রাষ্ট্র হিসেবে এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপান। দুর্যোগ ও সংকট মোকাবেলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটির সরকার স্বাধীনতার পর থেকে অব্যাহতভাবে আর্থিক-কারিগরিসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা জুগিয়ে আসছে এখানে। জরুরিকালীন পরিত্রাতার ভূমিকার পাশাপাশি দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে ক্রমেই বাণিজ্যিকভাবেও সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়াসী। এর সংকেতও দৃশ্যমান। তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালে ৭০টি থাকলেও এক দশক পর ২০১৮ সালে বাংলাদেশে কাজ করা জাপানি কোম্পানির সংখ্যা ২৭৮-এ উন্নীত হয়েছে। কিছুদিন আগে আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা জাপান টোব্যাকো কর্তৃক কিনে নেয়াসহ সম্প্রতি অটোমবিল কারখানা, ইস্পাত কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডের স্টোর খোলার খবর মিলছে। এগুলো বাংলাদেশে দেশটির বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আরো বড় মাত্রায় যুক্ত হওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। জাপানের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে অব্যাহতভাবে সম্পৃক্তির এ সুযোগ আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। এজন্য সহায়ক পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি।

বিদেশী বিনিয়োগ বিশেষ করে জাপানি উদ্যোক্তাদের আকর্ষণে সরকারের সদিচ্ছার কমতি নেই। এরই মধ্যে সরকার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য এককভাবে নিবেদিত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা নিশ্চয়ই তাদের জন্য বড় প্রেষণা হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অবকাঠামোই সব নয়; ব্যবসায়িক কর্মপরিবেশ, বিধি-ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রের মানসিকতা কেমন, প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও আপেক্ষিক সুবিধা কতটুকু আছে, সর্বোপরি অন্য দেশগুলোর তুলনায় এখানে বিনিয়োগকারীদের ব্যয়-সুফল কতটা হবে প্রভৃতি বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়াটাই এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জরুরি। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো। ১০ বছরের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের সঙ্গে সংগঠনগুলোর যৌথভাবে কাজ করার জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি সই হবে বলে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি কাম্য।

শ্রমব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়া এবং দেশটির জনমিতিক বিন্যাসে বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর আধিক্যের কারণে জাপানি শিল্প-কারখানা ও কোম্পানিগুলো অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ৫০০-এর বেশি জাপানি কোম্পানি বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। এটা কাজে লাগাতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট হতে হবে। তুলনামূলক সুবিধা যেখানে বেশি, সেদিকে তা চালিত হবে, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটিই মূলমন্ত্র। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী হলো ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে উভয় দেশের অবস্থান আমাদের চেয়ে এগিয়ে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম সস্তা শ্রম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে জোরালোভাবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে হাজির হচ্ছে। কভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণেও দেশটি প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কভিড পরিস্থিতি এখনো খুব একটা নিয়ন্ত্রণে নেই, উপরন্তু বড় ধরনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই দীর্ঘমেয়াদি ও আশু বিবেচ্য উভয় বিচারেই তাত্ক্ষণিক সমাধান এবং অনুকূল বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ভিয়েতনামকে যে এগিয়ে রাখবেন, এটিই স্বাভাবিক। জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্যও এটি সত্য। এটা বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে জাপানিদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে বাড়ানো যায়, তার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। 

শুধু বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি নয়, দেশ থেকে জাপানে রফতানি বাড়ানোরও উদ্যোগ নিতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) জাপানে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি হয়েছে ১১৭ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এ ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে হবে। বর্তমানে পোশাক পণ্য, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রফতানি হচ্ছে। রফতানি ঝুড়ি আরো কীভাবে বহুমুখী করা যায়, তা খুঁজে বের করতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশকে দেয়া বাণিজ্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার চিন্তা করছে বলে জাপানি রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক এক আলোচনায় উঠে এসেছে। এজন্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সম্পাদন করা জরুরি। সর্বোপরি, উভয় দেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগ বাড়াতে একটি যৌথ কার্যদল গঠন করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় দেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হবে এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে, এটিই প্রত্যাশা।