মহামারী শুরুর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে কভিড-১৯-এর কয়েকটি কার্যকর ও নিরাপদ টিকার উন্নয়ন এবং অনুমোদন সত্যিই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। এর মধ্য দিয়ে এই বিপর্যয়কর সংকটের অবসানে বিশ্বব্যাপী আশার সঞ্চার হয়েছে। আগামী মাস, সপ্তাহ কিংবা দিনগুলোয় যা ঘটবে, তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল ধনী দেশ নয়, মোটামুটি একই সময়ে বিশ্বের সবখানে এসব টিকা সহজলভ্য করতে হবে। এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে টিকাগুলো ধনী দেশগুলোর বেশির ভাগ নাগরিকের কাছে পৌঁছবে এবং নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোয়ও সেগুলো পৌঁছানো শুরু করবে। যে গতি ও মাত্রায় টিকাগুলো জোগানো হচ্ছে, তা যেমন খুব ব্যতিক্রম, অনন্যসাধারণ এবং মহামারী অবসানের জন্য তা আবশ্যিকও বটে। বড় বিষয় হলো, এটি সম্ভব হচ্ছে গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি ও ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (যার প্রধান আমি) গৃহীত বৈশ্বিক কভিড-১৯ টিকাদান প্রচেষ্টার কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া কোভ্যাক্সের প্রতি নজিরবিহীন বৈশ্বিক সংহতি ও বহুপক্ষীয় সমর্থনের কারণে। এজন্য সবাই সাধুবাদ প্রাপ্য।
কোভ্যাক্স আগামী বছরের মধ্যে দুই বিলিয়ন টিকার ডোজ সরবরাহের চেষ্টা করবে। আর্থিক সক্ষমতা যা-ই থাকুক না কেন, অংশহগ্রহণকারী ১৯০টি দেশের মানুষের কাছে টিকা পৌঁছে দেয়া হবে। প্রকৃতপক্ষে চলতি বছরের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের সেবাকর্মীদের সুরক্ষার জন্য টিকার পর্যাপ্ত মাত্রা জোগানো সম্ভব হবে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, হতাশাবাদীদের নেতিবাচক বিভিন্ন মন্তব্য ও সমালোচনা সত্ত্বেও কর্মসূচিটি অনেক বেশি সরকার, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক এবং টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। এসব অংশীজন এখানে সই করছে, কারণ তারা যথার্থভাবেই জানে যে কোভ্যাক্সই হলো কভিড-১৯ সংকটের একমাত্র টেকসই বৈশ্বিক সমাধান।
আমরা এখন এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছি যে কোভ্যাক্স ব্যর্থ হবে—এ ধরনের অমূলক ধারণা অবশ্যই অবসান ঘটবে। যে উদ্দেশ্যে উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে, তার সাফল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো শুরু করার এখনই সময়। টিকার উন্নয়ন ও অনুমোদন এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। মনে রাখতে হবে যতক্ষণ নভেল করোনাভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়াবে ততক্ষণ অনেকেই আক্রান্ত হবে এবং কেউ কেউ মারাও যাবে। স্বাভাবিক ব্যবসা, বাণিজ্য ও ভ্রমণে ফেরার আশা অধরাই থেকে যাবে। কাজেই কোভ্যাক্স প্রচেষ্টাকে আমাদের সবর্তোভাবে এগিয়ে নিতে হবে বৈকি।
নভেল করোনাভাইরাসের বৃত্ত অবসানে আমাদের কেবল কিছু দেশের কিছু মানুষকে টিকা প্রয়োগ করলে হবে না, বিশ্বের সব দেশের সব মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এখন যেহেতু টিকা বিতরণ শুরু হয়েছে, সেহেতু অনুমানযোগ্যভাবেই চাহিদা সীমিত সরবরাহকে ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাকি বিশ্বের জন্য প্রতিশ্রুত ডোজগুলো সরবরাহ আরো যদি পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ দরদাতাদের (পড়ুন ধনী দেশগুলো) টিকা বিতরণ করা হয়, তাহলে সংকট আরো প্রলম্বিত হবে। মূলত টিকাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের সমস্যা সমাধানের জন্যই কোভ্যাক্স সৃষ্টি করা হয়েছিল। কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় আমাদের অবশ্যই ২০০৯ সালের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে, গুটি কয়েক ধনী দেশই যখন এইচওয়ানএনওয়ান টিকার বেশির ভাগ বৈশ্বিক জোগান কিনে নিয়েছিল। ফলে বাকি বিশ্ব টিকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। যেহেতু প্রতিটি জাতীয় সরকারের প্রথম দায়িত্ব নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সেহেতু ৩৫টি দেশ এরই মধ্যে কভিড-১৯-এর টিকার জন্য যে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
