কভিড-১৯ মহামারী দেশের সর্বক্ষেত্রে বিপর্যকর প্রভাব ফেলেছে। বাদ যায়নি শিক্ষা খাতও। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপকতর বিস্তার ঠেকাতে নয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, কবে খুলবে তাও অনিশ্চিত। এজন্য পাবলিক পরীক্ষাগুলোও সময়মতো আয়োজন করা যায়নি। এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ ধরনের এক অনিশ্চয়তামূলক পরিস্থিতিতে চলতি বছর পরীক্ষা ছাড়াই সব শিক্ষার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসএসসি ও জেএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে এখন চলছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কার্যক্রম। সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না হলেও ডিসেম্বরের শেষের দিকে ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলমান। অথচ তার আগেই বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক শ্রেণীতে ফলপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার খবর মিলছে। শুধু ভর্তি নয়, এমনকি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নাকি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অংশগ্রহণেরও সুযোগ দিচ্ছে। এটি নিয়মের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ইউজিসির কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং ভর্তির যোগ্যতাবিষয়ক জারীকৃত বিধিবিধান উভয় ক্ষেত্রেই স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো এইচএসএসি বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। বিশেষ করে গত বছর ইউজিসির জারি করা কার্যালয় স্মারকে বলা আছে, স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন ভর্তিচ্ছুকে অবশ্যই এসএসসি ও এইচএসসি কিংবা সমমানের পরীক্ষায় ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ কিংবা ২ দশমিক ৫ গ্রেড থাকতে হবে। ওই স্মারকে বেঁধে দেয়া শর্ত অনুযায়ী, কারা চলতি বছর স্নাতকে ভর্তি হতে পারবে তা কেবল ফল প্রকাশের পরই জানা যাবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ শর্ত না মেনে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। এটি আইন ও নৈতিকতা উভয় বিচারেই গ্রহণীয় নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগত উল্লম্ফন ঘটলেও শিক্ষার মানে রয়ে গেছে প্রশ্ন। তার ওপর সনদ ছাড়া ভর্তি করা হলে ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তির ঝুঁকি থাকছে। এটি ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং এ ধরনের অন্যায্য কার্যক্রম ও অনিয়ম দ্রুতই বন্ধ করতে হবে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অপ্রতুল আসন সংখ্যার প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাহিদা বিবেচনায় মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে। কিন্তু চলমান মহামারীতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। গত দুই সেমিস্টারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তিতে রীতিমতো ধস নেমেছে। দু-একটি ছাড়া বর্তমানে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী সংকট প্রকট। যেহেতু প্রধানত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেহেতু শিক্ষার্থী সংকটে স্বভাবতই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক টানাপড়েনে পড়েছে। বাস্তব ও প্রকৃত এ সমস্যা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে নিয়ম লঙ্ঘন করে শিক্ষার্থী ভর্তির কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এটিই প্রথম নয়, এর আগেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনিয়মে জড়িয়েছে। নিজস্ব ভবনে ক্যাম্পাস স্থানান্তরের শর্ত লঙ্ঘন, নির্ধারিত পরিমাণ অবকাঠামো না থাকা, সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেয়া, সুনির্দিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত না থাকা, বেঁধে দেয়া ভর্তি ফির শর্ত পরিপালন না করা, আর্থিক দুর্নীতিসহ বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন অনেকটা তাদের অভ্যাসগত চর্চায় পরিণত হয়েছে বলা চলে। ফল প্রকাশের আগে শিক্ষার্থী ভর্তির চলতি অনিয়মকে তাদের আগের প্রবণতার বাইরে দেখাটা সমীচীন হবে না। অব্যাহতভাবে নানা অনিয়ম করলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ইউজিসি তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইনগত পদক্ষেপ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। এবার এর ব্যত্যয় দেখতে চাইব।

চলমান মহামারী একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। এ সংকটে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বেই শিক্ষা কাঠামো ভেঙে পড়েছে। সংক্রমণজনিত বড় বিপর্যয় এড়াতে অনেক দেশ এখনো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খোলেনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোরও একই অবস্থা। ফলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটি কাটাতে দেশগুলো কীভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করছে, পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে, সর্বোপরি সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে কীভাবে স্নাতক পর্যায়ে ব্যক্তি খাত অর্থায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করছে, সেসব অভিজ্ঞতা ও বাস্তব দৃষ্টান্তগুলো আমলে নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল প্রভৃতি দেশ সৃষ্ট হওয়া শিক্ষা সংকট কীভাবে মোকাবেলা করছে, তার সুলুক সন্ধান আমাদের জন্য সুফলপ্রদায়ী হতে পারে। সত্য যে অনেক দিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিষয়টি মাথায় রেখে কেউ কেউ অবশ্য ফলপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের সাময়িক ভর্তির সুযোগ প্রদানের কথাও বলছেন। সামগ্রিকভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক এ-সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা দেয়া যায় কিনা, সেটিও ভেবে দেখা জরুরি।