শ্রমঘন শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই করোনা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে নতুন করে কভিড সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ঘিরে নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসন্ন শীত সামনে রেখে বাংলাদেশেও বলা হচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রস্তুতি নিতে। শীতকালে করোনা সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ধারণা করা হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ হতে পারে প্রথমটার চেয়েও আরো বেশি ভয়াবহ। কেননা যেসব দেশে দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে, সেখানে বেড়েছে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু।

গত মার্চে কভিড পরিস্থিতি শুরুর পর তৈরি পোশাক খাতে যে ধাক্কা লাগে, তা সামলে পুনরায় গতিসঞ্চার করতে সময় লেগেছে কয়েক মাস। বিজিএমইএর তথ্যমতে, জুলাই-আগস্টে প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি পোশাক রফতানিতে সমর্থ হলেও করোনার বৈশ্বিক পরিস্থিতি হিসেবে শিল্পের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তাছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় স্টোর এখনো বন্ধ রয়েছে, গুছিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি অনলাইন প্লাটফর্মগুলোও। এমন অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা ঘিরে শিল্প মালিকদের কারখানা ও উৎপাদন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণের বিকল্প নেই। না হলে উৎপাদন আরো কমে অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ভিয়েতনামের সাফল্য অনুসরণীয়। শিল্প কারখানাগুলোয়ও তারা কঠোর নিয়ম পরিপালন ও নতুন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক হারে সংক্রমণ প্রতিরোধে সমর্থ হয়েছে। বেটার ওয়ার্ক ভিয়েতনাম উদ্যোগের আওতায় ভিয়েতনামের প্রায় ৫১টি কারখানায় করোনা সচেতনতাবিষয়ক মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে, যা মহামারীর সময়ে শ্রমিক-কর্মীদের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি, কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও বৈশ্বিক বিষয়ে তাদের ধারণা দেয়। ভিয়েতনামের ‘গোপি’ নামক এ অ্যাপ ব্যবহার করে শ্রমিক, কারখানা প্রতিনিধি এবং পরামর্শদাতারা তথ্য শেয়ার ও আপডেট করতে পারেন, শ্রমিক ও পরিচালন কর্মীরা আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। এদিকে ভিয়েতনামের পোশাক ও জুতা শিল্পের ওপর কভিড-১৯-এর নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে মালিক পক্ষ, শিল্প সংস্থা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো সম্মিলিতভাবে কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।

পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য আমাদেরও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কারখানার বাইরে শ্রমিকদের ঘনবসতিপূর্ণ নাজুক আবাসন তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলছে। এমন অবস্থায় শিল্প-কারখানাগুলোকে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে কারখানার প্রবেশের আগে কর্মীদের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা, তাপমাত্রা পরিমাপ, মাস্ক ও হ্যান্ড গ্ল্যভস পরিধান, স্যানিটাইজ ও কারখানা পরিচ্ছন্ন করার মতো বিষয়গুলো। কর্মীরা যেন চাকরি হারানোর ভয়ে অসুস্থতার বিষয়টি চেপে না রাখেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে স্বচ্ছ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাছাড়া কারখানার মধ্যে কয়েকবার করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নির্দেশনার বিষয়ে সচেতনতামূলক ঘোষণা দিয়ে কর্মীদের সচেতন করতে হবে। 

যদিও এরই মধ্যে পরিচ্ছন্নতার মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে বেশিরভাগ কারখানার ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কারখানা পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা কমিটিকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করাটা ফলপ্রসূ হবে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কারখানার বিরুদ্ধে যথাযথ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কার্যক্রম পরিচালনার প্রমাণ পাওয়া যাবে, জরিমানা করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি নিশ্চিত করতে হবে শতভাগ নিয়ম মেনে চলার বিষয়গুলো। দেশের রফতানি বাণিজ্যের ৮৪ শতাংশ অবদান তৈরি পোশাক খাতের। কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশও খাতটি ঘিরে। বৈশ্বিক কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটাও এসেছে এ খাতের ওপর। রফতানিতে ঘটেছে বড় পতন, অসংখ্য শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। নতুন করে কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় আছেন অসংখ্য শ্রমিক। এমন অবস্থায় পোশাক খাতের উৎপাদন ধারাবাহিক রাখতে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণের বিকল্প নেই। তাই কভিডকালীন এ পরিস্থিতিতে কারখানাগুলোকে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকি জরুরি।