বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধু নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। তাই কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক ও কর্মীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি মনোযোগ দেয়া জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও। কেননা শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। উন্নত বিশ্বে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী বিষণ্নতার কারণে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এ কারণে বছরে গড়ে ৩৬ কর্মদিবস নষ্ট হয়। তথ্য বলছে, আমাদের দেশে ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের কোনো না কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা রয়েছে। ৯২ শতাংশ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে, যার কোনো চিকিৎসা সাধারণত তারা নেয় না। এমন অবস্থায় প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে শ্রমিক-কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি। সম্প্রতি বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষেও বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল বছরে দুবার তার কর্মীদের ওপর স্বাস্থ্য জরিপ পরিচালনা করে, যেখানে গুরুত্ব দেয়া হয় কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে। গুগলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবিধাটি হচ্ছে জীবন বীমা পলিসি। এর আওতায় যুক্তরাজ্যের কর্মীরা তাদের বেতনের প্রায় চার গুণ অর্থ পেয়ে থাকেন। কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে কীভাবে স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং উৎপাদনশীলতায় আরো বেশি গতিসঞ্চার করতে পারেন, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম ডিজিটাল স্লিপিং প্রোগ্রাম কিংবা সেকেন্ড মেডিকেল অপশন।
কর্মক্ষেত্রে কর্মী কিংবা শ্রমিকরা সহায়তা ও সহযোগিতা না পেলে তাদের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার জের ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনার ঐতিহ্য বিদ্যমান। বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার যেমন তার কর্মীদের জন্য ওয়েলবিং স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেছে। চার স্তম্ভের কাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সংবেদনশীল অবস্থাকে সমর্থন করা। এছাড়া তাদের রয়েছে ক্লিকওয়েলঅ্যাপ। শুধু কর্মী নয়, তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার বিষয়গুলোয়ও তারা যে যত্নবান, এটি নিশ্চিত করতেই কর্মীর পরিবারের সদস্যদেরও অ্যাপটি ব্যবহারে অনুমতি দেয়া হয়।
উদাহরণ আরো রয়েছে। বিশ্বখ্যাত কফিশপ স্টারবাকসের কর্মীদের মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত করার জন্য ‘কর্মী’ নয়, ‘অংশীদার’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রচলন। করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর এপ্রিলে তারা ঘোষণা দেয়, সপ্তাহে যে কর্মীরা ২০ ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করবেন, তাদের কর্মী সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। তাছাড়া কর্মীর পরিবারের সদস্যরা বিনা মূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে বছরে ১২টি সেশন নিতে পারবেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত স্টারবাকসের প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার কর্মী এবং তাদের পরিবার এর সুফল পাবে।
শ্রমশক্তিতে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকরা সহায়তা-সহযোগিতা না পেলে তাদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। উৎপাদনশীলতা ধারাবাহিক রাখতে এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোয় জোর দেয়ার বিকল্প নেই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও যা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কভিড পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংকোচনের কারণে কাজ হারানো কিংবা কাজের নিশ্চয়তা কমাতে শ্রমিক-কর্মীদের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদেরও মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভোগার ঝুঁকি বেড়েছে।
আশার কথা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিমালা রয়েছে দেশে। এটিকে অনুসরণের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় নিশ্চিত করা সম্ভব। তাছাড়া মালিক বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব দায়বোধের জায়গা থেকে শ্রমিক-কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা সমাধানে কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কাউন্সেলিং করানো যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সব শ্রেণীর কর্মীর জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমাদের দেশের শ্রমিকরা যে পরিবেশে কাজ করেন এবং বসবাস করেন, এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। কর্মক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের দুর্ব্যবহার যেমন কর্মীর কাজের গতিকে প্রভাবিত করে, তেমনি নারীদের ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন কিংবা বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়গুলো দমন না করা হলে তা উৎপাদনশীলতার ওপর নিরবচ্ছিন্ন প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান করা সম্ভব হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য শুধু শ্রমিক, কর্মী কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি জাতীয় বিষয়। তাই সামগ্রিকভাবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি শারীরিক স্বাস্থ্যের তুলনায় কম গুরুত্ব দিলে চলবে না। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের কর্মীর সংখ্যা অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগ করা যেতে পারে। তাছাড়া এ-বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতাসম্পন্ন জনবল বাড়াতে হবে। সর্বোপরি মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা জরুরি।










