প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও শীর্ষ ব্যাংকারদের ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সম্পদের তথ্য আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজ নিজ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দাখিল করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালক ও শীর্ষ ব্যাংকারদের সম্পদের তালিকা জমা দেয়ার নির্দেশনাটি অনেক পুরনো। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮ ধারার ২ উপধারায় এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। কিছু ব্যাংক এ নির্দেশনা অনুসরণ করলেও তা থেকে বিরত থেকেছে বেশির ভাগ ব্যাংকই। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো আইন অনুযায়ী পরিচালক ও শীর্ষ ব্যাংকারদের সম্পদের হিসাব রাখছে কিনা, সে বিষয়টি এতদিন খতিয়ে দেখেনি। ব্যাংক খাতে সম্প্রতি সংঘটিত কিছু আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও পরিচালকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী ব্যাংকের পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে তাদের মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নিতে পারেন না। তবে নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার কোটা শেষ হয়ে গেলে তখন ভিন্ন পথের আশ্রয় নেন ব্যাংক পরিচালকরা। কখনো বেনামে আবার কখনো অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন তারা। অন্যদিকে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার জন্য কোনো সীমা না থাকায় সেটাকে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঋণ নেন। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের হাতে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। সম্প্রতি একটি ব্যাংকের একাধিক পরিচালকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ উপার্জনের বিষয়ে তদন্তে নামে দুদক। গত ১০ বছরে ব্যাংক খাতে এমন নানা জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনার বহু ঘটনা সামনে এসেছে। কয়েকটি ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা জবাবদিহিতার আওতায় এলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্ষদ দায়মুক্তি পেয়েছে। তবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ শাস্তি পেয়েছেন। অপসারণসহ দুদকের মামলায় অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা আছে। সেখানে তাদের দায়দায়িত্ব স্পষ্ট করা আছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৩ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। সেটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারিও করা হয়। তবে বেশির ভাগ পরিচালক সেটি আমলে নেননি। এবার যেন তেমনটি না ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমাদানের উদ্যোগটি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বৈকি। তবে এর সুফল পুরোপুরি নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপর। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এটি জমা হচ্ছে কিনা, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে দ্রুত তা বন্ধ করাও প্রয়োজন। সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সম্পদের হিসাব দেয়ার এ প্রক্রিয়া ভারতসহ কয়েকটি দেশে জারি রয়েছে। এতে উচ্চপদস্থ ও ব্যাংকের পরিচালকদের অনিয়ম হ্রাস পেয়েছে বলে খবর রয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু হিসাব বিবরণী জমা নিলেই হবে না। তা যাচাই-বাছাইও করতে হবে। এনবিআর বা অন্যান্য ক্ষেত্রে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বিবরণীতে কোনো গরমিল রয়েছে কিনা, তা-ও পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যাংক পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার নির্দেশনা ব্যাংক কোম্পানি আইনে থাকলেও ব্যাংকগুলো কেন সেটি মানেনি, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এবার বিষয়টি সঠিকভাবে পরিপালনে নজরদারি বাড়াতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপকরা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব জমাদান নিয়ে আগের অভিজ্ঞতাগুলো খুব একটা সুখকর নয়। বছর না ঘুরতেই বিষয়টি বিস্মৃত হয়। এবার যেন সেটি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা চাই।
ব্যাংক পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সম্পদের হিসাব জমাদান প্রক্রিয়াকে সহজ করা আবশ্যক। যথাযথ পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। এ নির্দেশনা কার্যকরে সবার মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও বড় একটি কাজ। কেউ যেন রাজনৈতিক বা অন্য কারণে হয়রানির শিকার না হন, তা বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে। সব ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সম্পদের হিসাব জমাদান নিশ্চিত করতে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে কর্তৃপক্ষ। আশা করা যায়, এতে অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা কমে আসবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখতে পারে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকারের সামনে। শক্ত হাতে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। দ্রুতই আর্থিক খাতের বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি না ঘটলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় আইন, গাইডলাইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।










