সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের জন্য প্রায়শই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে মামলার খবর পাওয়া যায়। এই আইনের বিরোধিতা করে বেশ আন্দোলন-সংগ্রামও হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে এসব ঘটনার বর্ণনা পড়লে লক্ষ্য করা যায়, এই সমালোচনার স্রোত সবসময়ই কিছুটা এক পাক্ষিক। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন freedom of speech বা বাকস্বাধীনতাকে (Art. 19, UDHR) ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাধীনচেতা বক্তব্য প্রকাশ করে অপরের honor and reputation তথা মর্যাদা ও খ্যাতি (Art 12, UDHR) ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনাও প্রায়শই শোনা যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও গ্রেফতারের সমালোচনা করার সময় তাই আইনের কার্যকরণ প্রক্রিয়া ও পরিভাষা মাথায় রাখা প্রয়োজন। বাকস্বাধীনতার সীমানা এবং সমালোচনার ক্ষেত্রেও অপরের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার গুরুত্ব আইনের কার্যকরণ প্রক্রিয়া ও পরিভাষা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কোনো বক্তব্যের মাধ্যমে Defamation বা মানহানি হয়েছে কিনা সে বিবেচনার ক্ষেত্রে মূল কয়েকটি বিষয় হলো: ১. সেটি জনসম্মুখে প্রকাশিত একটি বক্তব্য হতে হবে; ২. সেই বক্তব্যের কারণে জনমনে একজন ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হবার স্পষ্ট সম্ভাবনা থাকতে হবে; ৩. বক্তব্যটি মিথ্যা হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রথম বৈশিষ্ট্যটি সর্বদাই বিদ্যমান। ফেসবুক বা টুইটারে প্রকাশিত বক্তব্য সরাসরিই একটি ন্যূনতম জনতার কাছে পৌঁছে যায়। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটিই এক্ষেত্রে মূল অভিযোগ। একজন ব্যক্তির এমন সমালোচনা যার মাধ্যমে তার প্রতি অন্যান্যদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি। প্রকাশিত বক্তব্যটি মিথ্যা হতে হবে। কারণ, একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই খারাপ হন, তার স¤পর্কে জনগণকে সতর্ক করাও একটি নৈতিক দায়িত্ব। সাংবাদিকগণও জনগণের জন্য এই দায়িত্বটিই পালন করে থাকেন। তাই জনসম্মুখে সমালোচনা করলেও তা মানহানি বলে গণ্য হবে না, যদি তা সত্য হয়। আলোচিত ঘটনাগুলোতে বক্তব্যগুলো সত্য ছিলো কিনা সেই বিতর্ক এখানে টানছি না। কিন্তু, একটি বক্তব্য সত্য হতে হলে তাকে পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে স্পষ্ট সত্য হতে হবে। বিন্দুমাত্র অসত্য হবার সম্ভাবনাও তাকে মিথ্যার কাতারে ফেলে দিতে পারে। তার ওপর যে বক্তব্যটি একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মত স্পর্শ কাতর, সেই বক্তব্য সন্দেহাতিতভাবে সত্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়। নচেৎ, যেকোনো মানুষের বিরুদ্ধে খেয়াল-খুশি মতোএকটা প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব।
পুনশ্চ পরিষ্কার করছি, আলোচিত বক্তব্যগুলো আদৌ সত্য বা মিথ্যা কিনা সে বিতর্ক এই লেখার আলোচ্য নয়। এই লেখাটির উদ্দেশ্য ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখবার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদের অসতর্ক এবং নিয়ম নিষ্ঠা উপেক্ষার মনোভাব বিশ্লেষণ করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লেখাগুলো মূলত মতামত বা Opinion ধরনের হয়ে থাকে। কড়া সমালোচনা করে আইনের সুরক্ষা পেতে সেটিকে প্রমাণ ও যুক্তিসিদ্ধ সত্য বা Fact হতে হবে। যেহেতু বক্তব্যগুলোর Fact হবার সুযোগ বা সম্ভাবনা বেশ দুর্বল কিংবা এই বক্তব্যগুলো Fact হিসেবে গণ্য হবার মত পর্যাপ্ত প্রমাণএবং যুক্তি সমেত প্রকাশিত হয়নি, সেহেতু আইনব্যবস্থার বৈধ প্রক্রিয়াতেই মামলা, গ্রেফতার ও আদালতের আমলে গৃহীত হওয়া সম্ভব; এমনকি সত্য প্রমাণে ব্যর্থ হলে সম্ভব শাস্তিও। যদিও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে শাস্তির বিধান অস্বাভাবিকভাবে অত্যধিক। তবে সমালোচনার সেই দিকটি এই কলামের বিষয়বস্তু নয়। আইনের কার্যকরণ বুঝে এবং এক পাক্ষিক বাকস্বাধীনতা নিয়ে না ভেবে, অপরের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। কেবল বাকস্বাধীনতা নিয়েই খুব বেশী আলোচনা হওয়ায়, অপরের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করার যে দায়িত্ব সেটি যেনো ক্রমেই অগোচরে চলে যাচ্ছে। কেবল মন্ত্রী প্রমুখই নয়, বক্তব্য প্রকাশে এ উদাসীনতা আক্রমণ করছে সেলিব্রেটিদের, মানসিক নির্যাতন করছে ব্যক্তি সাধারণকে, এমনকি নারীকে করছে যৌন হয়রানির শিকার। এক্ষেত্রে তাই ব্যবহারকারী হিসেবে বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী, আইন ও বিচারবিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।










