করোনার সময়েও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে উদীয়মান দেশগুলোর প্রতিযোগিতা থেমে নেই। চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বৈরথসহ নানা কারণে বিনিয়োগের স্থান বদল এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশগুলো বিভিন্ন ছাড় ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি পরিবেশ উন্নয়নে জোর দিয়েছে। কিছু দেশ দক্ষ মানবসম্পদ ও মানসম্পন্ন কর্মপরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সচেষ্ট, এমনকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যে সেবা দিতেও প্রস্তুত দেশগুলো। বাংলাদেশও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু তার সাফল্য বড় আকারে এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সম্প্রতি ডিসিসিআই আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, জটিল কর কাঠামো, বন্দরে কালক্ষেপণ ইত্যাদি সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির ছড়াছড়ি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার অন্যতম অন্তরায় এখানে। এসব জটিলতার ফলে বিনিয়োগের অনুমোদন পেতেও সময়ক্ষেপণ হয়। তাছাড়া এখানে ব্যবসা করার জন্য নানা ধরনের বাড়তি ব্যয়ও বহন করতে হয়। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই অনুৎসাহিত হয়ে পড়েন। বিদেশী বিনিয়োগ আনতে যখন সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন দেশীয় বিনিয়োগের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার দেশের ২৭টি শিল্প চীন থেকে ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তর করবেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো এ ব্যাপারে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ওইসব আমেরিকান কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পাঁচ বছরের জন্য বিনা মূল্যে পর্যাপ্ত জমি দেয়া হবে। ইন্দোনেশিয়ায় আরো রয়েছে প্রচুর উৎপাদনশীল দক্ষ শ্রমিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা। জাপানের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানান্তর গ্রহণের জন্য ভিয়েতনাম, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশি। এরই মধ্যে ভারত সরকার গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ও অন্ধ্র প্রদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর শিল্প স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারও। সাম্প্রতিক সময়ে স্থিতিশীল অর্থনীতি ভিয়েতনামের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ডলারের তুলনায় ভিয়েতনামিজ ডং মোটামুটি স্থির রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি রয়েছে এক অংকের ঘরেই। ২০০৭ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয় ভিয়েতনাম। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা, এ দুটি দেশ ভিয়েতনামে অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী। দেশটিতে বড় বিনিয়োগ আসছে চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে। এছাড়া চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও প্রযুক্তি লড়াইয়ে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোরও অন্যতম গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের মতে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এসডিজি বাস্তবায়নে প্রতি বছর বাড়তি দেড় লাখ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন; যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর মোট বার্ষিক উৎপাদন ও সেবার ৫ শতাংশ। এ অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য এর পরিমাণ আরো বেশি। তাদের প্রত্যেকের মোট জিডিপির ১৬ শতাংশ করে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। আঞ্চলিক সহায়তা এসডিজি অর্জনে বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম। এক্ষেত্রে অবশ্য সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ২০৩০ সালের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসডিজি অর্জনে বিশ্বসম্প্রদায়ের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে, যার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর বহু খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব বিনিয়োগ উৎপাদক ও আর্থিক কাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রহীতা দেশের অর্থনীতির বহুমুখী সক্ষমতাও বাড়াবে। পুঁজির প্রবাহ মূলত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতকে উন্নত করবে। এসব খাতের সঠিক উন্নতির ওপরই আগামী দিনের সফলতা নির্ভর করছে। স্বীকার করতে হবে, স্বল্পোন্নত দেশগুলো এ ধরনের বিনিয়োগ ও সহায়তার ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। জাতিসংঘের বাণিজ্য উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে নির্ধারিত সময়ে এসডিজি অর্জনে বার্ষিক বৈশ্বিক ৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার মাত্রার পুঁজিনিবেশ দরকার। সংস্থাটি আরো জানায়, প্রয়োজন সত্ত্বেও বার্ষিক টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগে আড়াই লাখ কোটি ডলারের ঘাটতি হচ্ছে। অথচ অনেক দেশেই কাঠামোগত সংস্কার ও উন্নয়নে এখন দ্বিগুণ পুঁজিনিবেশ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জাপানসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের বিনিয়োগ লাভের আশায় আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এজন্য প্রয়োজন হবে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নামমাত্র মূল্যে জমি প্রদান। প্রয়োজনে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়েও জোর আলোচনা চালানো যেতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন থেকে শিল্প স্থানান্তর ছাড়াও বাংলাদেশে হেলথ কেয়ার, ফার্মাসিউটিক্যালস ও এর উপাদান তৈরি, খাদ্য ও কৃষি শিল্প, আইসিটি, গাড়ি ও মোটরসাইকেল নির্মাণ শিল্প, ইলেকট্রনিকস, সেলফোন সেট, ল্যাপটপ-কম্পিউটার, ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার, কম্প্রেসার তৈরির জন্য বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে। লক্ষ্যপূরণে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, উন্নত অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। দূর করতে হবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। একই সঙ্গে পুঁজি ও কর্মসংস্থান বাড়াবে এমন শিল্প প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বিনিয়োগের পূর্বশর্তগুলো পূরণ না করতে পারলে প্রকৃত বিদেশী বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে না। বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে বিনিয়োগকৃত অর্থ বা লভ্যাংশ যাতে বিনিয়োগকারী নিজ দেশ বা অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারেন, সেজন্য এ-সংক্রান্ত সব ব্যাংকিং কার্যক্রম ও নীতিমালা পরিবর্তন বা প্রতিবন্ধকতা দূর করার আশু ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে কর নীতিমালার সংস্কার ও আধুনিকায়ন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজতর করাসহ সার্বিকভাবে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশের বাণিজ্য পরিবেশের উন্নয়ন হলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় কমবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুততম সময়ে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সুবিধা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রদান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য আলাদা শিল্পাঞ্চল গঠন ও বাড়তি সুবিধা প্রদানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।










