যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন। নানা নাটকীয়তা শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ম্যাজিক ফিগার ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট ছাড়িয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন। এইবারের নির্বাচনে বাইডেনের জয় নানাভাবে ইতিহাসের অংশ হয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রবীণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে রেকর্ড করেছেন জো বাইডেন। সেই সাথে তার রানিং মেট কমলা হ্যারিসও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। অন্যদিকে ১৯৯২ সালের জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ক্ষমতায় থাকতে (দ্বিতীয় মেয়াদে) পরাজিত হয়েছেন। 

হোয়াইট হাউসে ডেমোক্রেটদের ফিরে আসা নিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। কিন্তু জো বাইডেন ৭৭ বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়ে ব্যক্তিগতভাবে যে বার্তাটা দিয়েছেন তা হল, ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে’। ১৯৮৮ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে কাজ শুরু করেছিলেন বাইডেন। একাডেমিক লেখা চুরির দায়ে তার দল ডেমোক্রেটিক পার্টি মনোনয়ন দেয়নি তাকে। এরপর নানা জটিলতায় পার করতে হয় আরও ২০ বছর। ২০০৮ সালে দল থেকে মনোনয়ন দৌঁড়ে ফের হেরে যান বারাক ওবামার কাছে। ২০১৬ সালেও দলীয় মনোনয়ন জোটে হিলারির কপালে। অবশেষে ডেমোক্রেট শিবির থেকে বাইডেন কাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন পান ২০২০ সালে। না পেতে পেতে পেয়ে যাওয়া মনোনয়ন পাওয়ার পর আদতে বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হওয়া হবে কিনা তা নিয়েও ছিল সংশয়। কিন্তু অবশেষে একাধিক ‘না’-কে ডিঙিয়ে ‘হ্যাঁ’ করে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন হার না মানা রাজনীতিবিদ জো বাইডেন।

করোনা পরবর্তী ভূ-রাজনীতি, চীনের উত্থান, ট্রান্স আটলান্টিক জোটের ভাঙন সবকিছু নিয়ে এবারের মার্কিন নির্বাচন নিয়ে বিশ্ব নেতাদের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। রিপাবলিক দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন ‘অক্টোবর বিস্ময়’ দিয়ে জিতে যাবেন নির্বাচনে। আফগান যুদ্ধের ইতি ও তিন আরব দেশের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেওয়ায় তাকে নোবেল দেওয়ার গুঞ্জনও ছিল। নির্বাচনের আগে করোনার ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়ার ঘোষণার পরিকল্পনাও নেন। কিন্তু কোন বিস্ময় দেখাতে না পেরে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত হয়ে নিজেই হয়ে পড়েন ‘বিস্ময়’।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গবেষণায় মার্কিনীদের শত বছরের সাম্রাজ্য। ফলে প্রেসিডেন্টের পরিবর্তনে সহসাই মার্কিনীদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পের বিদায় বিশ্ব রাজনীতিতেও ছোট খাট ধাক্কা লাগতে পারে। জো বাইডেনকে ট্রাম্প চীনপন্থী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে আরও বেশ কঠোর হতে পারেন। বাইডেনের নির্বাচনী ইশতেহারে উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিবাদ ও হংকংয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া ভারতীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও কাশ্মীর ইস্যু ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাইডেন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তার ওয়েবসাইটে। বাইডেন তার পার্টনার হিসাবে বেছে নিয়েছেন একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারীকে। ফলে মার্কিনীদের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে যে পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে গেলেন তা আরও বেগবান হতে পারে। 

বাইডেন তার ইশতেহারে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলেছেন। যদিও ইসরাইলের সাথে বাইডেনের সম্পর্ক ও সমর্থন বরাবরই উষ্ণ। ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক বাইডেন ইসরাইলের সাথে তিন আরব দেশের সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেওয়ায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন।

তুরস্কের এরদোয়ানের সাথে ওবামা ও ট্রাম্পের সম্পর্ক এগিয়েছে বাইডেনের সাথে সেভাবে নাও এগোতে পারে। বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তুরস্ক সফরে গিয়ে তিনি বেশ কিছু বিরোধী নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে বেতৃষ্ণা প্রকাশ করেন বাইডেন সেখানে ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী দেশের সাথে তুরস্কের নানা টানাপোড়ন চলছে। এছাড়া লুজান চুক্তির শেষ সময়ে তুরস্কের তর্জন গর্জন নিয়ে তারা আতঙ্কিত। ফলে তুরস্কের মানবধিকার পরিস্থিতির সমালোচক বাইডেন তুরস্ককে থামাতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এমনকি যুদ্ধও চাপিয়ে দিতে পারেন। ভূমধ্যসাগর, লিবিয়া ও সিরিয়ায় তুরস্ককে থামাতে চাইবে বাইডেন প্রশাসন। মার্কিন-ইসরাইলি লবি তুরস্ক ও সিরিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল নিয়ে একটি কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে চায়। ইরান-ইরাক ও তুরস্কের চোখে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মানে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হওয়া। তবে আসাদ বাহিনী ও আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসক্রিপশনে লড়াই করা কুর্দিদের একা ছেড়ে চলে গেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দি ঘুঁটি ও সিরিয়া ইস্যুকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন। কথিত আরব বসন্ত আমদানি করে গণতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী সংঘাতের যে বীজ বপন করেছে মার্কিনীরা তার পরিকল্পনাকারী ছিল ওবামা-বাইডেন-হিলারী প্যানেল। তবে ইরান ইস্যুতে বাইডেন ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। উদ্দেশ্য পারমাণবিক বোমার অর্জন থেকে যেকোনভাবে ইরানকে নিবৃত করা।

সাংবাদিক জামাল খাসোগী হত্যাকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্রেটিক শিবিরে সৌদি যুবরাজ এমবিএসের কঠোর সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন বাইডেন। এমনকি বাইডেন জেতার পর সৌদি আরব থেকে অভিনন্দন বার্তা আসতেও দেরি হয়। ফলে নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে যুবরাজের সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হয় তার দিকে সবার নজর রয়েছে। তবে ইতিহাস বলে, মার্কিনীদের সমালোচনা বা নিষেধাজ্ঞা নিজ স্বার্থে ইউটার্ন করে। গুজরাট ইস্যুতে একসময় নরেন্দ্র মোদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিলেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নরেন্দ্র মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিশাল সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পররাষ্ট্রে নজর দেওয়ার আগে এবার নিজ দেশেও নজর দিতে হবে। বেকারত্ব অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে মার্কিনীরা উদ্বিগ্ন। মার্কিন জনগণ দেখেছে ডলার ও পারমাণবিক বোমা তাদের অসহায় মৃত্যুকে থামাতে পারেনি। তবে ৭৭ বছর বয়সী বাইডেন দ্বিতীয়বার নির্বাচনে নাও লড়তে পারেন স্বাস্থ্যগত কারণে। সেক্ষেত্রে পরবর্তী ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসাবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিস, না ঝানু কূটনীতিক হিলারি; নাকি অন্য কেউ আসবেন তার জন্য চোখ রাখতে হবে ২০২৪ সালে। 

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়