করোনা সংকটে দেশের অর্থনীতি দুঃসময় পার করছে। এই নিষ্প্রভ অর্থনৈতিক চালচিত্রেও নতুন করে আশা জাগাচ্ছে পাট শিল্প। চলমান কভিড-১৯ মহামারী শুরুর কিছু আগে থেকে আমাদের প্রধান রফতানিমুখী শিল্পপণ্যগুলোর বাজারে বড় ধরনের ধস নামলেও গেল অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি ৪ শতাংশ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক খবর বৈকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উন্নত দেশগুলো পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে জোর দেয়ায় ও পলিথিন ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ায় সামনের দিনে আবারো রফতানিতে বড় মাত্রায় পাট খাত অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সৃষ্ট সম্ভাবনা এরই মধ্যে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা এ খাতে আগের চেয়ে কিছুটা বৈচিত্র্য এনেছেন এবং নতুন নতুন পাটপণ্য রফতানি উপযোগী করে তুলছেন। বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়াও মিলছে। তবে বর্তমানে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচা পাটের সংকট। দেশে প্রতি বছর ৭৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হলেও চলতি বছর করোনা, আম্পান ও বন্যার কারণে ৫৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পাট উৎপাদন কম হবে। এদিকে দেশে অভ্যন্তরীণ কারখানাগুলোয় এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য কাঁচা পাটের মোট চাহিদা ৬৫ লাখ। তার মানে উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার কিছুটা অসংগতি বিদ্যমান। আগের উদ্বৃত্ত কাঁচা পাট থাকায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু মুশকিল হলো, কাঁচা পাট রফতানি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলছে। তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কাঁচা পাট রফতানি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এভাবে কাঁচা পাট রফতানি হলে সংকট আরো বাড়বে। এমনটি হলে পাটের অভাবে মিলগুলোর উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) শিগগিরই সরকারকে কাঁচা পাট রফতানি নিরুৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি প্রতি টন কাঁচা পাট রফতানিতে ২৫০ মার্কিন ডলার রফতানি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে সংগঠন দুটি। বিষয়টি আমলে নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ কাম্য।
দেশে বর্তমানে পাটকলের সংখ্যা ২৫৯। বেসরকারি এ শিল্প খাতে কর্মরত প্রায় দুই লাখ শ্রমিক। আর পরোক্ষভাবে এ শিল্পে চার কোটি লোক নিয়োজিত। বছরে পাটপণ্য রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। বলা চলে, কর্মসংস্থান ও রফতানি আয় উভয় বিবেচনাতেই পাটকলগুলোর অবদান মোটেই অনুল্লেখযোগ্য নয়। কাজেই পাটকলগুলোর উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কাঁচা পাটের জোগান নিশ্চিতে সরকারের সহায়ক নীতিনির্দেশনা জরুরি।
এখন পাটের ভরা মৌসুম। এ সময় কাঁচা পাটের দাম তুলনামূলক কম হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। রফতানি বেড়ে যাওয়ায় কাঁচা পাটের মূল্য বেড়ে এরই মধ্যে মণপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭৫০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এটি অভাবনীয় দাম উল্লম্ফন বলা চলে। পাটপণ্য তৈরিতে প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ কাঁচা পাট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় অতিমাত্রায় এর মূল্যবৃদ্ধি সংগত কারণেই পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দেবে। ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতারা এ-জাতীয় পণ্য কেনায় নিরুৎসাহিত হবেন। সবচেয়ে বড় কথা, রফতানি অব্যাহত থাকলে বেশি দামেও দেশীয় পাটকলগুলো কাঁচা পাট পাবে না। ফলে পাটকল বিশেষত ছোট ছোট কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে তা পাট শিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিতে ফেলবে। সুতরাং আপাতত কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ কিংবা কীভাবে তা নিরুৎসাহিত করা যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
করোনার অভিঘাত থেকে দেশের অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিটি খাতই লড়ছে। তার মধ্যে কাঁচা পাটের সংকটে পাটপণ্যের রফতানি দমিত হলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরো বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ক্রেতারা সরে গেলে নতুন করে রফতানি বাজার পাওয়াটাও দুষ্কর। সব দিক চিন্তা করে পাট শিল্পে সৃষ্টি হওয়া সংকট নিরসনে সরকার সময়োপযোগী উদ্যোগ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