বৈশ্বিক টিকাদান প্রচেষ্টার প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন এসব ব্যবস্থা মোটেই আদর্শ নয়। যদিও কোভ্যাক্স সুনির্দিষ্ট এই সমস্যা ঘিরে কাজ করতে যথেষ্ট নমনীয়, তবে সেটি ততক্ষণই করতে পারবে যতক্ষণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় সরকারগুলোর মতো টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক প্লাটফর্মটিকে একই ধরনের প্রবেশাধিকার দেবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কিছু সরকার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টিকা কিনছে, যা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপে বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। উল্লিখিত দেশের কিছু দেশ অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছে উদ্বৃত্ত অর্ডারগুলো তারা দান করবে, এসব বাড়তি ডোজ যতটা সম্ভব দ্রুত ও ন্যায্যভাবে দরিদ্র দেশগুলোয় প্রবাহিত করা প্রয়োজন হবে। এটি নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হলো দাতা সরকারগুলোর গ্যাভি/কোভ্যাক্স অ্যাডভান্স মার্কেট কমিটমেন্ট (এএমসি) ম্যাকানিজমের মধ্য দিয়ে কাজটি সমাধা করা—যে প্রক্রিয়াটি তৈরি করা হয়েছিল বিশ্বের ৯২টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে।
সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কিছু টিকার উন্নয়ন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে উল্লিখিত দেশগুলোর মানুষের জন্য কোভ্যাক্স প্রায় ১ বিলিয়ন ডোজ নিশ্চিত করেছে। কিন্তু আরো অনেক ডোজের প্রয়োজন। সব উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের টিকাকে কোভ্যাক্সের জন্য সহজলভ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে হবে, যাতে যথাসময়ে বিশ্বব্যাপী টিকা প্রয়োগ করা যায়। কিছু উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এটি করেছে এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো ২০২০ সালে কোভ্যাক্সএএমসির জন্য প্রয়োজনীয় ২ বিলিয়ন ডলার অর্থের জোগান দিয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালে আলোচ্য কর্মসূচির জন্য বাড়তি ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন এবং দ্বিতীয় কভিড-১৯ রিলিফ প্যাকেজ থেকে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। এগুলো খুব আশাজাগানিয়া। এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়াতে হবে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারির সময়ে ফিরে গিয়ে কেউ কেউ কল্পনা করেছিলেন যে বছর শেষে আমাদের একাধিক অনুমোদিত টিকা থাকবে এবং সেগুলো উচ্চ ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় যুগপত্ভাবে সরবরাহে একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরি হবে। তবে সেই সামর্থ্য এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আশার কথা হলো, বিশ্বসম্প্রদায় এক জায়গায় সমবেত হয়েছে এবং যথাযথভাবে সব দেশে টিকা বিতরণের জন্য একটি বৈশ্বিক প্লাটফর্ম গড়ে উঠেছে। কাজটি সম্পন্ন করার জন্য কোভ্যাক্সের এখন যথেষ্ট আন্তর্জাতিক সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বিশ্বনেতৃত্ব আরো আন্তরিক ও নিবিড়ভাবে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
এনগজি ওকানজো ইওয়েলা: বিশ্বব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক; নাইজেরিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী; সাবেক পর্ষদ সভাপতি, গ্যাভি, ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স; কভিড-১৯ বিষয়ক আফ্রিকান ইউনিয়নের সাবেক দূত
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










