীন ও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে লাভবান হয়েছে শ্রীলংকাও। বিনা শুল্কে অন্য দেশের বাজারে পণ্য রফতানি করা সম্ভব হয় বলে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এফটিএ চুক্তি বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরির পাশাপাশি কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গতি যোগ করবে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া ২০২৪ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের আনুষ্ঠানিক তালিকায় উঠতে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক দেশে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছ থেকে আমদানি-রফতানিতে যেসব শুল্ক সুবিধা পাওয়া যেত, তা আর বহাল থাকছে না। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যেন মধ্যম আয়ের ফাঁদে না পড়ে, তার জন্য এখন থেকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ ও পিটিএর মতো চুক্তি করে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হবে।
এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দেশী পণ্য রফতানিতে গতি বাড়াবে বলে সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে পণ্য বাছাইয়ের বিষয়গুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চুক্তির শর্তগুলোও যাচাই করতে হবে। স্বাভাবিক যে নিজ সুবিধার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন শর্ত দেবে। দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তুলার প্রবেশাধিকার সুবিধা, ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর, সরকারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও শ্রম সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই বাংলাদেশকেও ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য মেডিকেল সামগ্রী উৎপাদন, কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার সংরক্ষণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা, ব্যবসায়ের সুবিধাদি এবং স্বচ্ছতার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আলোচনায় রাখতে হবে শ্রম অধিকার, বিনিয়োগ, সেবা, ই-কমার্স ইত্যাদি ইস্যুগুলোকে। রফতানি বাজারে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না, এর সঙ্গে দেশের আইটি, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জনিয়ারিং, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সামগ্রী রফতানির সম্ভাবনার বিষয়গুলোয় নজর দিতে হবে। সুবিধা আদায় করতে যোগ্য লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের অগ্রাধিকারের দিকে মনোযোগী হতে হবে। শর্তগুলো যাচাই করে আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে লাভের বিষয়টি। বিশেষত চুক্তি সই করার আগে এসব বিষয় আলোচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের
মোট রফতানি পণ্যের ১৭ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে, যার বড় অংশ পোশাক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিতে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সে দেশে ৬১৩ কোটি ডলার মূল্যের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা মোট রফতানির ১৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রযোজ্য হারে শুল্ক দিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এখন গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানি করতে হয়। এফটিএ কার্যকর হলে তখন শূন্য শুল্কে পণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। যদিও আফ্রিকা মহাদেশের সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। একসময় বাংলাদেশও জিএসপির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। তবে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তা স্থগিত করে দেয়। পরবর্তী সময়ে তাদের সব শর্ত পূরণ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তা পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। তাছাড়া জিএসপি সুবিধা প্রদান প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। এ অবস্থায় জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার বদলে এফটিএ স্বাক্ষরের বিষয়টি বেশি কার্যকরী। তাছাড়া বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর সম্ভব হলে দেশটিতে তৈরি পোশাকসহ অন্য সব পণ্যের রফতানি বাড়বে।
বর্তমানে
বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই। আগামীতে ৬০ বিলিয়ন ডলার রফতানির যে স্বপ্ন, তা পূরণ হবে নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও এফটিএ করার মধ্য দিয়েই। তাছাড়া কভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্ববাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগানোর সময় এসেছে। পরিবর্তিত এবং প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগীদের সঙ্গে সক্ষমতায় এগিয়ে থাকতে হলে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সক্ষমতা ও যোগ্যতা দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে জায়গা করে নেয়ার বিকল্প নেই। মাত্র কয়েক বছর আগ পর্যন্ত ভিয়েতনামের রফতানি আয় আমাদের পেছনে ছিল, এখন তারা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। এখন বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে ট্রেড পার্টনার বানাচ্ছে। তাই নিজেদের সুবিধার বিষয়গুলোকে প্রাধিকার দিয়ে শর্ত যাচাই করে বাংলাদেশের জন্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং বড় অর্থনীতিগুলোর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে কৌশলী হতে হবে। নতুন এ সম্ভাবনা কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গতি যোগ করবে। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক উদ্যোগটির সফল বাস্তবায়ন ঘটবে বলে প্রত্যাশা।










