দারিদ্র্য, অরক্ষণীয়তা ও ঝুঁকি প্রশমনে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রতি বছর এর আওতাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বয়স্ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, দুস্থ নারীসহ নাজুক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দও বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ যেখানে মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৮১ ও জিডিপির ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ ছিল, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতের বরাদ্দ বাজেট ও জিডিপি বিবেচনায় যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৮৩ ও ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আকার বড় হলেও এটি নিয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে মতদ্বৈধতা রয়েছে। তাদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে বিবেচনায় রেখে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একটি উল্লেখযোগ্য অংশই যাচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের পেছনে। যদিও চাকরির পর তাদের প্রায় শতভাগই দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করে। মূল মোট ব্যয়ের আকার বাড়িয়ে দেখাতেই এমনটি করা হচ্ছে বলে অভিযোগও রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন সুবিধা দেয়াটা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা হলেও এখন সরকার এ দায় সারছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে। এটি সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের দর্শন ও বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কেননা, সাধারণত দরিদ্র, অক্ষম ও ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি-পরিবারকে সহায়তা করাই বিশ্বব্যাপী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রচল রীতি। অথচ তার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে সরকারি অবসরভোগীদের পেনশন ব্যয় সামাজিক নিরাপত্তায় অন্তর্ভুক্তি খোদ এর কার্যকারিতাই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সচ্ছল জনগোষ্ঠীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করায় প্রকৃত উপকারভোগীর সঠিক চিত্র উঠে আসছে না। এমন আরো কিছু অসংগতি রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে বরাদ্দে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ কিংবা স্টিমুলাস প্যাকেজের সুদ পরিশোধ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে মোট ব্যয়কে বেশি দেখানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থকেও সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে যে ‘স্কুল ফিডিং প্রোগাম’ রয়েছে সেটিও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক সুরক্ষার কার্যকারিতা নিশ্চিতে অসংগতি দূরীকরণে নীতিনির্ধারণী মহলের সক্রিয়তা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বড় করে দেখাতে এমন পদক্ষেপ নেয়া হলে তা হবে দুঃখজনক। এতে পরিকল্পনা প্রণয়নকারীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে যে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেশি। এক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া থেকে প্রকৃত দুর্বল জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হতে পারে। জনগণের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, যা এর উদ্দেশ্য ব্যাহত করবে।
করোনা মহামারীর পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরো বড় মাত্রায় দেখা দিয়েছে। এর অভিঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কর্ম ও আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে অনেকেরই। এতে বিগত দশকগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচনে অর্জিত সাফল্য ম্লান হয়ে আবারো দারিদ্র্য বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক হিসাবে করোনা দুর্যোগে দেশে নতুন করে আরো অন্যূন ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তার আওতা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি নতুন উপকারভোগী চিহ্নিত করে তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। তাদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যই এটি প্রয়োজন। এখনো জিডিপিতে স্বাস্থ্যবহির্ভূত সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয়ের হার বিবেচনায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে তলানিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এমনকি এক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানেরও নিচে আমাদের অবস্থান। এর মধ্যে পেনশন, সুদ ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তার প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করা আরো কঠিন হবে বৈকি। উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ব্যয় আলাদা করার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের, যাতে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে কতটুকু যাচ্ছে, সেটি পরিমাপ করা সহজতর হয়। এটি আমলে নেয়া যেতে পারে।
পুরো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি সুসমন্বিত অ্যাপ্রোচ জরুরি। এখনো এটি সমন্বয়হীন। বিরাজমান ১৪০টি কর্মসূচি প্রায়ই ক্ষেত্রে পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে এতে অধিক্রমণের সমস্যাও প্রবল। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২২টি মন্ত্রণালয় তথা সরকারি সংস্থা যুক্ত। একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় নেই। ফলে এসব কর্মসূচি থেকে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। তদুপরি রয়েছে অপ্রতুল বরাদ্দ বেহাত হওয়ার ঘটনাও। সর্বসাম্প্রতিক বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৭৫ শতাংশ সচ্ছল মানুষ সুবিধা পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও নতুন নয়। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃতার্থে যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা তারা বঞ্চিত হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী হতদরিদ্র ও পিছিয়ে পড়ারাই সামাজিক সুরক্ষা বা সুবিধা পাওয়ার কথা। অথচ অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটছে। সেদিক থেকে সামাজিক সুরক্ষার নীতিগত দিকটি আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলা যায়। তদুপরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচ্ছলদের আলোচ্য খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এটি আরো বৈষম্যমূলক হবে। কার্যকারিতা ও পরিচালনে সুশাসন নিশ্চিতে পুরো ব্যবস্থাটি ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে।
চলমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা দিকে কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় বেড়েছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। ফলে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে। এ স্থবিরতা কাটাতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু ব্যয় বাড়ালে হবে না, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী সহযোগিতা পাচ্ছে কিনা তাও নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বলদের অর্থনৈতিক প্রভাব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতার সঙ্গে কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বরাদ্দকৃত অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে পরিচালন দক্ষতাও বাড়াতে হবে। সেখানে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা এবং সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে গড়ে তোলা যায়, তার উপায় বের করতে হবে। গতানুগতিকতার বাইরে এসে সামাজিক সুরক্ষাকে আরো কার্যকর ও লক্ষ্যাভিমুখী করতে সরকার জুতসই উদ্যোগ নেবে বলে প্রত্যাশা।










