চলমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাংলাদেশের উন্নয়ন ডিসকোর্সে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশেষত এতে দেশের আগের শ্রমকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্রমেই ম্রিয়মাণ হচ্ছে। ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও নিম্নদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাহিত শ্রমসাশ্রয়ী হাই এন্ড প্রযুক্তিগুলো প্রবর্তন শিল্পের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় কম, লাভ বেশি। ফলে বিশেষত দুই বছর আগে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের কারখানাগুলোয় ধীরে ধীরে এসব প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ খাতে মোট কর্মসংস্থানের পরিমাণ কমতে শুরু করছে। একে তো রফতানি বহুমুখীকরণের ঘাটতি রয়েছে, তদুপরি খাতটিতে নারী কর্মীদের প্রাধান্য থাকায় স্বভাবতই তাদের কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক বেশি পড়ছে। শুধু পোশাক খাত নয়, দেশের পুরো শ্রমবাজারে নতুন শিল্প বিপ্লবের অভিঘাত পড়বে। এটুআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১ সাল নাগাদ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ কর্মচ্যুত হতে পারে। সাম্প্রতিক এক ভাচুর্য়াল আলোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তৃতায়ও এ ধরনের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। এ অবস্থায় উদীয়মান চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলায় আমাদের সার্বিকভাবে সক্ষম হতে হবে। আগের স্বাভাবিকতা বজায় থাকলে এর প্রভাবটি হয়তো আরো পরে অনুভূত হতো। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীতে লকডাউন আরোপের কারণে সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রবর্তনের কাজটি জোরালো করেছে। ফলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আরো দ্রুততার সঙ্গে বেগবান হচ্ছে। তাই এর প্রভাব মোকাবেলায় এখন থেকে প্রস্তুতি নেয়া জরুরি।

সত্য যে অর্থনৈতিক উৎপাদনে শ্রমভিত্তিক মূল্য সংযোজন বাড়ানোর ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলেও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাহিত প্রযুক্তিগুলো নতুন ধরনের সুযোগও তৈরি করছে। এগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস সার্ভে ২০২০ শীর্ষক প্রতিবেদনে আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী কী ধরনের কাজের চাহিদা বাড়তে পারে, কী ধরনের কাজের চাহিদা কমতে পারে, তার একটা তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ডাটা অ্যানালিস্ট ও বিজ্ঞানী, এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট, বিগ ডাটা বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল মার্কেটিং ও স্ট্র্যাটেজি বিশেষজ্ঞ, রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার, ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞসহ প্রভৃতি কাজের চাহিদা বাড়বে। অন্যদিকে ডাটা এন্ট্রি সহকারী, হিসাববিদ ও অডিটর, ডাক সেবার কেরানি, নির্মাণ শ্রমিক, মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ, কাস্টমার সার্ভিস কর্মীর মতো কাজের চাহিদা কমবে। এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য। কাজেই কোন কোন খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে আর কোন কোন খাতে বাড়তে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত ও শিক্ষাগত রূপান্তর করতে হবে। 

লক্ষণীয় দেশে এখন জনসংখ্যার একটা বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের শোভন কর্মসংস্থান মিলছে না। তাদের কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। এর সুবাদে বাংলাদেশকেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এ বিপ্লবের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে; এর প্রভাববলয়ের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হবে। সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে অন্য দেশগুলো কী ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করতে হবে এবং সে অনুযায়ী অগ্রসর প্রয়োজন।

সন্দেহাতীতভাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশকে একটি উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে পরিচালিত করবে। কাজেই এর সৃজনশীল দিকটি পরিচর্যা করা গেলে আমাদের সামনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি নতুন ধাপের দুয়ার উন্মোচন হবে। তবে এজন্য দরকার বহুমুখী কৌশলগত, কারিগরি ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। এ নতুন শিল্প বিপ্লব থেকে বাংলাদেশকে উৎপাদনশীলতার সুযোগ, রফতানি আয় বাড়ানো, মানসম্পন্ন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানো, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ নিতে হবে। এসব দিকে পিছিয়ে পড়া মানে সুফলগুলো হাতছাড়া হওয়া। এমনটি হলে এগুলো অন্য দেশ নিয়ে যাবে আর আমরাও হারাব আমাদের গতানুগতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলো। সুতরাং সুফলগুলো কাজে লাগাতে হলে টেকসই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ জরুরি। অর্থাৎ বিদ্যমান স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারকে নতুন দক্ষতার শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে নিতে হবে। বর্তমানে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারিভাবে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ ধরনের আরো কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি আইসিটি খাতভিত্তিক শিক্ষার ওপর আরো জোর দিতে হবে। নইলে নতুন শিল্প বিপ্লবের অভিঘাত মোকাবেলা করা কঠিন হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের জীবনযাত্রা, কাজ করার এবং একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্কিত হওয়ার মৌলিক পদ্ধতিগুলো আমূল পরিবর্তন করে দেবে। শিল্প উৎপাদনগত দিক থেকে এটি মানববিকাশের একটি নতুন অধ্যায়। এটি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটা শারীরিক, ডিজিটাল ও জৈবিক জগেক এমনভাবে একাকার করবে, যা নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ভয়াবহ বিপদেরও জন্ম দিতে পারে। ফলে বিপ্লবের গতি, পরিসর গভীরতা ঠিক কীভাবে বিকশিত করা গেলে আমাদের জন্য সুফলপ্রদায়ী হয়, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মচ্যুতির ভয় থাকলেও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উদ্ভাবন সম্ভাবনা অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এক. উচ্চদক্ষ স্নাতকদের জন্য উচ্চ আয়ের সুযোগ, দুই. বাংলাদেশ এখন যা উৎপাদন করে তার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং তিন. এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে সম্পদের কার্যকারিতা ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাবে। সুতরাং শুধু শঙ্কা নয়, সুযোগগুলো কাজে লাগাতে উন্নয়ন ও গবেষণা (আরঅ্যান্ডডি) সক্ষমতা এবং এ-সংক্রান্ত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতের পরিপূরক ভূমিকায় দেশে সামগ্রিকভাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী একটি সহায়ক ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে—এটিই প্রত্যাশা।