দেশের আইনকানুন উপেক্ষা করে অর্থ পাচারপূর্বক বিদেশে সম্পত্তি-বাড়ি কেনা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। জীবনযাত্রায় উন্নত অনেক দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী তারা প্রচারণাও চালাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি ছিল না কয়েক দশক আগেও। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার নিয়ম কিছুটা শিথিল করে কিছু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিয়েছে শর্তসাপেক্ষে। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী নিয়ম-বিধি পাশ কাটিয়ে অর্থ পাচার করেছে, স্থায়ী বসবাসের শর্ত হিসেবে বিদেশে বিনিয়োগও করছে। কানাডা, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বাংলাদেশীদের আধিক্যের কারণে নামকরণ পর্যন্ত হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশীদের তালিকা চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশী নাগরিকদের বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রবণতা রোধ করা। এজন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে দুদক। এটি একদিকে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে দেশীয় সম্পদ ফেরত আনার পাশাপাশি অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করবে। আশাব্যঞ্জক উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তার ওপর। এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে উদ্যোগ নিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার গতি ধরে রাখা যায়নি। দুদকের উদ্যোগের ক্ষেত্রে সেটি ঘটবে না বলে আমাদের প্রত্যাশা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত সম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশীদের তথ্য কূটনৈতিক চ্যানেলে সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরবরাহ করলে কমিশন দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে পারবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাথমিক পর্যায়ে এ ধরনের বাংলাদেশীদের তথ্য কূটনৈতিক চ্যানেলে সংগ্রহ করবে। এরপর দুদকে সরবরাহ করবে। বিভিন্ন ব্যক্তির অর্থ পাচারের তথ্য চেয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ ৫০টি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক, যেখানে এরই মধ্যে দুদকের চিঠিতে সাড়া দিয়েছে ২২টি দেশ। বিশ্বে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনের মাধ্যমে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশীদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহ করা যায়। গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তাও নিতে পারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশীদের তালিকা তৈরির প্রচেষ্টা অনেক দিনের। আশা করি, দুদকের এবারের উদ্যোগ সফলতা অর্জন করবে। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ সহায়তা জোগাবে বলে প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বৈধ ও অবৈধ বিনিয়োগের পরিমাণ কত, তার সঠিক কোনো তথ্য-উপাত্ত মেলে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে ৩০০ কোটি ডলার কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে ৩ হাজার কোটি ডলার। সন্দেহ নেই, বিশ্বব্যাংকের হিসাবের মধ্যে অবৈধ উপায়ে বিনিয়োগের অর্থ কিছুটা হলেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে নেই। তবে পরিসংখ্যানটি রীতিমতো উদ্বেগজনক, বিশেষত যখন সরকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে রয়েছে। এর কারণ কিন্তু চিহ্নিত, এখন সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশীদের জন্য খোলা মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে অন্যতম সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে অবস্থান করছে বাংলাদেশের নাম। তারা মূলত বিভিন্ন কৌশলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং আইনকে অমান্য করে এবং দেশের প্রচলিত আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বিচারে অর্থ পাচার করে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ থেকে অন্য কোনো দেশে টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। তবে প্রকাশ থাকে যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিন্তু বিগত ১০ বছরের মধ্যে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করার জন্য কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি।

অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়াসহ নানাভাবে। যদিও এটি একটি বড় অপরাধ। এজন্য শাস্তির বিধান রেখে আইনও করা হয়েছে। তার পরও টাকা পাচারের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না কেন, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আইনিভাবে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও গত ১৫ বছরে অনেকে মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউএই ইত্যাদি দেশে বাড়ি-ফ্ল্যাট ক্রয় ছাড়াও নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বহুল আলোচিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সেও অনেক বাংলাদেশীর নাম এসেছে। বস্তুত, অর্থ পাচার রোধে একটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত ও পাচার রোধে দূতাবাসগুলোতে গোয়েন্দা কার্যক্রম রাখতে হবে। আর্থিক কর ও দুদকের প্রতিনিধিদের ওই সব জায়গায় কিছু সময়ের জন্য পদায়ন করা যেতে পারে। অ্যাসেট রিকভারি ও ট্যাক্স রিকভারি দুই পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। অ্যাসেট রিকভারি যদি কঠিন হয় তাহলে ট্যাক্স রিকভারি করতে হবে। অর্থ পাচার রোধে আমদানি-রফতানিতে পণ্য ও সেবার ওপর ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং করা, শিপমেন্টের ওপর আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং করা, আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং করা এবং রফতানি পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা দেয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন যথাযথভাবে দেশের ব্যাংকগুলোকে মেনে চলতে তদারকি জোরদার করতে হবে।