করোনা বা ডেঙ্গু দুটোই মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ার পরিচ্ছন্নতা। অদৃশ্য শত্রু নভেল করোনাভাইরাস। কোথায়, কীভাবে আঘাত হানবে, জানা নেই কারো। গৃহস্থালি বর্জ্য নিয়ে দিনভর কর্মযজ্ঞ যাদের, সংক্রমণের ঝুঁকি তাদের অনেক বেশি, সেটা সবারই জানা। তবু সুরক্ষায় বিশেষ পোশাক তো দূরের কথা, নেই মাস্ক, গ্লাভসও। একজন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মী আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে প্রতিটি বাসা, ভেঙে পড়তে পারে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সমাজের অন্যতম একটি গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন, যা লকডাউনের সময়ও অব্যাহত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশ সময়েই স্বল্প বেতনের বিনিময়ে একটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ জীবনযাপন করতে হয়, যার সঙ্গে যুক্ত হয় চিরায়ত সামাজিক গোঁড়ামি ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এ নিয়ে ওয়াটার এইড এপ্রিলের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে একটি গবেষণা চালায়। পরিচ্ছন্নতা কাজের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে জড়িত কর্মীদের এ গবেষণার আওতায় ইন্টারভিউ করা হয়, যার মধ্যে ছিলেন বর্জ্য সংগ্রহকারী, ঝাড়ুদার, ল্যাট্রিন ও হাসপাতাল পরিষ্কারকরা। কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে রোগ সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রসঙ্গে উদ্বেগের বিষয়টি চারটি স্টাডির প্রতিটিতেই উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওয়াটার এইডের গবেষণা বলছে, অধিকাংশ কর্মীর মধ্যেই ঝুঁকি রোধ করতে পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্টের (পিপিই) ব্যবহার প্রসঙ্গে স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সরবরাহ ও ব্যবহার ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকারী পক্ষ থেকে পিপিই সরবরাহ করা হলেও এর মাপ, গুণগত মান ও পর্যাপ্ততা প্রসঙ্গে অসংগতি লক্ষ করা গেছে। মাস্ক ও গ্লাভসের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত দেখা গেলেও অন্যান্য বিশেষায়িত উপকরণ যেমন
অ্যাপ্রন বা গগলসের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও ব্যবহার ছিল অপ্রতুল। এমনকি হাসপাতাল পরিষ্কারের মতো উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই অসংগতি লক্ষ করা যায়।
দেশের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের অবস্থা খুবই সেকেলে। আমাদের দেশে সাধারণত ময়লা খোলা জায়গায় ফেলা হয়। সেখানে থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা তা সংগ্রহ করেন এছাড়া বাসা থেকেও বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু আবর্জনায় কী আছে তা সংগ্রাহকরা জানে না। উন্নত দেশগুলোর মতো এখানে আবর্জনা অনুযায়ী আলাদা বিন রাখা হয় না। সব ময়লা একই বিনে ফেলা হয়। এতে সেখানে থেকে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের সময় বি ও সি ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হাত এবং পা। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যাসহ খাদ্যনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কিডনি সংক্রমণ, যক্ষ্মার মতো রোগ হতে পারে। শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে বাসাবাড়িতে আলাদা ময়লার ঝুড়ি, আবর্জনা সংগ্রাহক ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের সার্বক্ষণিক মাস্ক ও বড় গ্লাভস ব্যবহারের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা আবর্জনা সংগ্রহ ও তা বাছাইয়ে উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি সমস্যাটিকে আরো প্রকট করে তোলে। অল্প কিছুসংখ্যক কর্মী বাদে অধিকাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরই সামাজিক ঝুঁকি নিরসন ও জরুরি সেবা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য চেষ্টা ছিল না।
কভিড মহামারীকালেও কাজ করে যাওয়া ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আর খুব বেশি কিছু করার নেই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কাজটি করে যাচ্ছেন যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা কোনো বিশেষ পুরস্কারের প্রত্যাশা ছাড়াই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সরকারের উচিত ঝুঁকির মাঝে কাজ করে যাওয়া এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা, যার ভেতরে হেলথ ইন্স্যুরেন্স, গাইডলাইন ও ট্রেনিং সুবিধা থাকবে। কেবল যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার মাধ্যমেই এই স্বার্থহীন মানুষগুলো সুস্থ থেকে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন। বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিসত্বর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কর্মপরিবেশ ও জীবনযাপনের অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উত্তরণ ঘটিয়ে বহুবছর ধরে টিকে থাকা সামাজিক গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতেও সমাজের সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জরুরি।










