নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে দেশে যখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা (সোলার হোম সিস্টেম) চালু হয়, তখন এর সম্প্রসারণটা ছিল খুবই শ্লথগতিতে। যাত্রার প্রথম এক দশকে সারা দেশে সোলার হোম সিস্টেমের সংখ্যা ছিল তিন লাখের কম। বাংলাদেশে ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সারা বিশ্বে এটা উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এখন এ মডেল অনুসরণ করা হয়। মূলত কর অব্যাহতিসহ সরকারের নীতি প্রণোদনায় সোলার হোম সিস্টেমের দাম যেমন কমেছে, তেমনি সহজলভ্যও হয়েছে তা। এক দশকের ব্যবধানে পাল্টে গেছে জাতীয় গ্রিডবঞ্চিত দেশের প্রত্যন্ত ও পল্লী অঞ্চলের চিত্র। ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব মানুষের নাগালে এসেছে সৌরবিদ্যুৎ। উপকারভোগী মানুষের সংখ্যা এখন তিন কোটির ঘরে উন্নীত হয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল সোলার হোম কর্মসূচি হিসেবে আখ্যা পেয়েছে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রিক এ উদ্যোগ। আরইএনএ-২১-এর বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্টে (জিএসআর) বাংলাদেশ সোলার হোম সিস্টেমের জন্য বিশেষ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। এতে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যে ছয়টি দেশকে তালিকায় রাখা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মানুষ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে। নেপালে ১১ শতাংশ মানুষ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তারা প্রথম অবস্থানে আছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি খরচও কম। বিদ্যুৎ খাতে প্রকৃত সাফল্য আনতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তি আর চিন্তার অভিনবত্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ দিনকে দিন পরিণত হচ্ছে, অতিক্রম করছে সব বাধা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য এখন রয়েছে ভাসমান সৌরপ্রযুক্তি, কৃষিজমিতে ফলন আর সৌরবিদ্যুৎ একসঙ্গে করার জন্য ‘সোলার শেয়ারিং’ ও বিকেন্দ্রীভূত গ্রিড ব্যবস্থাপনার মতো সমাধান। অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সৌর কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ করতে বিশাল এলাকা অধিগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। পতিত অকৃষিজমি, দখল হয়ে যাওয়া নদীর পাড় এবং বাড়ির ছাদ সোলার প্যানেলের জন্য আর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী ও অগভীর সমুদ্র এলাকা বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য খুবই উপযোগী। সেই সঙ্গে সৌর আর বায়ুবিদ্যুতের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় রয়েছে দাম কমতে থাকা ব্যাটারির সুবিধা। এভাবে শিল্প, কৃষি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে এই বিদ্যুৎ ক্রমেই নিজের দখল বাড়াচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাত্র তিন বছরে ভারতে ১ লাখ ১০ হাজার সৌরবিদ্যুত্চালিত পানির পাম্প চালু হয়েছে। ২০১৬ সালে জার্মানিতে একক উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল শীর্ষে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ নির্ভরশীলতা দিয়েই ওই বছর জার্মানি ইউরোপে শীর্ষ বিদ্যুৎ রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়। ভারতের চতুর্থ ব্যস্ততম কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোটাই চলছে সৌরবিদ্যুতে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুবিধা মূলধারার অর্থনীতিতে আত্তীকরণ করতে দেশে দেশে ঘোষিত হচ্ছে নিত্যনতুন লক্ষ্যমাত্রা। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যেই ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ অজীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। আর জার্মানির ক্ষেত্রে এ লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের সদ্য প্রণীত পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি-২০১৬) অনুসারে, ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলিয়ে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা মোট উৎপাদনের মাত্র ১৫ শতাংশ। বিপরীতে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ৩৫ ও ১০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের জ্বালানিবিষয়ক কর্মসূচি ও ‘সোলারজিস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় গড়ে সাড়ে চার ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়া ৭২ শতাংশ এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৯ ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে।

বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। এক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনার পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়াতে হবে। তবে ব্যাটারির মাধ্যমে পরিবেশদূষণের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের জন্য ফটোভোল্টায়িক সেলের চেয়ে বেশি সমস্যা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আনা, চালু এবং ব্যবহূত ব্যাটারির উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ। কেননা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব আমলে নিয়ে এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। সোলার প্যানেলের মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি থেকে যত্রতত্র সিসা বের করে নেয়ার অনুশীলন দেশে ব্যাপক। তার সঙ্গে নিয়মনীতি ছাড়াই ফেলে দেয়া হয় অ্যাসিডসহ অন্যান্য কেমিক্যাল। অবশ্য কেবল সৌরপ্রযুক্তি নয়, গাড়িসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহূত ব্যাটারির ব্যবস্থাপনাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ সময়ের দাবি। সবচেয়ে মারাত্মক হলো, এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের উদাসীনতা। তাই অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তা না হলে একটা পর্যায়ে বড় হুমকিতে পড়তে পারে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ।

দেশে সোলার হোম সিস্টেমের ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য মোটাদাগে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সহজ ঋণ সুবিধা, কারিগরি সহযোগিতা, বিক্রয়োত্তর সেবা ও উদ্ভাবনী বিক্রয় পদ্ধতি সাধারণ মানুষকে সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারে উৎসাহী করেছে। বাসাবাড়ি ছাড়া বাংলাদেশে সেচের জন্যও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চলছে। যদিও সার্বিক চাহিদার তুলনায় এটি সামান্য। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়লেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারকারী ৪৭টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। এ তালিকায় এশিয়ার মধ্যে আছে শুধু জাপান। হোম সিস্টেমেই কিন্তু আমাদের সাফল্য বিরাট। প্রথম দিকে শুধু বাতি জ্বালানো হতো। এখন গ্রামে সৌরশক্তি দিয়ে পাখা চলছে, টেলিভিশন চলছে, ইজি বাইকের ব্যাটারি চার্জ দেয়া হচ্ছে। এমনকি যেসব বাড়িতে ন্যাশনাল গ্রিড পৌঁছে গেছে, সেখানেও সোলার সিস্টেম রয়েছে। কারণ পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সময় তারা সোলার সিস্টেম থেকে বিদ্যুৎ চালায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সোলার সেলের বিদ্যুৎ তাত্ক্ষণিক ব্যবহারের দিকে জোর দিতে হবে। এ বিদ্যুৎ না জমিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ এবং স্বল্প মূল্যে সেটি ব্যবহারের সুযোগ গ্রাহককে করে দেয়া যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে। এক্ষেত্রে মিনি গ্রিড ও লিট মিটারিংয়ের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।